মাওলানা নুরুল আবসার মাসুম ভাই চলে গেলেন।

মাওলানা নুরুল আবসার মাসুম ভাই চলে গেলেন। তার সাথে ছিল আমাদের আত্মীয়তার ও আত্মার বন্ধন। তিনি ছিলেন আমার ভগ্নিপতি। আমাদের পরিবারের একজন অভিভাবক। আমাদের হাসি কান্না সুখ দুঃখের সাথী। পারিবারিক সকল বিষয়ে উত্তম পরামর্শদাতা।

আমার তিন চাচা, ছয় মামা, তিন খালা। পারিবারিক পরিসরটি ছোট নয়। আমরা তিন ভাই বিবাহিত। বৈবাহিক সূত্রে আরও তিনটি পরিবারের সাথে আমাদের রয়েছে আত্মীয়তা। মাওলানা নুরুল আবসার মাসুম ভাই ছিলেন আমাদের দাদা ও নানার ফ্যামিলিতে আমাদের বোনদের মাঝে প্রথম জামাই।

পূর্ন পরিবারের সকলের কাছে তিনি শুধু স্নেহের পাত্র ছিলেন না, নিজের যোগ্যতা এবং নীতি-নৈতিকতার মাধ্যমে শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। এ কথাটিই বাস্তব পরিবারের অনেকের কাছে তিনি ছিলেন সন্তানতুল্য। তিনি ছিলেন আত্মীয়তার সবচাইতে বেশি হক আদায় কারী। সকলের ডাকে সর্বপ্রথম সাড়াদানকারী।

পারিবারিক জীবনে কাছ থেকে দেখা আমার বোন, তার স্ত্রীর উত্তম অভিভাবক। সীমাহীন প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের অধিকারী। প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক বিভিন্ন ব্যস্ততার মাঝে ঘরে পরিবারিক অংশগ্রহণ করতেন। ঘরের কাজে স্ত্রীকে সময় দিতেন। ভাবতে অবাক লাগে প্রাতিষ্ঠানিক এতটা ব্যস্ত একজন মানুষ কখনো নিজ কাপড়গুলো ঘরে স্ত্রীকে ধুতে দিতেন না। নিজের কাপড় গুলো নিজেই ধৌত করতেন। ঘরের স্ত্রী মাছ কাটায় অভ্যস্ত না হওয়ার কারণে নিজ হাতে মাছ কেটে ফ্রিজের মাঝে প্যাকেট করে রাখতেন।

যেকোনো ধরনের অন্যায়ে তিনি ছিলেন সোচ্চার। হক কথা বলতে তার মাঝে কোন দ্বিধা ছিল না। যা বলতেন সামনাসামনি বলতেন। অধিকাংশ সময় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তার স্বপ্ন ও পরিকল্পনা , আমাদের নীতিহীনতা, ইসলামী অঙ্গনে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে তার ব্যথা বেদনার কথা বলতেন।

নিজের শ্রম ও মেধা দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ময়মনসিংহের বুকে ব্যতিক্রম ধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোরআন নিকেতন।

প্রতিষ্ঠানটি ব্যতিক্রমধর্মী এজন্য সম্পূর্ণ চাঁদা কালেকশন মুক্ত ভাবে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব আয়ে ময়মনসিংহ শহরের কাছাকাছি জামতলায় 48% নিজস্ব জায়গা ক্রয় করে প্রতিষ্ঠার মাত্র 22 বছরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার স্কয়ার ফিট জায়গার উপর ফাউন্ডেশন দিয়ে ইতিমধ্যে এক তালার কাজ পূর্ন করেছে।

মাওলানা নুরুল আবসার মাসুম ও মাওলানা ওলিউল্লাহ দুই বন্ধুর যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠা এ প্রতিষ্ঠান থেকে তারা নির্ধারিত কোন অজিফা গ্রহণ করতেন না। নিজস্ব প্রয়োজন পূরণের খরচ নিয়ে বাকি আয় প্রতিষ্ঠানের পিছনে ব্যয় করতেন।

মাওলানা নুরুল আবসার মাসুম আজ দুনিয়াতে নেই। আছে তার প্রতিষ্ঠান কুরআন নিকেতন। যতদিন দুনিয়াতে ছিলেন নিজ স্ত্রী-সন্তানদের তিনি ছিলেন উত্তম অভিভাবক। স্ত্রী সন্তানদের জন্য আরো অনেক কিছুই ভাবার সুযোগ তার ছিল। কিন্তু তিনি ভেবেছেন কুরআন নিকেতন প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। এ এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।

তার জানাজাকে সামনে রেখে তার হাসি কান্নার সাথী মাওলানা ওলিউল্লাহ তার অভিব্যক্তিতে সংক্ষিপ্ত যে মূল্যায়নটি করেছিলেন তা ছিল এমন, মাদ্রাসা বন্ধের মাঝেও এভাবে তিনি মাদ্রাসায় এভাবে পরে থাকতেন আমরা বন্ধু সমাজ তাকে বলতাম তোর কি বাসায় কেউ নেই, বাসায় ভালো লাগেনা।

আসলে স্ত্রী-সন্তানের প্রতি তার দায়িত্বশীলতা ছিল। তাদের হক আদায়ে তিনি তৎপর ছিলেন কিন্তু তার ভালোবাসা ছিল প্রতিষ্ঠানটির সাথে। যে ভালোবাসার তুলনা হয়না।

তার ইন্তেকাল পরবর্তী প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের চোখ থেকে ভালোবাসার যে কান্না আমি দেখেছি মনে হয় না বাবা-মার বিদায়ে তারা এভাবে কাঁদতে পারবে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সময়ের সুযোগ্য আলেমে দ্বীন হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কাজ করতেন।

নিজ প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া সমাপ্ত করার পর নিজ দায়িত্বে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদেরকে ভর্তি করানোর জিম্মাদারী নিজ থেকে পালন করতেন। নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সময় সুযোগে ঘুরে বেড়াতেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কুরআন নিকেতন থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুনাম রয়েছে।

মাওলানা নুরুল আবসার মাসুম ছিলেন আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির একান্ত স্নেহধন্য। চিন্তা চেতনা ফিকিরে দর্শনে তিনি তাকেই অনুসরণ করতেন। পারিবারিক একান্ত আলোচনাতেও এমন কোনো বৈঠক হতো না যেখানে আল্লামা কাসিমীর দৃষ্টিভঙ্গির কথা তিনি বলতেন না। আল্লামা কাসেমীও তাকে ভালোবাসতেন। বিশেষ দৃষ্টিতে দেখতেন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের যেকোনো সফরে মাওলানার প্রতিষ্ঠানে তিনি অবস্থান করতেন।

আজ মাওলানা নুরুল আবসার মাসুম ভাই নেই। আছে তার স্মৃতি। আমরাও ফিরে পাব পাব না প্রিয় মাসুম ভাইকে। জীবদ্দশায় বাবার জন্য সন্তান হারানোর শোক চিন্তা করা যায় না। বাবাপাগল তারতৃতীয় চার বছরের সন্তান এখনো বোঝেনা তার বাবা কোনদিন আর ঘরে ফিরে আসবে না

আমাদের সকলের প্রিয় মাসুম ভাইয়ের জন্য রব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা রাব্বুল আলামীন যেন তাঁকে তার রহমতের কোলে তুলে দেন। তাকে জান্নাতের উচ্চস্তরের ঠিকানা করে দেন। সালেহীন সাদিকিন ও তার প্রিয়দের অন্তর্ভুক্ত করেন।

মাসুম ভাইয়ের সন্তানদের শরয়ী অভিভাবক তার দাদা। উত্তম অভিভাবকত্বের জন্য আল্লাহ তাকে কবুল করে নিন। মাসুম ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান রেখে যাওয়া আমানতের জিম্মাদার মাওলানা ওলিউল্লাহ ভাইকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ পরিবারের কল্যাণে কবুল করুন।

ময়মনসিংহ শহরের দিগারকান্দায় বাবার নিজস্ব বাসায়ই মাসুম ভাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তাঁর ভাইদের সাথে দীর্ঘ সময় থেকেছেন। ছেলে মেয়েরা কিছুটা বড় হওয়ার পর বাবার বাসার কাছেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাসকান্দায় ছোট্ট এক ভাড়া বাসায় তিনি অবস্থান করতেন। মাসুম ভাইয়ের প্রতি তার সন্তানদের প্রতি তার ভাই বোনদের আন্তরিকতা ভালোবাসা বোঝাবার কোন ভাষা আমার কাছে নেই। ভাই বোনদের হক আদায়েও তিনি ছিলেন যত্নশীল।

মাসুম ভাই ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। নিজ শিক্ষার্থী, বন্ধু সমাজ, পরিবার আত্মীয়দের অনুগ্রহ সেবা করেই তিনি আনন্দ পেতেন। কারো অনুগ্রহ তিনি চাননি। স্বার্থের জন্য কারো কাছে কখনো ছোট হননি। মাসুম ভাইয়ের সন্তান পরিবার আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে বর্তমান অবস্থা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠুক।

মাসুম ভাইয়ের সন্তান মাসরুর আবসার ওয়াদী সবেমাত্র কুরআনে কারীমের হিফজ সমাপ্ত করেছে। সন্তান বাবার সর্বোত্তম রেখে যাওয়া সম্পদ। আল্লাহ তাকে বাবার উত্তম ওয়ারিস যোগ্য আলিমে দ্বীন হিসেবে তাকে কবুল করুন।

আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে কবুল করুন।আমরা সবাই যেন সম্মিলিতভাবে মাসুম ভাইয়ের অবশিষ্ট দায়িত্ব পালন করে মাসুম ভাইয়ের আমানতের হেফাজত করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারি সকলের কাছে দোয়া চাই।

Scroll to Top