মসজিদে নববীতে প্রথম প্রবেশ-মুমিনের আবেগ অনুভূতি

মদিনায় পৌঁছার পর হৃদয় অস্থির হয়ে ওঠে। মসজিদে নববী কখন দৃষ্টিতে আসে। তারপর অস্থিরতা কখন সেই মসজিদের ভেতরে দাঁড়াব, যেখানে আমার প্রিয় নবী ﷺ দাঁড়িয়েছেন। অবশেষে সেই মুহূর্ত আসে। দূর থেকে সবুজ গম্বুজ দেখা যায়। মিনারগুলো চোখে পড়ে। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। তখন জিহ্বায় অজান্তেই দরূদ প্রবাহিত হতে থাকে।

اللهم صل وسلم وبارك على سيدنا محمد

আর যখন মসজিদের ফটকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন জীবনে সেরা স্বপ্ন সত্যি তে পরিণত হয়। বিশ্বাস হতে চায় না আমি কি সত্যিই মসজিদে নববীর সামনে দাঁড়িয়ে আছি?

◾মসজিদে নববী: ইসলামের হৃদস্পন্দন

***********************************

মসজিদে নববী শুধু একটি মসজিদ নয়। এটি ইতিহাসের জীবন্ত অধ্যায়। এটি ইসলামের হৃদয়।

এটি ওহীর স্মৃতি। এটি নুবুওয়তের স্মৃতি। এটি সাহাবীদের অশ্রুর স্মৃতি। এটি ত্যাগের স্মৃতি। এটি ভালোবাসার স্মৃতি।

এটি সেই স্থান, যেখানে ফেরেশতারা অবতরণ করেছেন। এটি সেই স্থান, যেখানে ওহীর আলো মানবজাতির অন্ধকার দূর করেছে। এটি সেই স্থান, যেখান থেকে পৃথিবীর ইতিহাস নতুন মোড় নিয়েছে।

এই মসজিদের দেয়াল শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়।

এগুলো ইতিহাসের সাক্ষী। এই মসজিদের মেঝে শুধু মাটি নয়। এটি এমন এক জমিন, যেখানে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষগুলো সিজদায় লুটিয়ে পড়েছেন।

এই মসজিদের বাতাস শুধু বাতাস নয়। এর ভেতরে মিশে আছে রাসূল ﷺ-এর তিলাওয়াতের স্মৃতি, সাহাবীদের তাকবীরের ধ্বনি এবং রাতের তাহাজ্জুদের অশ্রু। এই মসজিদের প্রতিটি কোণ একটি ইতিহাস। প্রতিটি অংশ একটি স্মৃতি। প্রতিটি স্থান একটি শিক্ষা।

এখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমামতি করেছেন। এখানে তাঁর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত হয়েছে। এখানে সাহাবায়ে কেরাম ওহী শুনেছেন। এখানে নতুন নতুন আয়াত নাযিল হয়েছে।

◾এই সেই মসজিদ এখানে কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসলামের বিজয়ের সুসংবাদ এসেছে। কখনো সতর্কবার্তা এসেছে। কখনো জান্নাতের বর্ণনা এসেছে। কখনো জাহান্নামের ভয়াবহতা এসেছে।‌ এখানে মানুষ ঈমান শিখেছে। এখানে মানুষ তাকওয়া শিখেছে।

এখানে মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসতে শিখেছে। এখানে মানুষ রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসতে শিখেছে।

এখানে দ্বীনের শিক্ষা হয়েছে। এখানে চরিত্র গঠিত হয়েছে। এখানে মানুষের অন্তর পরিবর্তিত হয়েছে।

এখানে দাস নেতা হয়েছে। এখানে নির্যাতিত মানুষ পৃথিবীর পথপ্রদর্শকে পরিণত হয়েছে।

এখানে আবু বকর তৈরি হয়েছেন। এখানে উমর তৈরি হয়েছেন। এখানে উসমান তৈরি হয়েছেন।‌এখানে আলী তৈরি হয়েছেন। এখানে বিলাল তৈরি হয়েছেন।‌এখানে খালিদ ইবনে ওয়ালীদ তৈরি হয়েছেন।‌এখানে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যাদের তুলনা মানব ইতিহাসে দ্বিতীয়বার দেখা যায়নি।

এই মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান ছিল না।‌ এটি ছিল ইসলামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ছিল প্রথম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এটি ছিল প্রথম রাষ্ট্রের কেন্দ্র। এটি ছিল প্রথম আদালত। এটি ছিল প্রথম পরামর্শ পরিষদ।এটি ছিল প্রথম দাওয়াহ কেন্দ্র।

এখান থেকেই উম্মাহ গঠিত হয়েছে।‌এখান থেকেই সভ্যতা গঠিত হয়েছে। এখান থেকেই মানবতার নতুন ইতিহাস লেখা হয়েছে। আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি মুসলমান বসবাস করছে।

তাদের ভাষা ভিন্ন। তাদের সংস্কৃতি ভিন্ন। তাদের রং ভিন্ন। তাদের দেশ ভিন্ন। কিন্তু তাদের ঈমানের সূত্র এক জায়গায় গিয়ে মিলিত হয়।্যসেই সূত্র এসে মিলিত হয় মসজিদে নববীতে।

কারণ এখানেই কুরআনের শিক্ষা বাস্তব রূপ পেয়েছে।

এখানেই ইসলাম সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানেই সেই উম্মাহর জন্ম হয়েছে, যার অংশ আমরা আজ।

তাই মসজিদে নববীতে দাঁড়ানো মানে শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থানে দাঁড়ানো নয়। এটি নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া। এটি নিজের পরিচয়ের কাছে ফিরে যাওয়া। এটি সেই উৎসের কাছে ফিরে যাওয়া, যেখান থেকে আমাদের ঈমানের যাত্রা শুরু হয়েছে।

যখন একজন মুমিন মসজিদে নববীর ভেতরে বসে, তখন তার মনে হওয়া উচিত আমি শুধু একটি মসজিদে বসে নেই। আমি ইসলামের হৃদয়ের ভেতরে বসে আছি। আমি সেই স্থানটিতে বসে আছি, যেখান থেকে আল্লাহর হেদায়েত পৃথিবীর প্রতিটি কোণে পৌঁছেছে।

আমি সেই স্থানটিতে বসে আছি, যেখানে বসে রাসূল ﷺ এমন একটি উম্মাহ তৈরি করেছিলেন, যারা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল। তখন হৃদয় নিজে থেকেই বলে ওঠে হে আল্লাহ! যে মসজিদ থেকে প্রথম প্রজন্মের মানুষগুলো ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস ও কুরবানির শিক্ষা নিয়ে বের হয়েছিল,

আমাকেও সেই শিক্ষা দান করুন।ৎআমাকেও সেই ভালোবাসা দান করুন। আমাকেও সেই ঈমান দান করুন। আমাকেও সেই উম্মাহর যোগ্য একজন সদস্য বানিয়ে দিন।

◾এই সেই মসজিদ যেখানে রাসূল ﷺ দাঁড়িয়ে ফজরের নামাজ পড়িয়েছেন। এই সেই স্থান যেখানে তিনি সাহাবীদের সামনে কুরআন তিলাওয়াত করেছেন।

এই সেই স্থান যেখানে তিনি জুমার খুতবা দিয়েছেন।

এই সেই স্থান যেখানে তিনি উম্মতকে জান্নাতের পথ দেখিয়েছেন। এই সেই স্থান যেখানে তিনি উম্মতের জন্য কেঁদেছেন। এখানে আবু বকর সিদ্দীক رضي الله عنه দাঁড়িয়েছেন। যে মানুষটি নবীদের পর মানবজাতির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। এখানে উমর ফারুক رضي الله عنه দাঁড়িয়েছেন। যার আগমনে শয়তান পথ বদলে ফেলত।

এখানে উসমান رضي الله عنه দাঁড়িয়েছেন। যার লজ্জাশীলতাকে ফেরেশতারাও সম্মান করত। এখানে আলী رضي الله عنه দাঁড়িয়েছেন। যিনি ছিলেন জ্ঞান, সাহস ও তাকওয়ার অনন্য প্রতীক। এখানে তালহা দাঁড়িয়েছেন।‌ এখানে যুবাইর দাঁড়িয়েছেন। এখানে সা’দ দাঁড়িয়েছেন। এখানে বিলাল দাঁড়িয়েছেন। এখানে আবু উবাইদাহ দাঁড়িয়েছেন।

◾ এই মসজিদের মাটির দিকে তাকান। এই আকাশের দিকে তাকান।‌আজ থেকে চৌদ্দশত বছরেরও বেশি আগে এখানেই হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরাম সিজদায় লুটিয়ে পড়েছেন। এখানেই তাদের কপাল মাটিতে লেগেছে। এখানেই তাদের চোখের পানি ঝরেছে। এখানেই তারা কুরআন শুনে কেঁদেছেন। এখানেই তারা জাহান্নামের আয়াত শুনে কেঁপে উঠেছেন। এখানেই তারা জান্নাতের আয়াত শুনে আনন্দে ভরে উঠেছেন।

এখানেই তারা তওবা করেছেন। এখানেই তারা আল্লাহর কাছে নিজেদের সমর্পণ করেছেন। এই মসজিদের দেয়াল সাহাবীদের কান্না শুনেছে।‌এই মসজিদের বাতাস সাহাবীদের তাকবীর শুনেছে। এই মসজিদের প্রাঙ্গণ সাহাবীদের দরূদ শুনেছে। এই মসজিদের আকাশ তাদের কুরআন তিলাওয়াত শুনেছে।

ফজরের অন্ধকারে বিলাল رضي الله عنه-এর আযানের ধ্বনি এখানেই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। আবু বকর رضي الله عنه-এর কণ্ঠ এখানেই উচ্চারিত হয়েছে। উমর رضي الله عنه-এর বজ্রকণ্ঠ এখানেই ধ্বনিত হয়েছে। উসমান رضي الله عنه-এর তিলাওয়াত এখানেই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। আলী رضي الله عنه-এর ইবাদত এখানেই সংঘটিত হয়েছে। এখানেই সাহাবীরা দাঁড়িয়েছেন।

এখানেই তারা রুকু করেছেন। এখানেই তারা সিজদা করেছেন। এখানেই তারা কেঁদেছেন। এখানেই তারা হেসেছেন। এখানেই তারা দ্বীনের জন্য অঙ্গীকার করেছেন। এখানেই তারা আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আর আজ আজ আমি এই মসজিদে। আজ আমি এখানে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি। আজ আমি এখানে মাটিতে সিজদা করছি। আল্লাহর কসম! এটি আমার জীবনের অন্যতম বড় নেয়ামত। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলোর একটি।

আমি এর যোগ্য ছিলাম না। আমি এর উপযুক্ত ছিলাম না। কিন্তু আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।

মানুষ পৃথিবীর নানা স্থানে যায়। কেউ সমুদ্র দেখতে যায়। কেউ পাহাড় দেখতে যায়। কেউ বিখ্যাত নগরী দেখতে যায়। কেউ প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন দেখতে যায়। কেউ পৃথিবীর আশ্চর্য স্থাপনাগুলো দেখতে যায়।

কিন্তু একজন মুমিনের কাছে এর চেয়েও বড় বিস্ময় আছে। এর চেয়েও বড় সৌভাগ্য আছে। এর চেয়েও বড় সম্মান আছে। সেটি হলো সেই স্থানে দাঁড়ানো, যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন আল্লাহর রাসূল ﷺ।‌সেই মাটিতে সিজদা করা, যেখানে সিজদা করেছিলেন আল্লাহর রাসূল ﷺ।‌ সেই মসজিদে নামাজ পড়া, যেখানে ইমামতি করেছিলেন আল্লাহর রাসূল ﷺ‌।‌ সেই বাতাসে শ্বাস নেওয়া, যেখানে তাঁর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি একদিন ধ্বনিত হয়েছিল। সেই শহরে হাঁটা, যেখানে তাঁর পদচিহ্ন পড়েছিল।

পৃথিবীর কোনো প্রাসাদ, কোনো নগরী, কোনো স্থাপত্য, কোনো দর্শনীয় স্থান একজন মুমিনের কাছে এর সমতুল্য হতে পারে না।

কারণ এখানে আছে নুবুওয়তের স্মৃতি।;এখানে আছে ঈমানের উৎস। এখানে আছে সেই ভালোবাসার চিহ্ন, যা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে আজও জীবিত রাখে। তাই মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে একজন মুমিনের অন্তর থেকে বারবার বেরিয়ে আসা উচিত—

الحمد لله الذي بلغني هذا المكان المبارك

সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাকে এই বরকতময় স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন।

হে আল্লাহ! যেভাবে আপনি আমাকে আজ এই মসজিদে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য দিয়েছেন, সেভাবে কিয়ামতের দিন আপনার হাবীব ﷺ-এর পতাকার নিচে দাঁড়ানোর সৌভাগ্যও দান করুন।

◾মসজিদে নববীতে প্রথম প্রবেশের পর মানুষ সাধারণত দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করে। কিন্তু সেই দুই রাকাত সাধারণ দুই রাকাত নয়। হৃদয়ের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত অবস্থা সৃষ্টি হয়। চোখে পানি আসে।‌বুক কেঁপে ওঠে।‌ নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে যায়।

কারণ তখন মানুষ অনুভব করে আমি সেই স্থানে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে রাসূল ﷺ দাঁড়াতেন। আমি সেই স্থানে রুকু করছি যেখানে রাসূল ﷺ রুকু করেছেন।আমি সেই স্থানে সিজদা করছি যেখানে রাসূল ﷺ সিজদা করেছেন। আমি সেই মাটিতে কপাল রাখছি যেখানে আবু বকর কপাল রেখেছেন। যেখানে উমর কপাল রেখেছেন। যেখানে উসমান কপাল রেখেছেন।যেখানে আলী কপাল রেখেছেন। যেখানে হাজার হাজার সাহাবী নিজেদের চোখের পানি ফেলেছেন।‌সেই সিজদা তখন আর শুধু সিজদা থাকে না। সেটি হয়ে যায় ইতিহাসের সাথে সংযোগ। সেটি হয়ে যায় ভালোবাসার প্রকাশ। সেটি হয়ে যায় হৃদয়ের আত্মসমর্পণ।

◾মসজিদে নববীতে প্রথম প্রবেশের মুহূর্তে একটি অনুভূতি খুব গভীরভাবে জাগ্রত হওয়া উচিত।

আমি এখানে মুসফির মেহমান। আমি আল্লাহর ঘরের অতিথি। আমি রাসূল ﷺ-এর শহরের অতিথি।

আমি সেই মহান মানুষের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে উপস্থিত হয়েছি, যার কারণে আজ আমি মুসলমান।‌ তাই এখানে অহংকারের স্থান নেই। এখানে দুনিয়ার আলোচনা নেই। এখানে মোবাইলের ব্যস্ততা নেই।এখানে ছবি তোলার প্রতিযোগিতা নেই। এখানে হৃদয়কে নরম করতে হয়। এখানে চোখকে অশ্রুসিক্ত করতে হয়।এখানে দরূদে ঠোঁট ভিজিয়ে রাখতে হয়।এখানে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করতে হয়।

◾এখানে বারবার বলতে হয় হে আল্লাহ!‌আমি এর যোগ্য ছিলাম না। তবুও আপনি আমাকে এখানে এনেছেন।আমি এর উপযুক্ত ছিলাম না। তবুও আপনি আমাকে আপনার হাবীব ﷺ-এর মসজিদে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছেন। হে আল্লাহ!যেভাবে আপনি আমাকে আজ মসজিদে নববীর মাটিতে দাঁড় করিয়েছেন, সেভাবে কিয়ামতের দিন আপনার হাবীব ﷺ-এর পতাকাতলে দাঁড়ানোর তাওফীক দান করুন।

হে আল্লাহ! এই মসজিদের স্মৃতি, এই মসজিদের কান্না, এই মসজিদের নূর এবং এই মসজিদের ভালোবাসা আমার অন্তর থেকে কখনো দূর করবেন না।

আমীন।

Scroll to Top