মানুষের জীবনে আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামতগুলোর একটি হলো—পরিবার। মানুষ যতই সমাজে সম্মান, সম্পদ বা সুনাম অর্জন করুক। যদি ঘরে শান্তি না থাকে, তবে সবই অর্থহীন। পারিবারিক শান্তি দুনিয়ার জান্নাত। পারিবারিক অশান্তি একজন ব্যক্তির জন্য দুনিয়াকে জাহান্নামে পরিণত করে।
কুরআনের পরিবার দর্শন
আল্লাহ বলেন—
وَمِنۡ ءَایَـٰتِهِۦۤ أَنۡ خَلَقَ لَكُم مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ أَزۡوَ ٰجࣰا لِّتَسۡكُنُوۤا۟ إِلَیۡهَا وَجَعَلَ بَیۡنَكُم مَّوَدَّةࣰ وَرَحۡمَةًۚ إِنَّ فِی ذَ ٰلِكَ لَـَٔایَـٰتࣲ لِّقَوۡمࣲ یَتَفَكَّرُونَ
এই আয়াতে আল্লাহ বলেছেন لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا – “তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাবে।”
— রূম: ২১
অর্থাৎ পরিবার শুধু একটি সম্পর্ক নয় এটা মানসিক আশ্রয় আত্মার ঠিকানা, জীবনের নিরাপদ দুর্গ। এই শান্তি, দয়া ও ভালোবাসা ভেঙে গেলে মানুষ ভেঙে যায়, সমাজ ভেঙে যায়।
পরিবার ভাঙনকে সহজ সমাধান ভাবা ভুল। আজ সমাজে একটি ভয়াবহ ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে পরিবার ভাঙন খুব সহজ একটি সিদ্ধান্ত মনে করা হয়।
ঝগড়া–রাগ–অভিমান হলেই অনেকে বলে “চলে গেলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু আসল সত্য হলো। বাড়ি ভাঙা যত সহজ, আবার গড়া তত কঠিন।
১. যৌক্তিকভাবে বুঝুন: পরিবার ভাঙন সমাধান নয়, সমস্যা বৃদ্ধি
আপনি ভাবছেন আলাদা হলে শান্তি পাবেন। বাস্তবে দেখা যায় অশান্তি আরও বাড়ে।
আপনি ভাবছেন দু’জনের সমস্যা কিন্তু ভেঙে যায় দুই পরিবারের সম্পর্ক, আত্মীয়তা, সামাজিক সমন্বয়।
আপনি ভাবছেন কষ্ট থেকে মুক্তি কিন্তু জন্ম হয় নতুন কষ্ট, নতুন দায়, নতুন মানসিক চাপের।
আপনি ভাবছেন বিচ্ছেদে অপমান থেকে রক্ষা পাবেন
কিন্তু বাস্তবে অনুতাপ, লজ্জা ও শূন্যতা ঘিরে ধরে এটাই বাস্তবতা।
২. একটি পরিবারের অশান্তি ফলাফল হলো
• একটি শিশু রাতে ঘুমাতে পারে না। কারণ মা–বাবার ঝগড়া তার কানে বাজে।
• একটি মেয়ে নীরবে কাঁদে। কারণ বাবার এক সিদ্ধান্তে পুরো সংসার ভেঙে গেছে।
• একটি ছেলে রাস্তায় বন্ধুদের সামনে মাথা নিচু করে।কারণ তার পরিবার ভেঙে গেছে।
এগুলো কাগজের ঘটনা নয়। এগুলো মানুষের হৃদয়ের কান্না।
শয়তানের সবচেয়ে বড় বিজয়: পরিবার ভাঙন
عَنْ جَابِرٍ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ:
«إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ، ثُمَّ يَبْعَثُ سَرَايَاهُ، فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً.
يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ: فَعَلْتُ كَذَا وَكَذَا، فَيَقُولُ: مَا صَنَعْتَ شَيْئًا.
ثُمَّ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ: مَا تَرَكْتُهُ حَتَّى فَرَّقْتُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ،
فَيُدْنِيهِ مِنْهُ، وَيَقُولُ: نِعْمَ أَنْتَ».
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
“ইবলিস তার সিংহাসন পানির উপর স্থাপন করে।
তারপর সে তার সেনাদলকে (মানুষকে ফিতনায় ফেলতে) প্রেরণ করে। তাদের মধ্যে মর্যাদায় তার কাছে সবচেয়ে নিকটবর্তী হলো সে যে সবচেয়ে বড় ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে।
এক শয়তান এসে বলে: ‘আমি অমুক-তমুক কাজ করেছি।’ ইবলিস বলে ‘তুমি কিছুই করনি।’
এরপর আরেক শয়তান এসে বলে:
‘আমি তাকে এমনভাবে ছাড়িনি যতক্ষণ না আমি
তার সঙ্গে তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছি।’
তখন ইবলিস তাকে কাছে ডেকে নেয় এবং বলে:
‘তুমি খুব ভালো কাজ করেছ।
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৮১৩
শয়তানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য: “ফিতনা”
হাদীস বলে—
শয়তান তার সৈন্যদের পাঠায় এবং দেখে—
“কার হাতে কত বড় ফিতনা সৃষ্টি হলো।”
অর্থাৎ—যদি কেউ মানুষকে নষ্ট করল, কারও ঈমান দুর্বল করল, কারও মধ্যে হিংসা-বদনাম ছড়াল ইবলিস তা তেমন গুরুত্ব দেয় না।
৩. কিন্তু যে স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা করে সেই শয়তানের সেরা! হাদীসের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ—
আমি তাকে ছাড়িনি যতক্ষণ না তার সাথে তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি।”এ কথা শুনে— ইবলিস তাকে কাছে টেনে নেয়, বলে: ‘তুমি খুব ভালো কাজ করেছ।’
এমনকি আলিঙ্গনও করে!
এতে বোঝা যায়—
দাম্পত্য ভাঙা সাধারণ গোনাহ নয়
এটি শয়তানের সবচেয়ে পছন্দের কাজ
পরিবার ভেঙে গেলে সমাজও ভাঙে
অর্থাৎ—একটি পরিবার ভাঙলে শয়তান উল্লাস করে!
আমরা কি সে কাজে তাকে খুশি করবো?
কেন শয়তান বিচ্ছেদকে সবচেয়ে মূল্যবান কাজ মনে করে?
কারণ—
(১) পরিবার ইসলামের ভিত্তি
পরিবার ধ্বংস মানে সমাজ ধ্বংস।
(২) বিচ্ছেদে শত্রুতা, গীবত, অপবাদ, হিংসা—সব জন্ম নেয়।এক বিবাদে কত গুনাহ জমে যায়।মানুষ টেরই পায় না।
পরিবার ভাঙা মানে—
শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভাঙা নয় বরং শিশুদের ভবিষ্যৎ ভাঙা পিতামাতার স্বপ্ন ভাঙা আত্মীয়দের বন্ধন ছিন্ন করা সমাজের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করা
একটি রাগের সিদ্ধান্তে একটি গোটা প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পরিবার ভাঙনের কারণ
১.অহংকার। রাসুল ﷺ:
“হৃদয়ে অহংকার থাকলে জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে না।”— মুসলিম
২. সন্দেহ। কোরআন: ﴿اجتنبوا كثيرًا من الظن﴾— হুজুরাত: ১২
৩. রাগ ও কঠোর ভাষা।রাসুল ﷺ: “শক্তিশালী সে–যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।”— বুখারি
৪. দায়িত্বহীনতা ﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴾
সুন্দর আচরণ—এটাই পরিবার টিকিয়ে রাখার মূলনীতি।— নিসা: ১৯
কুরআন যে সমাধান দিয়েছে
১. আপস-মীমাংসা وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
— নিসা: ১২৮ “আপস-মীমাংসাই উত্তম।”
২. উভয় পক্ষ সত্যিকারভাবে শান্তি চাইলে আল্লাহ সাহায্য করেন إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا
— নিসা: ৩৫
৩. পরিবার থেকে বিচারক এনে সমাধান
একই আয়াতে নির্দেশ—
“উভয় পক্ষ থেকে ন্যায়পরায়ণ মুরুব্বি আনো।”
৪. রাগে নীরবতা ও ক্ষমাশীলতা
রাসুল ﷺ: “পরিবারের প্রতি উত্তম যে—সে-ই প্রকৃত উত্তম মানুষ।”
— তিরমিজি
পরিবার রক্ষা করা একটি ইবাদত। একটি পরিবার টিকিয়ে রাখা মানে— শয়তানকে পরাজিত করা, একটি প্রজন্মকে সুরক্ষা দেওয়া। তাই ইসলামের হুকুম পরিবার কে তোমরা রক্ষা কর। তুমি তোমার নিজেকে ও পরিবারকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও।
নিজ পরিবারের সাথে করণীয়-
রাগের সময় চুপ থাকা। প্রতিদিন পরিবারের জন্য দোয়া করা। কটু ভাষা পরিত্যাগ। দাম্পত্য সমস্যায় তৃতীয় ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া। সন্তানের সামনে ঝগড়া না করা। ভুল হলে ক্ষমা করে দেওয়া।
একজন মুত্তাকী ব্যক্তির সবচেয়ে বড় পরিচয় সে তার পরিবারের সাথে ভালো আচরণ করে। একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তোলে।