পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মা-বাবার হৃদয়ে একটি স্বপ্ন লালিত হয় আমার সন্তান যেন কষ্ট না পায়।
এই স্বপ্ন ভালোবাসার। এই স্বপ্ন মমতার। এই স্বপ্ন ত্যাগের। একজন বাবা রোদের তাপে ঘাম ঝরান, শুধু সন্তানের মুখে হাসি দেখার জন্য। একজন মা নিজের অনেক ইচ্ছা বিসর্জন দেন, শুধু সন্তানের একটি চাওয়া পূরণ করার জন্য।
তারা চান, যে পথে তারা কাঁটা পায়ে হেঁটেছেন, সন্তান যেন সেই পথে ফুলের বিছানায় হাঁটে। যে কষ্ট তাদের কাঁদিয়েছে, সেই কষ্ট যেন সন্তানের জীবনে না আসে।
কিন্তু এখানেই একটি গভীর প্রশ্ন রয়েছে সন্তানকে সব কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখাই কি সত্যিকার ভালোবাসা?
নাকি ভালোবাসার নামে আমরা অজান্তেই তাকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছি?
অনেক সময় আমরা সন্তানকে কষ্ট থেকে বাঁচাতে গিয়ে তাকে সংগ্রাম করতে শেখাই না। অভাব থেকে বাঁচাতে গিয়ে তাকে সম্পদের মূল্য বুঝতে শেখাই না। প্রতিটি চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে অপেক্ষার শিক্ষা দিই না।
প্রতিটি সমস্যা সরিয়ে দিতে গিয়ে সমস্যা মোকাবিলার শক্তি গড়ে তুলি না।
ফলে এক সময় এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হয় যারা সুন্দর জিনিস ব্যবহার করতে জানে, কিন্তু সুন্দর কিছু তৈরি করতে জানে না। যারা অর্থ ব্যয় করতে জানে, কিন্তু অর্থ উপার্জনের পেছনের ত্যাগ, ঘাম ও পরিশ্রমের গল্প জানে না।
যারা অধিকার দাবি করতে জানে, কিন্তু দায়িত্ব কাঁধে নিতে চায় না। যারা ফল খেতে ভালোবাসে, কিন্তু গাছ লাগানোর ধৈর্য রাখে না। যারা সাফল্যের আলো দেখতে চায়, কিন্তু সেই আলোর জন্য রাত জেগে পরিশ্রম করার মানসিকতা রাখে না।
মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো মহান মানুষ আরামের বিছানায় শুয়ে তৈরি হয়নি। ঝড়ই শক্ত গাছ তৈরি করে। প্রতিকূলতাই মানুষকে পরিণত করে।
সংগ্রামই চরিত্র গড়ে তোলে।
সন্তানকে সবকিছু দিয়ে দেওয়া বড় কথা নয় সন্তানকে এমন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা বড় কথা, যে প্রয়োজনে শূন্য থেকে আবার সবকিছু গড়ে তুলতে পারে।
কারণ উত্তরাধিকার হিসেবে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বাড়ি-গাড়ি নয়, বরং এমন একটি চরিত্র, যা বিপদের সময় ভেঙে পড়ে না; এমন একটি মন, যা পরিশ্রমকে ভয় পায় না; এবং এমন একটি ঈমান, যা তাকে প্রতিটি অবস্থায় সঠিক পথে পরিচালিত করে।
কুরআনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক শিক্ষা
**********************************
আল্লাহ তাআলা বলেন—
«﴿وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ﴾
তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের সম্পদ তুলে দিও না।
এই আয়াতটি শুধু একটি পারিবারিক নির্দেশনা নয়, এটি একটি সভ্যতা নির্মাণের নীতি, একটি অর্থনৈতিক দর্শন এবং একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখার মৌলিক সূত্র।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন।0আল্লাহ বলেননি সম্পদ নষ্ট করো না। বরং বলেছেন সম্পদ ভুল মানুষের হাতে দিও না। এটা কুরআনের একটি অসাধারণ বাস্তব শিক্ষা।
কারণ পৃথিবীতে অধিকাংশ সম্পদ অযোগ্য মানুষের কারণে ধ্বংস হয়। একটি বাড়ি হঠাৎ করে ধ্বংস হয়ে যায় না। বছরের পর বছর অবহেলা, অদূরদর্শিতা এবং ভুল সিদ্ধান্ত তাকে ধ্বংস করে।
একটি ব্যবসা একদিনে দেউলিয়া হয় না। ভুল পরিকল্পনা, অপচয়, অহংকার এবং অদক্ষতা ধীরে ধীরে তাকে পতনের দিকে নিয়ে যায়। একটি প্রতিষ্ঠান একদিনে ভেঙে পড়ে না দায়িত্বজ্ঞানহীন নেতৃত্ব তাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
আর একটি জাতি, কোনো জাতি রাতারাতি ধ্বংস হয় না। যখন সেই জাতির মানুষ দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলে, পরিশ্রমের পরিবর্তে ভোগকে ভালোবাসতে শুরু করে, উৎপাদনের পরিবর্তে অপচয়ে মগ্ন হয়ে যায়, তখন তার পতন শুরু হয়ে যায়।
এ কারণেই কুরআন সম্পদের চেয়ে মানুষের যোগ্যতার উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ সম্পদ নিজে ভালো বা মন্দ নয়। সম্পদ যার হাতে যায়, তার চরিত্রের রঙ ধারণ করে।
একজন বিচক্ষণ মানুষের হাতে সম্পদ গেলে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। একজন উদার মানুষের হাতে সম্পদ গেলে তা মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়। একজন আল্লাহভীরু মানুষের হাতে সম্পদ গেলে তা দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার মাধ্যম হয়।
কিন্তু একজন অদূরদর্শী মানুষের হাতে সম্পদ গেলে তা অপচয়ের আগুনে পুড়ে যায়। এই কারণেই কুরআন প্রথমে সম্পদ নয়, মানুষ গড়ার কথা বলে।
প্রথমে চরিত্র। প্রথমে প্রজ্ঞা। প্রথমে দায়িত্ববোধ। প্রথমে আত্মনিয়ন্ত্রণ। তারপর সম্পদ। আজ আমরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করি আমার সন্তানের জন্য কত সম্পদ রেখে যেতে পারব?
কিন্তু কুরআন আমাদের আরেকটি প্রশ্ন করতে শেখায়
আমার সন্তান কি সেই সম্পদের যোগ্য হওয়ার মতো মানুষ হয়ে উঠছে?”
কারণ একজন যোগ্য মানুষ শূন্য হাতে শুরু করেও সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু একজন অযোগ্য মানুষ পাহাড়সম সম্পদ পেয়েও তা রক্ষা করতে পারে না।
ইতিহাস সাক্ষী অনেক মানুষ উত্তরাধিকার হিসেবে কিছুই পায়নি, কিন্তু চরিত্র, দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ইতিহাস তৈরি করেছে। আবার অনেক মানুষ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও নিজেদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে।
তাই কুরআনের শিক্ষা হলো সম্পদ রক্ষার প্রথম শর্ত তালা নয়, যোগ্য মানুষ। সম্পদ বৃদ্ধির প্রথম শর্ত পুঁজি নয়, প্রজ্ঞা। আর একটি জাতির উন্নতির প্রথম শর্ত সম্পদ নয়, দায়িত্বশীল মানুষ।
এই কারণেই আল্লাহ বলেন—
«﴿وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ﴾»
কারণ সম্পদের সবচেয়ে বড় বিপদ চোর নয়। সম্পদের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো অযোগ্য হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া।
সম্পদ শুধু টাকা নয়
*******************
আমরা যখন “সম্পদ” শব্দটি শুনি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে টাকা, জমি, বাড়ি, ব্যবসা কিংবা ব্যাংক ব্যালেন্স।
কিন্তু কুরআন সম্পদকে শুধু টাকা হিসেবে দেখেনি।আল্লাহ তাআলা সম্পদ সম্পর্কে এমন একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার ভেতরে গভীর অর্থ লুকিয়ে আছে। তিনি বলেছেন
«﴿الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا﴾
যাকে আল্লাহ তোমাদের জীবনের অবলম্বন বানিয়েছেন।”
এখানে আল্লাহ “মাল” বা সম্পদকে “قِيَامًا” বলেছেন।অর্থাৎ এমন কিছু, যার উপর একটি জীবন দাঁড়িয়ে থাকে। একটি পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে। একটি সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে। একটি জাতি দাঁড়িয়ে থাকে।
মানুষের জীবন যদি একটি ভবনের মতো হয়, তাহলে সম্পদ তার ভিত্তির মতো। ভিত্তি দুর্বল হলে যেমন অট্টালিকা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, তেমনি সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণ ছাড়া ব্যক্তি, পরিবার কিংবা জাতির স্থিতিশীলতাও টিকে থাকে না।্যএই কারণেই ইসলাম সম্পদকে অবহেলা করতে শেখায় না।
আবার সম্পদের দাস হতেও শেখায় না। বরং সম্পদকে একটি আমানত হিসেবে দেখতে শেখায়।একটি শক্তি হিসেবে দেখতে শেখায়। একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখতে শেখায়।
সম্পদ শুধু পকেটে থাকে না। সম্পদ মানুষের জীবন গঠন করে। সম্পদ দিয়ে সন্তান শিক্ষিত হয়। সম্পদ দিয়ে পরিবার নিরাপত্তা পায়। সম্পদ দিয়ে অসহায় মানুষের মুখে খাবার পৌঁছে যায়। সম্পদ দিয়ে মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল ও কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সম্পদ দিয়ে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে সম্পদকে কখনো ঘৃণা করা হয়নি।
ঘৃণা করা হয়েছে সম্পদের অপব্যবহারকে। নিন্দা করা হয়েছে সম্পদের অহংকারকে। কিন্তু হালাল সম্পদ অর্জন, সংরক্ষণ এবং কল্যাণে ব্যয় করাকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
“সুফাহা” কারা?
***************
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ﴾
তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের সম্পদ তুলে দিও না।
আমরা সাধারণত মনে করি, নির্বোধ মানে হলো কম বুদ্ধির মানুষ, কম শিক্ষিত মানুষ। কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে বিষয়টি ভিন্ন। অনেক সময় উচ্চ ডিগ্রী সম্পন্ন একজন ব্যক্তি কুরআনের ভাষায় “সফীহ” হতে পারে। কারণ “সফীহ” হওয়ার সম্পর্ক শুধু বুদ্ধির সঙ্গে নয়; বরং সঠিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে। শুধু বর্তমানের সঙ্গে নয়; বরং ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতার সঙ্গে।
কুরআনের ভাষায় সফীহ সেই ব্যক্তি যে আজকের আনন্দের জন্য আগামীকালের ক্ষতি করে। যে সাময়িক সুখের জন্য স্থায়ী কল্যাণ নষ্ট করে।
যে আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু পরিণতি নিয়ে চিন্তা করে না।
যে মুহূর্তের উত্তেজনায় এমন কাজ করে, যার অনুশোচনা তাকে বছরের পর বছর বহন করতে হয়।
যে বীজ খেয়ে ফেলে, কিন্তু ফসলের অপেক্ষা করতে পারে না। যে আজকে ভোগ করতে চায়, কিন্তু আগামীকাল সৃষ্টি করতে চায় না।
আজকের সংকট ভোগবাদের কারাগারে বন্দী মানুষ
*******************************************
দশ বছর আগে কি মানুষের কাছে সুখ কম ছিল?বিশ বছর আগে কি মানুষ হাসত কম? আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদীরা কি সবসময় দুঃখী ছিলেন?
আজ আমাদের ঘরে এমন অনেক জিনিস আছে, যা একসময় মানুষ কল্পনাও করতে পারত না। আজ আমাদের হাতে স্মার্টফোন আছে। পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডার আমাদের আঙুলের স্পর্শে। ইন্টারনেট আছে। এয়ারকন্ডিশন আছে। দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে। অসংখ্য সুযোগ আছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আমাদের জীবন অনেক বেশি আরামদায়ক।
তাহলে মানুষের অস্থিরতা এত বেড়ে গেল কেন? কেন মানুষ আগের চেয়ে বেশি হতাশ? কেন উদ্বেগ বাড়ছে?
কেন অসন্তুষ্টি বাড়ছে? কেন মানুষ এত কিছু পাওয়ার পরও মনে করছে “আমার আরও কিছু দরকার”?
সমস্যা সম্পদের স্বল্পতা নয়। সমস্যা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। একসময় মানুষ বেঁচে থাকত প্রয়োজনের জন্য। আজ অনেক মানুষ বেঁচে আছে প্রদর্শনের জন্য।
একসময় মানুষ জিনিস কিনত ব্যবহার করার জন্য।
আজ অনেক মানুষ জিনিস কিনে অন্যদের দেখানোর জন্য।
একসময় মানুষ ঘর বানাত থাকার জন্য। আজ অনেক মানুষ ঘর বানায় মানুষকে দেখানোর জন্য। একসময় পোশাক ছিল শরীর ঢাকার মাধ্যম। আজ অনেক ক্ষেত্রে পোশাক হয়ে গেছে পরিচয় প্রদর্শনের মাধ্যম।
একসময় সম্পদ ছিল জীবনের সহায়ক। আজ অনেকের কাছে সম্পদ হয়ে গেছে সম্মান অর্জনের মাপকাঠি।
রাসূল ﷺ কী ধরনের মানুষ গড়ে তুলেছিলেন?
**************************************
তিনি এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলেছিলেন, যারা পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। তিনি এমন মানুষ তৈরি করেছিলেন যারা মসজিদে সিজদা করেছে,
আবার বাজারেও নেতৃত্ব দিয়েছে।
যারা রাতের অন্ধকারে কেঁদে কেঁদে তাহাজ্জুদ পড়েছে,
আবার দিনের আলোতে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। যারা কুরআন তিলাওয়াত করেছে, আবার পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। যারা আল্লাহকে ভয় করেছে, কিন্তু পৃথিবীর কোনো শক্তিকে ভয় করেনি।
মসজিদ থেকে বাজার পর্যন্ত
*************************
রাসূল ﷺ এমন কোনো উম্মাহ তৈরি করেননি, যারা শুধু অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকবে। বরং তিনি এমন উম্মাহ তৈরি করেছিলেন, যারা নিজেরা দাঁড়াবে এবং অন্যদেরও দাঁড় করাবে।
মদিনায় হিজরতের পর তিনি শুধু মসজিদ নির্মাণ করেননি। তিনি বাজারও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।0কারণ তিনি জানতেন একটি জাতি শুধু ইবাদত দিয়ে টিকে থাকে না। একটি জাতির প্রয়োজন ঈমানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক শক্তি। একটি জাতির প্রয়োজন চরিত্রের পাশাপাশি কর্মক্ষমতা। একটি জাতির প্রয়োজন তাকওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা।
সাহাবীরা শুধু আলেম ছিলেন না
***************************
রাসূল ﷺ-এর সাহাবীরা শুধু জ্ঞানী ছিলেন না। তারা ছিলেন দক্ষ। তারা ছিলেন কর্মঠ। তারা ছিলেন উদ্যোক্তা। তারা ছিলেন নির্মাতা। তারা ছিলেন নেতৃত্বদাতা। মদিনায় এসে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি কারও কাছে হাত পাতেননি।
তিনি বলেননি “আমাকে কিছু দিন। তিনি বলেছিলেন “আমাকে বাজারের পথ দেখিয়ে দিন। তিনি সাহায্য নয়, সুযোগ চেয়েছিলেন। ভিক্ষা নয়, কাজ চেয়েছিলেন। নির্ভরতা নয়, সক্ষমতা চেয়েছিলেন।
নেওয়ার মানসিকতা নয়, দেওয়ার মানসিকতা
***************************************
আজ অনেক মানুষ জীবনের শুরু থেকেই একটি প্রশ্ন নিয়ে বড় হয় আমি কী পাব?
কিন্তু রাসূল ﷺ তাঁর সাহাবীদের শিখিয়েছিলেন অন্য প্রশ্ন করতে আমি কী দিতে পারি? আমি সমাজকে কী দিতে পারি? আমি উম্মাহকে কী দিতে পারি? আমি মানুষের উপকারে কীভাবে আসতে পারি?
কারণ যে জাতির অধিকাংশ মানুষ শুধু নিতে চায়, সে জাতি দুর্বল হয়ে যায়। আর যে জাতির অধিকাংশ মানুষ দিতে চায়, সে জাতি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
রাসূল ﷺ একটি কর্মক্ষম উম্মাহ গড়েছিলেন।তিনি এমন উম্মাহ গড়েছিলেন যারা জমি চাষ করেছে। যারা ব্যবসা করেছে। যারা শিল্প গড়েছে। যারা জ্ঞানচর্চা করেছে। যারা নতুন নতুন অঞ্চলকে আলোকিত করেছে। যারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।
তাদের হাতে কুরআন ছিল। কিন্তু তাদের হাত কর্মহীন ছিল না। তাদের হৃদয়ে তাকওয়া ছিল। কিন্তু তাদের জীবনে উদ্যোগও ছিল। তাদের চোখে আখিরাত ছিল।
কিন্তু তারা দুনিয়ার দায়িত্ব থেকেও পলায়ন করেনি।
আজ আমাদের কী শেখা দরকার? আজকের যুবকদের সামনে রাসূল ﷺ-এর শিক্ষা নতুন করে তুলে ধরার সময় এসেছে। ইসলাম আমাদের অলস হতে শেখায় না। অক্ষম হতে শেখায় না। অন্যের উপর বোঝা হয়ে বাঁচতে শেখায় না।
ইসলাম আমাদের শেখায় নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলো, যেন তুমি মানুষের জন্য উপকারের কারণ হতে পারো। নিজেকে এমনভাবে তৈরি করো, যেন তোমার হাত গ্রহণের জন্য নয়, দানের জন্য প্রসারিত হয়।
নিজেকে এমনভাবে গড়ো, যেন তুমি শুধু নিজের জীবনের পরিবর্তন না ঘটিয়ে, পরিবার, সমাজ এবং জাতির পরিবর্তনের কারণ হতে পারো।
কারণ রাসূল ﷺ-এর স্বপ্ন ছিল না একটি ভিক্ষুক উম্মাহ। তিনি গড়ে তুলেছিলেন এমন একটি উম্মাহ, যারা আল্লাহর সামনে বিনয়ী, কিন্তু মানুষের সামনে মর্যাদাবান; যারা অন্তরে তাকওয়াবান, কিন্তু কর্মে শক্তিশালী; যারা গ্রহণকারী নয়, বরং দাতা; যারা অনুসারী নয়, বরং পথপ্রদর্শক। এটাই ছিল সাহাবীদের পরিচয়। আর এটাই হওয়া উচিত আজকের মুসলিম যুবকের লক্ষ্য।
কেন অনেক সম্পদশালী পরিবারের পতন হয়
**************************************
অনেক মানুষ শূন্য থেকে শুরু করে সাম্রাজ্য গড়ে।অভাব থেকে উঠে এসে সম্পদের পাহাড় তৈরি করে।
সংগ্রাম, পরিশ্রম, ত্যাগ আর অগণিত কষ্টের মাধ্যমে একটি পরিবারের ভাগ্য বদলে দেয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো যে সম্পদ গড়তে একজন মানুষের সারাজীবন লেগেছে, সেই সম্পদ কখনো কখনো তার মৃত্যুর পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই হারিয়ে যায়।
কেন এমন হয়? কেন অনেক সম্পদশালী পরিবারের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যায়?
সম্পদ হারায় না, সম্পদের যোগ্যতা হারিয়ে যায়। আসলে সমস্যা সম্পদে নয়। সমস্যা মানুষে। অনেক পরিবার সম্পদ হস্তান্তর করে। কিন্তু সম্পদ তৈরির মানসিকতা হস্তান্তর করে না। সম্পত্তি হস্তান্তর করে।কিন্তু দায়িত্ববোধ হস্তান্তর করে না। ব্যবসা হস্তান্তর করে। কিন্তু ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা হস্তান্তর করে না।ধন-সম্পদ হস্তান্তর করে। কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করে না। ফলে পরবর্তী প্রজন্ম সম্পদের মালিক হয়,কিন্তু সম্পদের রক্ষক হতে পারে না।
যে কষ্ট দেখেনি, সে মূল্যও বুঝে না। একজন বাবা হয়তো জীবনের ত্রিশ বছর কাটিয়েছেন সংগ্রামে। একটি দোকান দাঁড় করানোর জন্য কত রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। এক টুকরো জমি কেনার জন্য কত ইচ্ছা বিসর্জন দিয়েছেন। সন্তানের পড়াশোনার জন্য কত স্বপ্ন কুরবান করেছেন।
কিন্তু যে সন্তান সবকিছু প্রস্তুত অবস্থায় পেয়েছে, সে হয়তো সেই গল্প জানেই না। সে দেখে ফল। কিন্তু গাছের পরিচর্যা দেখে না। সে দেখে ভবন। কিন্তু ইট বহনের কষ্ট দেখে না। সে দেখে সম্পদ। কিন্তু সম্পদ সৃষ্টির ইতিহাস দেখে না। ফলে সম্পদের মূল্য তার কাছে কমে যায়।
সন্তানকে কী শেখাবেন?
********************
আজ অধিকাংশ মা-বাবার একটি সাধারণ চিন্তা আমার সন্তান ভালোভাবে পড়াশোনা করুক।
এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীতে অসংখ্য উচ্চশিক্ষিত মানুষ আছেন, যারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন। আবার অনেক মানুষ আছেন, যাদের ডিগ্রি কম, কিন্তু প্রজ্ঞা, দায়িত্ববোধ এবং চরিত্রের কারণে তারা সমাজের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছেন।
তাই সন্তানকে শুধু বলবেন না পড়াশোনা কর।
বরং তাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যা তার পুরো জীবনকে গড়ে তুলবে।
আপনার সন্তানকে শ্রমের মর্যাদা শেখান। কোনো হালাল কাজ ছোট নয়। ছোট ব্যবসা লজ্জার নয়। ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করা অপমানের নয়। অপমান হলো অন্যের উপর বোঝা হয়ে বেঁচে থাকা।
রাসূল ﷺ নিজ হাতে কাজ করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম ব্যবসা করেছেন, কৃষিকাজ করেছেন, পরিশ্রম করেছেন। যে সন্তান শ্রমকে সম্মান করতে শেখে, সে কখনো অলসতা ও নির্ভরতাকে ভালোবাসে না।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে পাওয়া যায়। এক ক্লিকে খাবার আসে।
এক স্পর্শে তথ্য আসে। এক মুহূর্তে যোগাযোগ হয়।
ফলে ধীরে ধীরে মানুষ অপেক্ষার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
কিন্তু জীবনের বড় অর্জনগুলো কখনো তাড়াহুড়ো করে আসে না। একটি বীজ বপন করলেই পরদিন ফল পাওয়া যায় না। একটি শিশুকে জন্ম দিলেই পরদিন সে বড় হয়ে যায় না। একটি ব্যবসা শুরু করলেই পরদিন সফল হয় না।
সন্তানকে শেখান সব ভালো জিনিস সময় চায়।
সব বড় স্বপ্ন ধৈর্য চায়। সব অর্জনের পেছনে অপেক্ষা আছে। যে অপেক্ষা করতে পারে না, সে জীবনের অনেক বড় সফলতা থেকেও বঞ্চিত হয়।
আজকের পৃথিবী মানুষকে খরচ করতে শেখায়।
কিন্তু খুব কম মানুষ সঞ্চয় করতে শেখায়। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই বুঝিয়ে দিন প্রত্যেক আয়ের সবটুকু ব্যয় করার জন্য নয়। প্রত্যেক সম্পদের একটি অংশ ভবিষ্যতের জন্য। একটি জাতির শক্তি শুধু তার আয়ে নয়। তার পরিকল্পনায়। তার দূরদর্শিতায়। তার সঞ্চয় করার ক্ষমতায়।
যে ব্যক্তি আজকের সবকিছু আজই শেষ করে ফেলে, সে আগামীকালকে দুর্বল করে দেয়।সঞ্চয় শুধু অর্থ জমা রাখা নয়। সঞ্চয় হলো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
একটি বড় ভুল ধারণা হলোআমার অনেক সম্পদ হলে দান করব। বাস্তবে দান করার অভ্যাস সম্পদ থেকে আসে না।দান করার অভ্যাস হৃদয় থেকে আসে।
সন্তানকে শেখান সামান্য হলেও দাও। অল্প হলেও ভাগ করো। নিজের জন্য যেমন ভাবো, অন্যের জন্যও তেমন ভাবো। কারণ যে হাত দিতে শেখে, আল্লাহ সেই হাতকে আরও দেওয়ার যোগ্য বানিয়ে দেন।
দান সম্পদ কমায় না। দান মানুষের হৃদয়কে বড় করে।
সম্পদকে বরকতময় করে।আর যে মানুষ শুধু নিজের জন্য জমা করে, সে কখনো প্রকৃত তৃপ্তি পায় না।
কুরআনের ভাষায় “রুশদ” অর্জনের প্রয়োজন
*************************************
আল্লাহ তাআলা সূরা নিসার পরবর্তী আয়াতে বলেন—
«﴿فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ﴾
“যদি তোমরা তাদের মধ্যে রুশদ (পরিপক্বতা ও বিচক্ষণতা) দেখতে পাও, তাহলে তাদের সম্পদ তাদের হাতে তুলে দাও।”
এই আয়াতের প্রতিটি শব্দের মধ্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের এক অসাধারণ শিক্ষা লুকিয়ে আছে।
আল্লাহ বলেননি, তারা বয়স্ক হয়ে গেলে তাদের সম্পদ দিয়ে দাও। আল্লাহ বলেননি, তারা বালেগ হয়ে গেলে তাদের সম্পদ দিয়ে দাও। বরং বলেছেন যখন তাদের মধ্যে রুশদ দেখতে পাবে। অর্থাৎ শুধু বয়স বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। শুধু শরীরের বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। শুধু শিক্ষাগত সনদ যথেষ্ট নয়। দরকার “রুশদ”।
রুশদ আসলে কী? রুশদ এমন একটি গুণ, যা মানুষকে শুধু শিক্ষিত নয়, বিচক্ষণ বানায়। শুধু বুদ্ধিমান নয়, দায়িত্বশীল বানায়। রুশদ হলো সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সামনের লাভের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষতিকে দেখতে পারার ক্ষমতা।আজকের আনন্দের চেয়ে আগামীকালের কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষমতা।
বড় হওয়া আর পরিপক্ব হওয়া এক জিনিস নয়। আজ আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা বয়সে বড় হয়েছে, কিন্তু চিন্তায় বড় হয়নি।
একজন মানুষ চল্লিশ বছর বয়সেও অপরিপক্ব হতে পারে। আবার একজন যুবক বিশ বছর বয়সেও অসাধারণ পরিপক্ব হতে পারে। কারণ পরিপক্বতার মাপকাঠি বয়স নয়।পরিপক্বতার মাপকাঠি হলো সিদ্ধান্ত।
রুশদ অর্জন ছাড়া সম্পদও বিপদ হয়ে যায়। একজন মানুষের হাতে সম্পদ থাকতে পারে, কিন্তু রুশদ না থাকলে সেই সম্পদই তার পতনের কারণ হতে পারে।
একজন মানুষের হাতে ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু রুশদ না থাকলে সেই ক্ষমতাই অত্যাচারে পরিণত হতে পারে। একজন মানুষের হাতে জ্ঞান থাকতে পারে,
কিন্তু রুশদ না থাকলে সেই জ্ঞানই অহংকারের কারণ হতে পারে। এই কারণেই কুরআন সম্পদের আগে রুশদের কথা বলেছে। কারণ সম্পদ পরিচালনার জন্য শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজন প্রজ্ঞা। শুধু মালিকানা নয়, প্রয়োজন দায়িত্ববোধ।
একটি জাতির উত্থান কোথা থেকে শুরু হয়?
অনেক মানুষ মনে করে কোনো জাতির উন্নতি শুধু সম্পদের উপর নির্ভর করে।
কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। পৃথিবীতে এমন বহু দেশ আছে, যাদের মাটির নিচে অঢেল সম্পদ ছিল, কিন্তু তারা উন্নত হতে পারেনি। আবার এমন বহু জাতি আছে, যাদের প্রাকৃতিক সম্পদ খুবই সীমিত ছিল, কিন্তু তারা পৃথিবীর নেতৃত্ব দিয়েছে।
কুরআনের শিক্ষা তাই অত্যন্ত স্পষ্ট সম্পদ রক্ষা করতে চাইলে প্রথমে মানুষ গড়ো। সম্পদ বাড়াতে চাইলে প্রথমে চরিত্র গড়ো। আর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে চাইলে আগামী প্রজন্মকে দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলো।
এটাই সূরা নিসার এই আয়াতের প্রাণ, এটাই পরিবার গঠনের শিক্ষা, এটাই একটি শক্তিশালী উম্মাহ নির্মাণের ভিত্তি।