নারী তুমি পরিবারের নেয়ামত না পরীক্ষা

মাদরাসাতুল কুরআন লিলবানাত ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে তরবিয়তি আলোচনা-

🔳একজন মেয়ে তার পরিবারের জন্য আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামতও হতে পারে, আবার কঠিন পরীক্ষাও হতে পারে। আমাদের মেয়েদের মাদ্রাসা গড়ে তোলার অন্যতম লক্ষ্য মেয়েদেরকে পরিবারের নেয়ামত হিসেবে বাবা মার হৃদয়ের প্রশান্তি হিসেবে গড়ে তোলা।

আল্লাহ তাআলা চান, একজন মুমিনাহ মেয়ে তার পরিবারের জন্য শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত হবে। সে তার পরিবারের দুশ্চিন্তার কারণ হবে না।

কখন মেয়েরা পরিবারের নিয়ামত, আর কখন পরীক্ষা?

*************************************************

পৃথিবীতে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সুখের জায়গা তার পরিবার। একজন বাবা সারাদিন কষ্ট করেন তার সন্তানের হাসি দেখার জন্য। একজন মা রাত জেগে কষ্ট করেন তার সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। এই পরিবার একজন ব্যক্তির দুনিয়ার জান্নাত।

অপরদিকে কুরআন এই পরিবারকেই বলেছে পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

«إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ

তোমাদের সম্পদ ও সন্তান তো পরীক্ষা মাত্র। (সূরা তাগাবুন : ১৫) আরেক জায়গায় বলেন—

«إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ

তোমাদের কিছু স্ত্রী ও সন্তান তোমাদের জন্য শত্রু হতে পারে; অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। (সূরা তাগাবুন : ১৪)

এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিবার সন্তান কখন নিয়ামত হয় আর এই পরিবার সন্তান কখন পরীক্ষায় পরিণত হয়?

যখন এই সন্তানের চাহিদা বাবাকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দেয়। যখন তার বিলাসিতার দাবি বাবাকে হারামের দিকে নিয়ে যায়। যখন তার অসন্তুষ্টি বাবার হৃদয়ে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দেয় তখন এ সন্তান পরীক্ষা। আর সন্তান যখন অনুগত হয় সন্তুষ্ট হয় কৃতজ্ঞতা আদায়কারী হয় আল্লাহর হুকুম পালনকারী হয় সেবক হয় তখন সে বাবা মার জন্য নেয়ামত।

যখন একজন সন্তান তার বাবা-মাকে অন্যের সাথে তুলনা করে আর তার চাহিদা পেশ করে অর্থাৎ বলে অমুকের বাসায় এই আছে আমাদের কেন নেই। অমুকের বাবা এটা কিনেছে এই কথাগুলো সন্তান তার বাবা-মার কাছে হয়তোবা খুব সহজে বলে ফেলে কিন্তু এ কথাগুলো বাবা-মাকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করে।

একজন বাবার নীরব কান্না। একজন বাবা হয়তো দিনমজুর বা কৃষক। শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম।‌ মাদ্রাসার খাদেম বা ব্যবসায়ী। সারাদিন পরিবারের জন্য, সন্তানের জন্য পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলেন। তিনি হয়তো ভাবছেন আজ আমার মেয়েটা খুশি হবে।

কিন্তু ঘরে ঢুকেই যদি শুনতে হয় আপনি আমাদের জন্য কী করেছেন? আপনি তো কিছুই দিতে পারেন না। অমুকের বাবা কত ভালো! তখন সেই মানুষটি বাইরে হাসলেও ভেতরে ভেঙে পড়েন। কখনো কখনো এই দুশ্চিন্তা তার নামাজের খুশু নষ্ট করে দেয়। তার হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তোলে। নামাজে তখন তার মন বসে না। এবাদতে সে আগ্রহে হারিয়ে ফেলে। সে দুনিয়াতেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় আখেরাতকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই অবস্থায় পরিবার সন্তান তার জন্য পরীক্ষা এবং ফেতনা।

এই কারণেই কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয়—পরিবারকে নেয়ামত হিসেবে গড়ে তোলো। পরিবার যেন দুশ্চিন্তা এবং পেরেশানির কারণ না হয়। পরিবার হবে সহযোগী। একে অপরকে কল্যাণ দুনিয়া এবং আখিরাতের সফলতার দিকে এগিয়ে দিবে। পরিবার বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

🔳 প্রিয় রাসূলের পরিবার আদর্শ পরিবার। কি চুক্তি এবং অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তিনি পরিবার গড়ে তুলেছিলেন তার আলোচনা রয়েছে কুরআনে।

উম্মাহাতুল মুমিনীনদের জীবন আমাদের জন্য আদর্শ।

উম্মাহাতুল মুমিনীন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র স্ত্রীগণকে প্রিয় রসুলের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন একটি কঠিন বিষয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন—

﴿ يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا … وَإِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ … ﴾

“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলে দিন, যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদেরকে কিছু উপঢৌকন দিয়ে সুন্দরভাবে বিদায় করে দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আখিরাতের গৃহ কামনা কর, তবে আল্লাহ তোমাদের মধ্যকার সৎকর্মশীলদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। (সূরা আহযাব : ২৮-২৯)

আজ চৌদ্দশত বছর পর সেই আয়াতের আহ্বান আমাদের সামনে উপস্থিত। তোমরা কি দুনিয়া সাজাতে চাও না আল্লাহ আল্লাহর রাসূল এবং আখেরাত চাও। এটা এক কঠিন প্রশ্ন। এই প্রশ্ন করেছিলেন আল্লাহর হুকুমে প্রিয় নবী তার পরিবারবর্গকে। এই প্রশ্নটা আছে আমাদের সামনেও।

আজও এ প্রশ্ন আছে প্রতিটি পরিবারের সামনে। আমাদের কাছে কি ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া বড় না অনন্ত আখেরাত বড়। আমাদের লক্ষ্য কি দুনিয়ার সফলতা না আখেরাতের সফলতা।

🔳 আমরা জানার চেষ্টা করব এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট কেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উম্মাহাতুল মুমিনীনকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন করলেন। এই আয়াতগুলো কোনো সাধারণ পরিবারের ঘটনা নয়; এই প্রশ্নগুলো ছিল রাসুল সাঃ এর পরিবারবর্গ কে কেন্দ্র। এই পরিবার প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য আদর্শ পরিবার।

মদীনায় ইসলামের বিজয় ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছিল।বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্পদ আসতে শুরু করেছিল। সেই সম্পদ থেকে প্রিয় রসূলও অংশ পেলেন। স্বাভাবিকভাবেই উম্মাহাতুল মুমিনীনগন প্রিয় রাসুলের কাছে নিজেদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ও সংসারের স্বাচ্ছন্দ্যের আশা প্রকাশ করেছিলেন। এটি কোনো গুনাহ ছিল না, কোনো অবাধ্যতাও ছিল না; বরং মানবীয় স্বাভাবিক চাহিদা ছিল।

কিন্তু আল্লাহ তাআলা চেয়েছিলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘর পৃথিবীর সকল পরিবারের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত আদর্শ হয়ে থাকুক। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী ﷺ-কে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন তাঁর স্ত্রীদের সামনে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করেন। যদি তারা দুনিয়ার সৌন্দর্য ও স্বাচ্ছন্দ্যকে অগ্রাধিকার দিতে চান, তবে সম্মানের সঙ্গে বিচ্ছেদের সুযোগ রয়েছে। আর যদি তারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ﷺ এবং আখিরাতকে বেছে নেন, তবে তাদের জন্য রয়েছে মহান প্রতিদান।

রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে হযরত আয়িশা (রা.)-কে এই আয়াত শুনালেন। তিনি এক মুহূর্তও দ্বিধা করলেন না। বললেন, আমি আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আখিরাতকেই বেছে নিলাম।‌ এরপর একে একে সকল উম্মাহাতুল মুমিনীন একই উত্তর দিলেন।

সেদিন তারা শুধু একটি সিদ্ধান্ত নেননি; তারা কিয়ামত পর্যন্ত আগত মুসলিম নারীদের জন্য একটি মানদণ্ড স্থির করে দিয়েছিলেন। একজন মুমিনাহ নারী তার চাহিদা পূরণ আর ভোগের মাঝে সফলতা দেখবে না। তার লক্ষ্য হবে আল্লাহ আল্লাহর রাসূল এবং আখেরাত। একজন মুমিনাহ নারী তার বাবার ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট থাকবে। ‌স্বামীর ব্যবস্থাপনায় কৃতজ্ঞতা আদায় করবে। আর এর বিনিময়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে। সে হবে পরিবারের জন্য নিয়ামত পরীক্ষা নয়।

যখন সূরা আহযাবের এই আয়াত নাযিল হলো, একবার চিন্তা করো সেদিন তারা কী হারিয়েছিলেন? কিছু আরাম-আয়েশ। কিছু দুনিয়াবী সুযোগ। আর লাভ করেছিলেন আল্লাহর সন্তুষ্টি, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সান্নিধ্য। উম্মাহর মাতৃত্বের মর্যাদা। আর এমন এক সম্মান, যা চৌদ্দশ বছর পরও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। আজ পৃথিবীর অসংখ্য ধনী নারীর নাম মানুষ জানে না। কিন্তু খাদিজা (রা.), আয়িশা (রা.), হাফসা (রা.), উম্মে সালামা (রা.)—তাদের নাম পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

কারণ তারা আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে নারী দুনিয়ার জন্য আল্লাহকে ছেড়ে দেয়, সে দুনিয়াও হারায়, আখিরাতও হারায়। আর যে নারী আল্লাহর জন্য দুনিয়ার কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই সম্মানিত করেন।

এই কারণেই, একজন কুরআনের ছাত্রীর প্রথম পরিচয় তার পোশাকে নয়, তার সৌন্দর্য তাই নয়। তার প্রথম পরিচয় হলো—তার হৃদয়ে আল্লাহ কত বড়। রাসুল কত বড় আখেরাত রাত কত বড়।

উম্মাহাতুল মুমিনীন আমাদের শিখিয়েছেন, প্রকৃত সৌন্দর্য অলংকারে নয়, সন্তুষ্টিতে প্রকৃত মর্যাদা রাজপ্রাসাদে নয়, তাকওয়ায়; আর প্রকৃত সফলতা অধিক পাওয়ায় নয়, বরং আল্লাহকে পাওয়ায়।

🔳উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.)। প্রিয় রাসুলের সবচাইতে প্রিয় জীবন সঙ্গিনী। তিনি ছিলেন প্রিয় রাসূলের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি ছিলেন প্রিয় রাসূলের জন্য নেয়ামত।

একজন নারী তার স্বামীর জীবনে কী ভূমিকা রাখতে পারে এই প্রশ্নের সবচেয়ে সুন্দর উত্তর যদি পৃথিবীর ইতিহাসে কাউকে দেখিয়ে দিতে হয়, তবে তিনি হলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.)।

আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওয়তের সূচনালগ্নে এমন একজন স্ত্রী দান করেছিলেন, যিনি শুধু একজন জীবনসঙ্গী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাহস, সান্ত্বনা, ত্যাগ, সহযোগিতা এবং বিশ্বস্ততার জীবন্ত প্রতীক।

মক্কার অন্যতম ধনী নারী ছিলেন খাদিজা (রা.)। চাইলে তিনি বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে পারতেন। চাইলে তিনি তাঁর সম্পদ নিয়ে গর্ব করতে পারতেন। কিন্তু তিনি অন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন একজন নেককার স্ত্রীর কাজ স্বামীর কাঁধে নতুন বোঝা চাপানো নয়; বরং তার কাঁধের বোঝা হালকা করা। তিনি তাই করেছিলেন। প্রিয় রাসুলের পরিবারের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

হেরা গুহা থেকে ফিরে আসা সেই রাত। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন প্রথম ওহী লাভ করে কাঁপতে কাঁপতে হেরা থেকে ফিরে এলেন, তখন তিনি বলছিলেন—

«”زَمِّلُونِي زَمِّلُونِي”

“আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও। সেই ভয়ংকর মুহূর্তে খাদিজা (রা.) প্রিয় রাসূল কি কি বলেছিলেন। তিনি কি বলেছিলেন এখন সংসারের কী হবে? আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমার সন্তানদের ভবিষ্যত কি হবে।

বরং তিনি তাঁর স্বামীকে শক্তি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন কখনোই না! আল্লাহ আপনাকে অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, দুর্বলদের সাহায্য করেন, মেহমানের সম্মান করেন এবং সত্যের পক্ষে থাকেন। (সহীহ বুখারী)

পৃথিবীর ইতিহাসে একজন স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর সাহসের বাক্যগুলোর একটি ছিল এটি।

হযরত খাদিজাকে দেখো। সমস্ত সম্পদ তিনি ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।‌ ইসলামের সূচনাকালে যখন মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছিলেন, তখন খাদিজা (রা.) তাঁর ধন-সম্পদ, ব্যবসা, স্বাচ্ছন্দ্য সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

তিনি বলেননি আমার সম্পদ আমার জন্য। বরং তিনি বুঝেছিলেন আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা পেলে আমার জীবনও সফল হবে। শিয়াবে আবি তালিবের তিন বছর। মক্কার কাফিররা যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধে ফেলে দিল, তখন তিন বছর পর্যন্ত কঠিন কষ্টের জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছিল।

খাদিজা (রা.) তখন বৃদ্ধা। তিনি চাইলে নিজের সম্পদ নিয়ে নিরাপদ জীবন বেছে নিতে পারতেন। সেই সুযোগ তার ছিল। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে একা ছেড়ে যাননি। তিনি ক্ষুধা সহ্য করেছেন। কষ্ট সহ্য করেছেন। অবরোধ সহ্য করেছেন। কিন্তু অভিযোগ করেননি। কারণ তাঁর হৃদয়ে দুনিয়ার চেয়ে বড় ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি।

একজন কুরআনের ছাত্রীর জন্য শিক্ষা। আজ তোমরা হাফেজা হওয়ার চেষ্টা করছো। আলেমা হওয়ার চেষ্টা করছো। কিন্তু মনে রেখো, কুরআনের শিক্ষা শুধু মুখস্থ করার নাম নয়। কুরআনের শিক্ষা হলো পরিবারের জন্য রহমত হওয়া। বাবা-মায়ের জন্য সান্ত্বনা হওয়া। আগামী দিনে স্বামীর জন্য সহযোগী হওয়া।

একজন নারী যখন শুধু নিজের প্রয়োজন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন সে সংসারে চাপ সৃষ্টি করে। তখন সে পরিবারের জন্য বোঝা হয় দুশ্চিন্তার কারণ হয়। আর যখন সে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সে সংসারে বরকত নিয়ে আসে। এই নারী পরিবারের জন্য হয় নেয়ামত।

খাদিজা (রা.)-এর উত্তরাধিকার। আজ পৃথিবীর কোটি কোটি নারী হযরত খাদিজা (রা.)-কে স্মরণ করে। কারণ তিনি আমাদের শিখিয়েছেন স্বামীকে ভালোবাসা শুধু কথার মাধ্যমে নয়, তার দায়িত্বকে সহজ করার মাধ্যমে করতে হয়।

তোমরা এমন মেয়ে হও, যাদের উপস্থিতিতে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা কমে যায়। এমন মানুষ হও, যাদের কারণে।পরিবারের মানুষ আল্লাহর দিকে আরও বেশি ফিরে আসে।

এমন নারী হও, যাদের সম্পর্কে একদিন মানুষ বলতে পারে

তিনি শুধু একজন হাফেজা বা আলেমা নন; তিনি তাঁর পরিবারের জন্য এক টুকরো রহমত ছিলেন।

🔳 প্রিয় রাসুলের আদরের দুলালী হযরত ফাতিমা (রা.)। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী কন্যা ছিলেন হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (রা.)—যিনি ছিলেন তিনি।রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে এত ভালোবাসতেন যে, তিনি যখন আসতেন তখন রাসূল ﷺ দাঁড়িয়ে যেতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবার মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবনে ছিল না বিলাসিতার জীবন।

তিনি রাজকন্যার মতো জীবনযাপন করেননি।‌ তিনি নবীর কন্যা ছিলেন, কিন্তু তাঁর ঘরে অনেক সময় পর্যাপ্ত খাদ্যও থাকত না। তিনি নিজের হাতে চাকি ঘুরিয়ে আটা পিষতেন।

নিজের হাতে সংসারের কাজ করতেন। এত পরিশ্রম করতেন যে, তাঁর হাতে চাকির দাগ পড়ে গিয়েছিল।

একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। একদিন কিছু যুদ্ধবন্দী মদীনায় এলো। ফাতিমা (রা.) শুনলেন, কয়েকজন খাদেমাও এসেছে। তিনি ভাবলেন, যদি একজন খাদেমা পাওয়া যায় তাহলে সংসারের কষ্ট কিছুটা কমে যাবে। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আবেদন করলেন।

এটি কোনো বিলাসিতার দাবি ছিল না। এটি ছিল ক্লান্ত এক কন্যার স্বাভাবিক আবেদন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে এমন একটি উপহার দিলেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র উম্মতের সম্পদ হয়ে থাকবে। রাসূল ﷺ বললেন আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় শিখিয়ে দেব না, যা একজন খাদেমা থেকেও উত্তম হবে।

তারপর তিনি শিক্ষা দিলেন ঘুমানোর আগে ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার পাঠ করতে। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

রাসূল ﷺ কেন খাদেমার পরিবর্তে তাসবীহ দিলেন?‌কারণ রাসূল ﷺ তাঁর কন্যাকে শুধু কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে চাননি;তিনি তাঁকে এমন সম্পদ দিতে চেয়েছিলেন, যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে উপকার করবে।

আজকের মেয়েদের জন্য শিক্ষা আজকের পৃথিবী আমাদের শিখায় আরও চাই। আরও পাও। আরও ভোগ কর। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর প্রিয় কন্যাকে শিখিয়েছিলেন

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত কর।কারণ জীবনের সব সমস্যা সম্পদ দিয়ে সমাধান হয় না।

একজন মেয়ের প্রকৃত সৌন্দর্য দামি পোশাকে নয়। প্রকৃত সৌন্দর্য দামি অলংকারে নয়।‌ প্রকৃত সৌন্দর্য সন্তুষ্টিতে। প্রকৃত সৌন্দর্য আল্লাহর উপর ভরসায়। প্রকৃত সৌন্দর্য এই বিশ্বাসে আমার রব আমার জন্য যথেষ্ট।

হযরত ফাতিমা (রা.) যদি চাইতেন, পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত পরিবারের সদস্য হিসেবে অনেক কিছু দাবি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন মর্যাদা অধিক পাওয়ায় নয় মর্যাদা হলো আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকতে পারা।

বাবার জন্য চোখের শীতলতা হও। অনেক সময় একজন বাবা তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি সবকিছু দিতে পারেন না। সব স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন না।

সব চাহিদা পূরণ করতে পারেন না। তখন একজন নেককার মেয়ের পরিচয় হলো সে অভিযোগ করে না। সে তুলনা করে না। সে বাবার কষ্ট বোঝে। সে বাবার জন্য দোয়া করে। সে বলে আব্বু, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের অনেক নিয়ামত দিয়েছেন। এই একটি বাক্য অনেক সময় একজন বাবার হৃদয়কে এমন প্রশান্তি দেয়, যা পৃথিবীর কোনো সম্পদ দিতে পারে না।

ফাতিমা (রা.)-এর শিক্ষা। হযরত ফাতিমা (রা.) আমাদের শিখিয়েছেন— সব চাহিদা পূরণ হওয়াই সুখ নয়। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত হওয়াই প্রকৃত সুখ। সবসময় অধিক পাওয়া সফলতা নয়। আল্লাহ যা দিয়েছেন, তার উপর সন্তুষ্ট থাকতে পারা সফলতা।

আর একজন নেককার কন্যার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—

সে তার বাবার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ নয় সে তার বাবার চোখের শীতলতা। সে তার পরিবারের উপর বোঝা নয়;

সে তার পরিবারের জন্য রহমত। এবং সে পৃথিবীর কাছে কিছু পাওয়ার আগে আকাশের মালিকের কাছে হাত তুলে বলতে শেখে—হে আল্লাহ! আপনি আমার জন্য যথেষ্ট, আপনি-ই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

হযরত আসমা (রা.) ধৈর্য, আত্মমর্যাদা ও সন্তুষ্টির দৃষ্টান্ত

**************************************************

হযরত আসমা ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর কন্যা, হযরত আয়িশা (রা.)-এর বড় বোন, ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সাহসী ও ত্যাগী নারী—হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)।

ইতিহাস তাঁকে “ذات النطاقين”—দুই বেল্টের অধিকারিণী নামে স্মরণ করে। হিজরতের রাতে তিনি নিজের কোমরের কাপড় ছিঁড়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর পিতার জন্য খাবারের পুঁটলি বেঁধেছিলেন।

কিন্তু আজ আমরা তাঁর জীবনের আরেকটি অধ্যায় থেকে শিক্ষা নেব। তাকে ধনী পিতার ঘর থেকে স্বল্প সামর্থ্যের সংসারে যেতে হয়েছিল। আসমা (রা.) ছিলেন আবু বকর (রা.)-এর কন্যা। মুসলিম সমাজের অন্যতম সম্মানিত পরিবারের সন্তান। কিন্তু তাঁর বিবাহ হয়েছিল হযরত যুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.)-এর সঙ্গে।

যুবাইর (রা.) ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীদের একজন, কিন্তু আর্থিক দিক থেকে তখন খুব স্বচ্ছল ছিলেন না। আসমা (রা.) যখন তাঁর সংসারে এলেন, তখন সেখানে চাকর-বাকর ছিল না, আরাম-আয়েশ ছিল না, বিলাসিতা ছিল না। ছিল শুধু ঈমান, ভালোবাসা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষা—

হযরত আসমা (রা.) নিজেই বর্ণনা করেন, তিনি ঘোড়ার সেবা করতেন। ঘোড়ার জন্য খাদ্য প্রস্তুত করতেন। পানি আনতেন। সংসারের কাজ করতেন। এমনকি দূর থেকে মাথায় করে খেজুরের আঁটি বহন করে নিয়ে আসতেন। তার মাঝে কোন অভিযোগ ছিল না। তিনি ছিলেন পরিবারের জন্য নিয়ামত।

আজ অসংখ্য পরিবার ধ্বংস হচ্ছে দারিদ্র্যের কারণে নয়।

ধ্বংস হচ্ছে তুলনার কারণে। অনেক সংসারে সমস্যা শুরু হয় এই কয়েকটি বাক্য দিয়ে অমুকের স্বামী এটা দিয়েছে। অমুকের বাসা এমন। অমুকের জীবন এত সুন্দর।

শয়তান মানুষের চোখকে নিজের নিয়ামতের দিকে নয়, অন্যের সম্পদের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। ফলে যা আছে, তা আর ভালো লাগে না। যে মানুষটি পাশে আছে, তার মূল্য আর বোঝা যায় না। কৃতজ্ঞতা হারিয়ে যায়। শান্তি হারিয়ে যায়। বরকত হারিয়ে যায়।

হযরত আসমা (রা.) শিখিয়েছেন স্বামীর সম্পদের পরিমাণ নয়, তার ঈমান গুরুত্বপূর্ণ। দামী আসবাব নয়, ঘরের সাকিনা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বুঝেছিলেন, দুনিয়ার প্রাচুর্য সবসময় সুখ দেয় না।‌অনেক ধনী ঘরেও অশান্তি আছে। আবার অনেক সাধারণ ঘরেও জান্নাতের প্রশান্তি আছে।

হযরত আসমার জীবন থেকে কোরআনের শিক্ষার্থীরা কী শিখবে? তোমরা কুরআনের ছাত্রী। তোমরা সমাজের অন্যান্য নারীদের মত নও। তোমাদেরকে এমন মানুষ হওয়ার জন্য তৈরি করা হচ্ছে, যারা নিজেদের ঘরে বরকত নিয়ে যাবে। আজ তোমরা বাবার ঘরে আছো। আগামীকাল হয়তো স্বামীর ঘরে যাবে। তোমরা হবে পরিবারের জন্য নেয়ামত। ‌ পরীক্ষা বা দুশ্চিন্তার কারণ নয়।

মনে রেখো, একজন নেককার নারী ঘরের সম্পদ বাড়িয়ে না-ও দিতে পারে, কিন্তু সে ঘরের বরকত বাড়ায়। একজন নেককার নারী সব সমস্যা দূর করতে না-ও পারে, কিন্তু সে সমস্যার মধ্যে ধৈর্য ও প্রশান্তি সৃষ্টি করে। একজন নেককার নারী সব চাহিদা পূরণ করতে না-ও পারে, কিন্তু সে কৃতজ্ঞতার পরিবেশ গড়ে তোলে।

হযরত আসমা (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায় সুখ বড় বাড়িতে নয়। সুখ বড় ব্যাংক ব্যালেন্সে নয়। সুখ দামী পোশাকে নয়। সুখ হলো এমন একটি হৃদয়, যা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট। সুখ হলো এমন একটি পরিবার, যেখানে মানুষ একে অপরকে আল্লাহর দিকে এগিয়ে দেয়। সুখ হলো এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে অভিযোগের চেয়ে দোয়া বেশি, দাবির চেয়ে কৃতজ্ঞতা বেশি, তুলনার চেয়ে ভালোবাসা বেশি।

হযরত আসমা (রা.) যদি তাঁর কষ্টের দিকে তাকাতেন, তাহলে তিনি অভিযোগে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাঁর কষ্টের দিকে নয়, তাঁর রবের দিকে তাকিয়েছিলেন। তাই তিনি ইতিহাসে শুধু একজন সাহাবিয়াহ নন; তিনি ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন।

আজকের এই ফিতনার যুগে, যখন তুলনা অসংখ্য ঘরের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে, তখন আসমা (রা.) আমাদেরকে আবার শিখিয়ে দেন সুখ সম্পদের প্রাচুর্যে নয়; সুখ আল্লাহর সন্তুষ্টিতে।‌সুখ বিলাসিতায় নয়; সুখ সম্পর্কের বরকতে।

সুখ অধিক পাওয়ায় নয়; সুখ আল্লাহ যা দিয়েছেন, তার উপর সন্তুষ্ট থাকতে পারায়। হযরত আসমার রঙ্গে আমাদের জীবন আলোকিত করতে হবে। পরিবারের জন্য হতে হবে নেয়ামত।

🔳সূরা কাসাসে দুই কন্যার আলোচনা করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে আদর্শ কন্যা বাবার বোঝা বাড়ায় না, বাবার বোঝা বহন করে।

একজন আদর্শ কন্যা। কেমন হব বৃদ্ধ পিতার সঙ্গে তার আচর। পরিবারের কষ্টের সময় তার ভূমিকা কী হবে? এই প্রশ্নগুলোর এক অপূর্ব উত্তর আমরা পাই সূরা কাসাসে।

কুরআনের গল্প। ‌যখন হযরত মূসা (আ.) মিসর থেকে বের হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মাদইয়ানে পৌঁছলেন, তখন তিনি একটি কূপের পাশে পৌঁছলেন। সেই কুপে বহু লোককে তাদের পশুদের পানি পান করাতে দেখলেন। কিন্তু সেই ভিড়ের একটু দূরে তিনি দুই তরুণীকে দেখতে পেলেন, যারা তাদের পশুগুলোকে আটকে দাঁড়িয়ে রেখেছিল।

মূসা (আ.) বুঝতে পারলেন তারা কোন সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে। ‌এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—

«مَا خَطْبُكُمَا

তোমাদের ব্যাপার কী? তারা উত্তরে বলল—

«لَا نَسْقِي حَتَّىٰ يُصْدِرَ الرِّعَاءُ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ

রাখালেরা ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা পানি পান করাতে পারি না। আর আমাদের পিতা অত্যন্ত বৃদ্ধ।(সূরা কাসাস : ২৩)

এই একটি বাক্যের মধ্যে কুরআন আদর্শ কন্যার কতগুলো বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে!

এখানে প্রথম বিষয় তারা কোন অভিযোগ করেনি। তারা বলেনি আমাদের ভাগ্যই খারাপ। তারা বলেছে আমাদের বাবা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তাই আমরা এ দায়িত্ব পালন করছি।

তাদের কথার মধ্যে অভিযোগ ছিল না। অভিমান ছিল না।অসন্তুষ্টি ছিল না। ছিল দায়িত্ববোধ। ছিল পিতার প্রতি মমতা। ছিল বাস্তবতা মেনে নেওয়ার শক্তি।

তারা পিতার দুর্বলতাকে অসম্মানের বিষয় বানায়নি। আজ অনেক সময় দেখা যায়, সন্তানরা বাবা-মায়ের অক্ষমতাকে লজ্জার বিষয় মনে করে। কেউ বাবার পেশা নিয়ে লজ্জা পায়। কেউ বাবার দারিদ্র্য নিয়ে লজ্জা পায়। কেউ বাবার অশিক্ষাকে লজ্জা পায়।‌কেউ বাবার বৃদ্ধ বয়সকে বোঝা মনে করে।

কিন্তু কুরআনের এই দুই কন্যা তাদের বৃদ্ধ পিতাকে অসম্মান করেনি। তারা বলেনি আমাদের বাবা কিছুই করতে পারেন না। বরং তারা বলেছে—

«وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ

আমাদের পিতা অত্যন্ত বৃদ্ধ। এর মধ্যে অভিযোগ নেই। এর মধ্যে ভালোবাসা আছে। সম্মান আছে। দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা আছে।

এখান থেকে আমরা শিখতে পারি আদর্শ কন্যা সবসময় এই চিন্তা করে না পরিবার আমার জন্য কী করল? বরং সে চিন্তা করে আমি পরিবারের জন্য কী করতে পারি? সে শুধু গ্রহণ করতে শেখে না। সে দিতেও শেখে। সে শুধু নিজের কষ্ট দেখে না। সে বাবার কষ্টও অনুভব করে। সে শুধু নিজের প্রয়োজন নিয়ে ভাবে না। সে পরিবারের প্রয়োজন নিয়েও ভাবে। আদর্শ সন্তান প্রয়োজনের সময় পরিবারের বোঝা কাঁধে তুলে নেয়। যে পরিবারের জন্য বুঝা হয় না।

একজন বৃদ্ধ বাবার সবচেয়ে বড় সম্মদ টাকা নয়। জমি নয়। ব্যবসা নয়। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো নেককার সন্তান। যে সন্তান তার বার্ধক্যে পাশে দাঁড়ায়। যে সন্তান তার দুর্বলতাকে ঢেকে রাখে। যে সন্তান তার সম্মান রক্ষা করে।‌ যে সন্তান তাকে বোঝা মনে করে না। যে সন্তান তার জন্য দোয়া করে। এই সন্তান নেয়ামত।

হযরত মূসা (আ.) শুধু দুই মেয়েকে দেখেননি। তিনি তাদের চরিত্র দেখেছিলেন। তাদের লজ্জাশীলতা দেখেছিলেন। তাদের দায়িত্ববোধ দেখেছিলেন। তাদের পিতার প্রতি সম্মান দেখেছিলেন। তাদের কথার ভদ্রতা দেখেছিলেন। এ কারণেই পরবর্তীতে এই পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

এখানে একটি বড় শিক্ষা আছে একজন মেয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার চেহারায় নয়, তার চরিত্রে। তার আদবে।

তার দায়িত্ববোধে। তার পিতামাতার প্রতি সম্মানে।

কুরআনের মাদরাসার ছাত্রীরা কুরআনের এ গল্প থেকে কি শিখবে। আমরা কুরআনের গল্প দ্বারা তোমাদের জীবনকে গড়ে তুলতে চাই। দেখো তোমাদের অনেকের বাবা হয়তো খুব ধনী নন। কেউ শিক্ষক। কেউ ইমাম। কেউ কৃষক। কেউ ব্যবসায়ী। কেউ দিনমজুর। কেউ অসুস্থ। কেউ বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন।

মনে রেখো,তোমার বাবার কষ্টকে কখনো তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভাষায় প্রকাশ করবে না। তোমার বাবার সীমাবদ্ধতাকে কখনো লজ্জার কারণ মনে করবে না।

তোমার বাবার সামর্থ্যের বাইরে কিছু দাবি করার আগে একবার ভাববে তিনি হয়তো তোমার জন্যই নিজের অনেক স্বপ্ন কুরবান করেছেন। অনেক রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন।

তোমরা বাবা মার চোখের শীতলতা হও। সূরা কাসাসের দুই কন্যা আমাদের শিখিয়েছেন নেককার কন্যা সেই নয়, যে শুধু নিজের অধিকার জানে। নেককার কন্যা সেই, যে নিজের দায়িত্বও জানে। সে পিতার হৃদয়ে কষ্ট বাড়ায় না। সে পিতার কষ্ট কমায়। সে পিতার মাথায় নতুন চিন্তার বোঝা চাপায় না। সে পিতার বোঝার কিছু অংশ নিজের কাঁধে তুলে নেয়।

এটাই সূরা কাসাসের দুই কন্যার শিক্ষা। এটাই একজন কুরআনের ছাত্রীর পরিচয়। এবং এটাই সেই চরিত্র, যা একটি মেয়েকে তার বাবার “চোখের শীতলতা” বানিয়ে দেয়।

🔳সূরা তাহরীমের শিক্ষা : একজন নারী পরিবারকে জান্নাতের পথেও নিতে পারে, আবার ধ্বংসের পথেও।

কুরআন যখন কোনো ঘটনা বর্ণনা করে, তখন শুধু ইতিহাস বলার জন্য করে না; বরং আমাদেরকে জীবন গড়ার শিক্ষা দেওয়ার জন্য করে।

সূরা তাহরীমের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা চারজন নারীর উদাহরণ দিয়েছেন। দুইজনকে জাহান্নামের উদাহরণ হিসেবে, আর দুইজনকে জান্নাতের উদাহরণ হিসেবে।

এ যেন কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর সমস্ত নারীর সামনে রাখা দুটি পথ একটি পথ আল্লাহর সন্তুষ্টির, আরেকটি পথ আল্লাহর অসন্তুষ্টির।

নূহ (আ.)-এর স্ত্রী ও লূত (আ.)-এর স্ত্রীর ঘটনা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

«ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِّلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ

আল্লাহ কাফিরদের জন্য নূহের স্ত্রী ও লূতের স্ত্রীর উদাহরণ বর্ণনা করেছেন। (সূরা তাহরীম : ১০)

একটু চিন্তা করো। নূহ (আ.) উলুল আযম নবীদের একজন। লূত (আ.) আল্লাহর প্রেরিত নবী। তাদের মতো স্বামী পৃথিবীতে আর কে পেতে পারে?

কিন্তু সেই মহান নবীদের ঘরেও এমন স্ত্রী ছিলেন, যারা তাদের দাওয়াতকে সমর্থন করেননি। তাদের ঈমানের পথে সহযোগী হননি। তাদের মিশনের অংশীদার হননি। ফলে নবীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তারা রক্ষা পাননি।

এখানে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানুষের মর্যাদা শুধু সম্পর্কের কারণে হয় না। কেউ আলেমের মেয়ে হলেই সফল নয়। কেউ হাফেজের মেয়ে হলেই সফল নয়। কেউ মুফতির মেয়ে হলেই সফল নয়। কেউ নবীর স্ত্রী হলেই সফল নয়। সফলতা নির্ভর করে নিজের ঈমান, নিজের আমল এবং নিজের অবস্থানের উপর।

একজন নারী কীভাবে পরিবারের ক্ষতির কারণ হতে পারে?

*****************************************************

একজন নারী যখন তার স্বামীকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যখন সে দুনিয়াকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দিতে শেখায়। যখন সে অযৌক্তিক দাবি করে। যখন সে তুলনা করে। যখন সে স্বামীর ঈমানি সংগ্রামকে মূল্যায়ন করে না। যখন সে সন্তানদেরকে দুনিয়ামুখী বানায়। তখন সে অজান্তেই একটি পরিবারের আখিরাতের ক্ষতির কারণ হয়ে যেতে পারে। এই কারণেই সূরা তাগাবুনে আল্লাহ সতর্ক করেছেন—

«إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ

তোমাদের কিছু স্ত্রী ও সন্তান তোমাদের জন্য শত্রু হতে পারে। অর্থাৎ এমন সম্পর্ক, যা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেয়।

কুরআনে ফিরআউনের স্ত্রীর উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অত্যাচারীর স্ত্রী। ফিরআউনের স্ত্রী—আসিয়া (রাঃ)। বাহ্যিকভাবে দেখলে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসবহুল জীবনের অধিকারিণী ছিলেন। রাজপ্রাসাদ। ক্ষমতা। সম্পদ। সম্মান। সবকিছু ছিল তাঁর হাতে। কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল আল্লাহর দিকে। তাই তিনি দোয়া করেছিলেন—

«رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ

“হে আমার রব! আপনার কাছে জান্নাতে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করুন। (সূরা তাহরীম : ১১)

খেয়াল করো, তিনি বলেননি হে আল্লাহ! আমাকে আরও একটি প্রাসাদ দিন। তিনি বলেননি আমার রাজত্ব বাড়িয়ে দিন। তিনি বলেছেন আমাকে জান্নাতে একটি ঘর দিন।

কুরআনের ছাত্রীর স্বপ্ন কী হবে।

আজকের পৃথিবী তোমাদের স্বপ্ন শেখায় বড় বাড়ি।বড় গাড়ি।বড় চাকরি।বড় পরিচিতি।কিন্তু কুরআন তোমাদের আরেকটি স্বপ্ন শেখায়।আসিয়া (রাঃ)-এর স্বপ্ন।‌জান্নাতের স্বপ্ন। আল্লাহর সন্তুষ্টির স্বপ্ন।

একজন নারী শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি একটি পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি চাইলে একটি ঘরকে জান্নাতের বাগানে পরিণত করতে পারেন। আবার চাইলে সেই ঘরকে অশান্তির আগুনে জ্বালিয়ে দিতে পারেন।

হযরত খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শক্তি হয়েছিলেন।

আসিয়া (রাঃ) ঈমানের প্রতীক হয়েছিলেন। নূহ (আ.) ও লূত (আ.)-এর স্ত্রীরা সতর্কবার্তা হয়ে গেছেন। কুরআন এ উদাহরণগুলো এজন্যই দিয়েছে, যেন প্রতিটি নারী নিজেকে প্রশ্ন করে আমি কি আমার পরিবারের জন্য রহমত নাকি পরীক্ষা? আমি কি আমার পরিবারের ঈমানকে শক্তিশালী করছি নাকি দুর্বল করছি?

মাদ্রাসার ছাত্রীদের এই শিক্ষা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?

কারণ তোমরা শুধু নিজেদের জন্য পড়ছো না। তোমরা আগামী দিনের পরিবার নির্মাতা। তোমাদের হাতে সন্তান গড়বে। তোমাদের হাতে পরিবার গড়বে। তোমাদের হাতে সমাজ গড়বে।

আজ তোমরা যদি কুরআনের আলো হৃদয়ে ধারণ করো, তাহলে আগামীকাল তোমাদের ঘরগুলো কুরআনের ঘর হবে। আর যদি কুরআন শুধু মুখস্থ থাকে, চরিত্রে না আসে, তাহলে সেই ইলমের উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না।

সূরা তাহরীম আমাদের শিখিয়েছে একজন নারী তার পরিচয়ে বড় নয়, তার ঈমানে বড়। তার সম্পদে বড় নয়, তার তাকওয়ায় বড়। তার সৌন্দর্যে বড় নয়, তার চরিত্রে বড়। তাই তোমরা এমন নারী হও, যাদের উপস্থিতিতে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে। যাদের কথা শুনে পরিবারে শান্তি নেমে আসে। যাদের দোয়ায় ঘরে বরকত আসে।

যাদের কারণে একজন বাবা, একজন স্বামী এবং একদিন একজন সন্তান জান্নাতের পথ খুঁজে পায়।এবং তোমরা এমন কন্যা হও, যাদেরকে দেখে তোমাদের বাবা-মা দুনিয়াতেই অনুভব করেন “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাদেরকে চোখের শীতলতা দান করেছেন।”

এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মেয়ে আছে। কেউ ডাক্তার হবে।

কেউ প্রকৌশলী হবে।‌ কেউ শিক্ষক হবে।‌ কেউ ব্যবসায়ী হবে। কেউ বিখ্যাত হবে।‌ কিন্তু তোমাদের পরিচয় এসবের চেয়েও বড়।‌ তোমরা কুরআনের মেয়ে।‌‌ তোমরা আল্লাহর কালামের বাহক।

তোমাদের বুকের ভেতর সেই কিতাবের আয়াত সংরক্ষিত, যার মাধ্যমে আকাশ ও পৃথিবীর মানুষের হিদায়াত এসেছে।তাই তোমাদের জীবনও সাধারণ হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা উম্মাহাতুল মুমিনীনকে লক্ষ্য করে বলেছেন—

«يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِنَ النِّسَاءِ

হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও।

(সূরা আহযাব : ৩২)

এই আয়াত সরাসরি উম্মাহাতুল মুমিনীনকে উদ্দেশ্য করে নাযিল হয়েছে। কিন্তু এর ভেতরে একটি মহান নীতি রয়েছে

যার মর্যাদা যত বড়, তার দায়িত্বও তত বড়।

যাদের আল্লাহ বিশেষ সম্মান দেন, তাদের জীবনও বিশেষ হওয়া চাই। তাই আজ আমি বলব তুমিও সাধারণ মেয়েদের মতো নও। কারণ তোমার হাতে উপন্যাস নেই, কুরআন আছে। তোমার হৃদয়ে গান নয়, আল্লাহর কালাম আছে। তোমার জীবনের লক্ষ্য শুধু দুনিয়া নয়, জান্নাত।

হাফেজা হওয়া মানে শুধু মুখস্থ করা নয়। অনেকেই মনে করে হিফজ শেষ হয়ে গেছে মানেই কাজ শেষ। হিফজ শেষ হওয়া মানে তো প্রকৃত দায়িত্বের শুরু। কুরআন মুখস্থ করা সহজ। কিন্তু কুরআনকে চরিত্রে ধারণ করা কঠিন। কুরআনকে আচরণে ফুটিয়ে তোলা কঠিন। কুরআনকে জীবনের সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন।

তাই একজন হাফেজা শুধু সেই নয়, যে ত্রিশ পারা মুখস্থ করেছে।‌ প্রকৃত হাফেজা সে যার কথা শুনে মানুষ কুরআনের আদব অনুভব করে। যার আখলাক দেখে মানুষ কুরআনের সৌন্দর্য দেখে। যার জীবন দেখে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে।

তোমার কথায় কুরআন থাকতে হবে। আজ অনেক মানুষ কুরআন পড়ে। কিন্তু কথাবার্তায় আগুন ছড়ায়। অহংকার করে। মানুষকে কষ্ট দেয়। কটূক্তি করে। অপমান করে। এটি কুরআনের চরিত্র নয়।

কুরআনের ছাত্রী যখন কথা বলবে, তার ভাষায় নম্রতা থাকবে। সম্মান থাকবে। শালীনতা থাকবে। দোয়া থাকবে।মানুষকে ছোট করার প্রবণতা থাকবে না। কারণ সে জানে,তার জিহ্বাও আল্লাহর আমানত।

তোমার চাহিদাতেও কুরআন থাকতে হবে

আজকের পৃথিবী শিখায়‌ আরও চাই। আরও পাও। আরও ভোগ কর। কিন্তু কুরআন শিখায়—

«وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى

“তোমার রব তোমাকে এমন দান করবেন যে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।

কুরআনের ছাত্রী সবকিছু মানুষের কাছে চায় না। সে প্রথমে আল্লাহর কাছে চায়।‌সে জানে রিযিকের মালিক আমার বাবা নন। আমার স্বামী নন।‌আমার পরিবার নয়। আমার রিজিকের মালিক আমার রব। তাই সে মানুষের উপর চাপ সৃষ্টি করার আগে আকাশের মালিকের দরজায় কড়া নাড়ে।

তোমার সবরেও কুরআন থাকতে হবে। একদিন হয়তো জীবনে কষ্ট আসবে।‌অভাব আসবে।অসুস্থতা আসবে। ভাঙা স্বপ্ন আসবে। মানুষের অবহেলা আসবে। সেদিন তুমি কী করবে?

সেদিন মনে করবে ইউসুফ (আ.) কষ্ট পেয়েছিলেন। ইয়াকুব (আ.) কেঁদেছিলেন। মরিয়ম (আ.) একাকীত্ব সহ্য করেছিলেন। ফাতিমা (রা.) অভাব সহ্য করেছিলেন। আসমা (রা.) কষ্টের বোঝা বহন করেছিলেন। খাদিজা (রা.) শিয়াবে আবি তালিবে ক্ষুধা সহ্য করেছিলেন। তাহলে আমিও আমার রবের জন্য ধৈর্য ধরব।

কুরআনের ছাত্রী একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। তোমরা শুধু একজন ব্যক্তি নও।‌তোমরা একটি ভবিষ্যৎ। আজ তোমরা একজন বাবার ঘরে আছো। তোমাদেরকে দেখে মানুষ কুরআন সম্পর্কে ধারণা করবে।‌তোমাদের আচরণ দেখে মানুষ মাদ্রাসা সম্পর্কে ধারণা করবে।

তোমাদের চরিত্র দেখে মানুষ দ্বীনি শিক্ষার ফলাফল বিচার করবে।

যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও‌ মানুষ বলবে, কুরআন মানুষকে কৃতজ্ঞ বানায়।‌যদি তোমরা নম্র হও‌ মানুষ বলবে, কুরআন মানুষকে বিনয়ী বানায়।‌ যদি তোমরা ধৈর্যশীল হও মানুষ বলবে, কুরআন মানুষকে শক্তিশালী বানায়।

আর যদি কুরআন মুখে থাকে কিন্তু চরিত্রে না থাকে, তবে মানুষ কুরআনকে নয়, কুরআনের মাদ্রাসাকে দোষারোপ করবে।

তোমরা তোমাদের বাবার ঘরে রহমত হয়ে থাকো।

তোমাদের কারণে যেন কোনো বাবা দুশ্চিন্তা না করে।

তোমাদের কারণে যেন কোনো মা চোখের পানি না ঝরায়।

তোমাদের কারণে যেন কোনো পরিবার অশান্ত না হয়।

তোমরা এমন মেয়ে হও যাদের কণ্ঠে কুরআন আছে, যাদের চোখে লজ্জা আছে, যাদের অন্তরে তাকওয়া আছে, যাদের জীবনে সন্তুষ্টি আছে, যাদের দোয়ায় বাবা-মা আছে, যাদের স্বপ্নে জান্নাত আছে।

বাবার চোখের শীতলতা হও। আমাদের আজকের দীর্ঘ আলোচনার শেষে আমি তোমাদেরকে একটি দোয়ার সামনে নিয়ে আসতে চাই।‌‌এটি কোনো সাধারণ দোয়া নয়। এটি আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের দোয়া। এটি সেই মানুষদের দোয়া, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—তারা রহমানের বান্দা। তাদের দোয়ার একটি অংশ হলো—

«رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ

“হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন। (সূরা ফুরকান : ৭৪)»

খেয়াল করো,তারা আল্লাহর কাছে ধন-সম্পদ চায়নি।

অট্টালিকা চায়নি। ক্ষমতা চায়নি। খ্যাতি চায়নি। তারা চেয়েছে হে আল্লাহ! আমাদের পরিবারকে আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন।

চোখের শীতলতা কাকে বলে‌। মানুষ যখন গভীর কষ্টে থাকে, তখন ঠান্ডা পানি যেমন প্রশান্তি দেয়, তেমনি “কুররাতু আয়ুন” অর্থ এমন কিছু, যা হৃদয়কে শান্ত করে, চোখকে প্রশান্ত করে, আত্মাকে তৃপ্ত করে।

চোখের শীতলতা সেই নয়, যে শুধু সুন্দর। চোখের শীতলতা সেই নয়, যে শুধু মেধাবী।‌চোখের শীতলতা সেই নয়, যে শুধু সফল।‌বরং চোখের শীতলতা সে‌ যাকে দেখে ঈমান বাড়ে।

যার কথা শুনে হৃদয় শান্ত হয়। যার আচরণ মানুষকে আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেয়। যার জন্য বাবা-মা সিজদায় গিয়ে শুকরিয়া আদায় করে।

একজন বাবার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন

পৃথিবীর প্রতিটি বাবার কিছু স্বপ্ন থাকে।‌তিনি চান তাঁর সন্তান ভালো থাকুক।‌মানুষ হোক। কিন্তু একজন ঈমানদার বাবার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো আমার সন্তান আল্লাহওয়ালা হোক।‌ আমার সন্তান জান্নাতের পথিক হোক। আমার সন্তান আমার মৃত্যুর পরও আমার জন্য দোয়া করুক।

অনেক বাবা আছেন, যারা নিজেদের জন্য নতুন কাপড় কেনেন না, কিন্তু মেয়ের জন্য কেনেন।‌নিজেরা ভালো খাবার খান না, কিন্তু সন্তানের মুখে তুলে দেন। নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য।‌অনেক বাবা রাতের অন্ধকারে কেঁদেছেন, কিন্তু সন্তানকে তা বুঝতে দেননি।‌অনেক বাবা নিজের কষ্ট গোপন রেখেছেন, শুধু সন্তানকে হাসিমুখে রাখার জন্য।

তোমরা কি জানো,‌তোমাদের জন্য কত বাবা নীরবে বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন?‌কত বাবা শরীর ভেঙে যাওয়ার পরও কাজ করছেন? কত বাবা দুশ্চিন্তার ভারে রাত জাগছেন?

তুমি কি তোমার বাবার দোয়া, নাকি দুশ্চিন্তা? আজ প্রতিটি কন্যার নিজের হৃদয়ে এই প্রশ্ন করা উচিত। আমি কি আমার বাবার জন্য প্রশান্তি নাকি অশান্তি? আমি কি আমার বাবার জন্য দোয়ার কারণ‌ নাকি দীর্ঘশ্বাসের কারণ?আমাকে দেখে কি আমার বাবা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন নাকি আমার ভবিষ্যৎ, আমার চাহিদা, আমার আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন?

সবচেয়ে সফল মেয়ে সে নয়, যার কাছে সবচেয়ে বেশি সম্পদ আছে। সবচেয়ে সফল মেয়ে সে নয়, যার সবচেয়ে বেশি অনুসারী আছে। সবচেয়ে সফল মেয়ে সে যার জন্য তার বাবা-মা আল্লাহর কাছে হাত তুলে বলে হে আল্লাহ! তোমার শুকরিয়া। তুমি আমাদেরকে এমন একটি সন্তান দান করেছো, যে আমাদের চোখের শীতলতা।

তোমরা এমন মেয়ে হও যাদের ঘরে প্রবেশ করলে বাবা-মায়ের মন ভালো হয়ে যায়।‌তোমরা এমন মেয়ে হও, যাদের তিলাওয়াত শুনে পরিবারের মানুষ জান্নাতের কথা স্মরণ করে। তোমরা এমন মেয়ে হও,‌যাদের কারণে ঘরে রহমত নেমে আসে।‌তোমরা এমন মেয়ে হও,‌যারা মানুষের কাছে কম চায়, কিন্তু আল্লাহর কাছে বেশি চায়। তোমরা এমন মেয়ে হও,যারা অভিযোগ কম করে, শুকরিয়া বেশি আদায় করে।তোমরা এমন মেয়ে হও,যারা পরিবারের উপর বোঝা নয়, পরিবারের বরকত।‌

মনে রেখো, তোমার আব্বু হয়তো ধনী নন। হয়তো তাঁর ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা নেই। হয়তো তাঁর কোনো বড় পদ-পদবি নেই। হয়তো তিনি একজন ইমাম, যিনি ফজর থেকে এশা পর্যন্ত মানুষের দ্বীনের খেদমত করেন। হয়তো তিনি একজন শিক্ষক, যিনি নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে অন্যদের সন্তান মানুষ করেন।

হয়তো তিনি একজন কৃষক, যিনি রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে ঘাম ঝরান। হয়তো তিনি একজন শ্রমিক, যার হাতের রক্ত-ঘামে তোমার বই, খাতা আর পোশাকের ব্যবস্থা হয়।হয়তো তিনি একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু তোমার কাছে তিনি সাধারণ নন। কারণ আল্লাহর পরে পৃথিবীতে তোমার জন্য সবচেয়ে বেশি কাঁদা মানুষটির নাম—তোমার বাবা।

যে মানুষটি নিজের প্রয়োজনকে পিছনে সরিয়ে তোমার প্রয়োজনকে সামনে রাখে। যে মানুষটি নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে তোমার মুখের হাসি দেখতে চায়। যে মানুষটি অনেক সময় নিজের কষ্ট কাউকে বলে না, শুধু তোমাকে ভালো রাখার জন্য।

তুমি তোমার বাবার কাছে পৃথিবী দাবি করো না।‌তুমি তাঁর সামর্থ্যের বাইরে চাওয়ার আগে তাঁর কপালের ঘাম দেখো।

তুমি তাঁর সীমাবদ্ধতার আগে তাঁর ত্যাগ দেখো।‌তুমি তাঁর অপারগতার আগে তাঁর ভালোবাসা দেখো।

তুমি তাঁর জন্য দোয়া করো।‌তুমি তাঁর শক্তি হও। তুমি তাঁর হৃদয়ের প্রশান্তি হও। তুমি এমন মেয়ে হও যার কথা মনে হলে বাবা হাসে। যার জন্য বাবা সিজদায় গিয়ে শুকরিয়া আদায় করে। যার নাম উচ্চারণ করলে মায়ের চোখ ভিজে ওঠে আনন্দে। যাকে দেখে মানুষ বলে এই মেয়েটি তার পরিবারকে সম্মানিত করেছে। তুমি তোমার পরিবারের জন্য নেয়ামত হও। তাহলেই তুমি সফল‌ দুনিয়াতে এবং আখেরাতে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন সহজ করুন।

Scroll to Top