১৫ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বাভাবিক অভ্যাসে ফেসবুক খুললাম। হঠাৎ দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মধ্যরাতে স্লোগান দিচ্ছে—“তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার!”
মুহূর্তের মধ্যে আমার মুখ থেকে বের হয়ে এলো—“আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেষ।”
কারণ, আওয়ামী লীগ বহু বছর ধরে ‘রাজাকার’ শব্দটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। যেই তাদের বিরোধিতা করেছে, তাকেই তারা কোনো না কোনোভাবে রাজাকার বানানোর চেষ্টা করেছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে পর্যন্ত স্বাধীনতা বিরোধী বলেছে। কাদের সিদ্দিকীকে পর্যন্ত বলা হয়েছে রাজাকার। বিরুদ্ধ মত দমনের জটিল রাজাকার শব্দটিই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে নতুন অর্থে ফিরে এলো, তখন আমার মনে হলো—এটি শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি একটি যুগের অবসানের ঘোষণা।
এরপর ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটতে লাগল যে অনেক সময় বিশ্বাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগকে প্রতিরোধ করছে। ছাত্রলীগ হাল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। ইডেন কলেজে ছাত্রীরা ছাত্রলীগ নেত্রীদের আটকে রেখেছে। চারদিকে উত্তেজনা, প্রতিরোধ আর ক্ষোভ।
শেখ হাসিনার শাসনামলে এটা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। মনে হচ্ছিল মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এসেছে। আন্দোলনের কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিল। সেই সময় আমার মনে হয়েছিল, হয়তো এখানেই সব শেষ হয়ে যাবে। হেফাজতের সেই রাতের স্মৃতি বারবার মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল আবার হয়তো একটি আন্দোলনের সমাপ্তি দেখতে হবে।
কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা ছিল অন্যরকম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফেরার সুযোগ ছিল না। আন্দোলন ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন। সরকারের ফ্যাসিবাদী আচরণে তা জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিল। পরদিন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমে এলো। আন্দোলন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঢাকায়, তারপর সারা দেশে।
১৮ জুলাই এর গল্প। আমি মিরপুর-২ নম্বর কাঁচা বাজার আমার বাসায় ছিলাম। নিচে রাস্তায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখছিলাম। নিজ থেকে করা পুলিশের এলোপাতাড়ি বুলেটে হঠাৎ আমিও গুলিবিদ্ধ হলাম। আল্লাহ হেফাজত করলেন আমার সন্তানদের ছোট বাচ্চাদের সবাইকে সহ আমরা নিচের সংঘর্ষের দৃশ্য দেখছিলাম।
সেই মুহূর্তেও আমার মনে একই কথা এসেছিল—“আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেষ। আমার মনে হচ্ছিল, এই রক্ত বৃথা যেতে পারে না।
প্রতি মুহূর্ত এবং দিনগুলো এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর অস্থিরতার মধ্যে কাটছিল। রাতে ঘুম আসত না। কখন কী ঘটবে, কেউ জানত না।
যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনী মাঠে নামল। আর আওয়ামী সমর্থকরা বলছিল —এবার আন্দোলন শেষ। সত্যি বলতে কী, তখন আমাদের মধ্যেও হতাশা কাজ করছিল।
বারবার মিশরের কথা মনে পড়ছিল। মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুসলিম ব্রাদারহুডের বিশাল আন্দোলনও সেনাবাহিনীর শক্তির সামনে টিকতে পারেনি। তখন মনে প্রশ্ন জাগত—আমাদের এই ছেলেরা কীভাবে পারবে?
কিন্তু পরে বুঝলাম, আমরা আন্দোলনকে রাজনৈতিক হিসাব দিয়ে বিচার করছিলাম, আর শিক্ষার্থীরা বিষয়টিকে দেখছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হিসেবে। তাদের সামনে দুটি পথ ছিল—হয় মৃত্যু, নয়তো বিজয়।
কারণ তারা জানত, যদি শেখ হাসিনার সরকার টিকে যায়, তাহলে আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা কেউ বাঁচবে না। আর ডিবি হারুন এর হুঙ্কার এমনটাই ছিল।
যখন এক দফা ঘোষণা হলো এবং ঢাকা অভিমুখে মার্চের কর্মসূচি এলো, তখনও আমি পুরো বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। উত্তেজনায় কাঁপছিলাম। একদিকে ভয় অন্যদিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নজিরবিহীন কিছু দেখার আশা।
আমার হিসাব ছিল খুব সহজ—রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়।
আমার ভাবনা ছিল হয়তো সংঘাত আরও ভয়াবহ হবে। আওয়ামী লীগ আরেকটি যুদ্ধ করবে কিন্তু ক্ষমতা ছাড়বে না। অন্তত যতদিন শেখ হাসিনা হায়াতে আছে আওয়ামী সরকারের পতন—এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না। এই আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
আমি মনে করি জুলাই বাংলাদেশের বিজয়। এখানে ছাত্র জনতা রাজনৈতিক সংগঠন বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অবদান আলোচনায় আসার প্রয়োজন। সেনাবাহিনী গুলি চালালে পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতো। কিন্তু তারা দেশ প্রেমের পরিচয় দিয়েছে।
শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। বাংলাদেশের আকাশ জুড়ে এক ঝাঁক আবাবিলের আঘাতে। এভাবে ছাত্রদের কচিকাঁচাদের বিদ্রোহে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়া অবিশ্বাস্য। সমস্ত এমপি জেলা থানা ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের পালিয়ে যাওয়া পৃথিবীর বিস্ময়। ৫ আগষ্ট এই প্রজন্মের স্বাধীনতা দিবস। যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এ প্রজন্ম বাংলাদেশকে মুক্ত করেছে। আমরা ৭১ দেখিনি। ২৪ দেখেছি।
সারা দেশে উৎসব শুরু হলো। মানুষ রাস্তায় নেমে এলো। মূর্তিগুলো ভাঙা হলো। আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।
আজ জুলাই আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতার দ্বিতীয় বর্ষ।
আমাদের স্বপ্নগুলো এখন এলোমেলো। জুলাই পরবর্তী আমরা ভেবেছিলাম, একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের অবসান হবে। একটি নতুন বাংলাদেশের সূচনা হবে। কিন্তু কোথায় সে নতুন বাংলাদেশ। তবে আমরা এখনো আশাবাদী। এই অন্ধকারের অবসান হবে এবং ভালো আসবে।