প্রিয় রাসূল ﷺ-এর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম দেওয়া, তাঁর প্রতি দরূদ পড়া, তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়া—এ যেন জীবনের সেরা প্রাপ্তিগুলোর একটি।
তিনি সেই মহান ব্যক্তি, যিনি আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন। যার ভালোবাসার স্বীকৃতি স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। আমরা নিজেদের যতটা ভালোবাসি, তাঁর উম্মতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল তারও চেয়ে বেশি।
তিনি সেই মহান ব্যক্তি, যিনি আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার পাওনাদার। যার ভালোবাসা ছাড়া ঈমানের দাবি পূর্ণ হয় না। তাঁর ভালোবাসাই ঈমানের অংশ।
সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম তাঁকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে তাঁকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন। আর আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে তিনিই ছিলেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়।
তিনি ছিলেন رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ—সমগ্র জগতের জন্য রহমত। তাঁকে যারা ভালোবাসবে, তারা আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করবে। যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। কেউ কবিতা লিখেছেন, কেউ না’ত রচনা করেছেন, কেউ অশ্রুসিক্ত হৃদয় নিয়ে রওজা পাকের সামনে উপস্থিত হয়েছেন।
আমাদের সৌভাগ্য, আমরা উস্তাদ হিসেবে পেয়েছিলাম শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহিমাহুল্লাহকে। আমরা তাঁর হৃদয়ের সেই ভালোবাসা দেখেছি। প্রিয় রাসূল ﷺ-এর প্রেমে লেখা তাঁর স্বরচিত কবিতাগুলো পড়েছি। তাঁর জবান থেকে বারবার সেগুলো শুনেছি।
কবিতাগুলো তিনি যৌবনে লিখেছিলেন। আর আমরা সেগুলো শুনেছি তাঁর বার্ধক্যে। যতবার তিনি সেগুলো পড়েছেন, ততবার কেঁদেছেন। ক্লাসে বসে কেঁদেছেন। তাঁর কণ্ঠ কেঁপে উঠেছে।
যখন তিনি রওজার সামনে সেগুলো পড়েছেন, তখন কত আবেগ নিয়ে, কত ভালোবাসা নিয়ে, কত কান্নার সঙ্গে পড়েছেন তা আল্লাহই ভালো জানেন।
আমারও একটি সৌভাগ্যের স্মৃতি আছে
**********************************
প্রিয় উস্তাদ শাইখুল হাদীসের সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ আল্লাহ আমাকে দিয়েছিলেন। একদিকে জামিয়া রহমানিয়াতে শাইখুল হাদিস রচিত জামিয়ার তারানা উপস্থাপনের দায়িত্ব ছিল আমার। অন্যদিকে ২০০০ সালে শাইখুল হাদিস কারাবন্দি থেকে মুক্তি পাওয়ার পর প্রিয় ওস্তাদ মুফতি আশরাফুজ্জামান ইবনে সাদী শাইখুল হাদিস কে নিয়ে এক ঐতিহাসিক না করেন। যে সংগীতে এদেশের মাটি মানুষের শাইখুল হাদিসের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছিল। আমার জন্য সৌভাগ্য সেই সংগীতটি দেওয়ার জন্য তিনি আমাকে নির্বাচন করেছিলেন। এভাবে শাইখুল হাদিসের সাথে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক সফরে একান্তে তিনি আমাকে বলেছিলেন,
“আমার নামে নয়, রাসূল ﷺ-এর নামে কিছু শোনাও।”
আমি কয়েকটি গজল শুনালাম। তিনি বললেন, এই গজলটা শোনাও—
রাসূল আমার ভালোবাসা,
রাসূল আমার আলো-আশা,
রাসূল আমার প্রেম-বিরহের মূল আলোচনা,
রাসূল আমার কাজে-কর্মে অনুপ্রেরণা।”
এটি ছিল কবি মতিউর রহমান মল্লিকের লেখা। কয়েকটি শব্দ পরিবর্তন করে তিনি নিজেই আমাকে শিখিয়ে দিলেন, কীভাবে এটি পরিবেশন করতে হবে।
আমরা পদ্মা পাড়ি দিয়ে শরীয়তপুর যাচ্ছিলাম। ফেরিতে ওঠার পর সফরের অন্য সাথিরা গাড়ি থেকে নেমে পদ্মা দেখছিল। আমি গাড়িতে শাইখুল হাদিসের সাথে থেকে গিয়েছিলাম।
আজও মনে পড়ে, গভীর আবেগ আর মহব্বতের সঙ্গে তিনি সেই গজলটি আমাকে শুনিয়েছিলেন। আমি তার মাঝে নবীজির ভালোবাসা দেখেছিলাম। তার কন্ঠের আবেগ আমার হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। কিন্তু আমার জন্য আফসোস, তাঁর জীবদ্দশায় আমি এই সঙ্গীত শিখে তাঁকে আর শোনাতে পারিনি।
জামিয়া রহমানিয়া চারতলায় দাওয়াতুল হকের মাসিক ইসলাহী আলোচনা মজলিসে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের জবানে প্রিয় রাসূল ﷺ-এর মহব্বতের উপর তাঁর একটি আলোচনা শুনেছিলাম। আজও মনে আছে, বুক ফেটে কান্না এসেছিল। বুখারী শরীফের ষষ্ঠ খণ্ডে তাঁর লেখা সীরাতে মুস্তফার আলোচনা পড়ে একদিন দরজা বন্ধ করে কেঁদেছিলাম। শাইখুল হাদিসের রচনার মাঝে ছিল প্রিয় নবীর ভালোবাসা। সময় করে শাইখুল হাদিস রচিত বাংলা বুখারীর সিরাতে মোস্তফা অংশ পড়ার আহ্বান রইল।
তাঁর লেখার মাঝে, কণ্ঠের মাঝে, কবিতার মাঝে, আলোচনার মাঝে যে আবেগ ছিল, তা থেকে তাঁর হৃদয়ের ভালোবাসা অনুমান করা যেত।
এই ভালোবাসা নিয়েই আমাদের পূর্বসূরিরা মদিনায় উপস্থিত হতেন। প্রিয় রাসূল ﷺ-এর রওজার সামনে যেতেন। যতবার গিয়েছেন, ততবার নতুন ভালোবাসা নিয়ে গিয়েছেন। নতুন অশ্রু নিয়ে গিয়েছেন। নতুন প্রেম নিয়ে গিয়েছেন। নতুন কবিতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন।
প্রিয় রাসূল ﷺ-এর রওজার সামনে জীবনের প্রথমবার দাঁড়ানোর অনুভূতি অবশ্যই অন্যরকম।কিন্তু যারা সত্যিকারের প্রেমিক, তাদের জন্য প্রতিবার দাঁড়ানোর অনুভূতিও নতুন হয়।
তাদের প্রথমবার দাঁড়ানোর অনুভূতি আর হাজারতমবার দাঁড়ানোর অনুভূতি এক নয়। কারণ তাদের মহব্বত বাড়তে থাকে, কমে না। আর যদি মহব্বত কমে যায়, তাহলে তার চেয়ে বড় আফসোস আর কী হতে পারে?
এই মহব্বত তো বাড়ার কথা। এই ভালোবাসা তো গভীর হওয়ার কথা। প্রেমিকদের অবস্থা এমনই—যতবার তারা প্রিয়তমের দরবারে আসে, ততবারই তাদের চোখে নতুন অশ্রু আসে, হৃদয়ে নতুন ব্যথা জাগে, আর ভালোবাসা আরও গভীর হয়।
২০১৩ সালে প্রথমবার হজের সফরের পর ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো উমরার সফরের সুযোগ হয়।সফরের আগে ইবনে শাইখুল হাদীস মাওলানা মাহবুবুল হক সাহেব আমাকে বলেছিলেন, মদিনায় গিয়ে যেন শাইখ ওসমানের সঙ্গে অবশ্যই দেখা করি। তিনি আমার সাক্ষাতের সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবেন বলেও আশ্বস্ত করেছিলেন।
যথারীতি সেই সফরে মদিনার বরেণ্য বুযুর্গ শাইখ ওসমানের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। মসজিদে নববীর ভেতরে, রওজা শরীফের অদূরে বসে এশার নামাজের পর তিনি আমাকে কিছু নসীহত করেন।
আলাপের একপর্যায়ে তিনি আমাকে একটি আমল শিখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যতবার প্রিয় রাসূল ﷺ-কে সালাম দেওয়ার জন্য উপস্থিত হবে, চেষ্টা করবে তার আগে কিছু নফল ইবাদত করতে।
বিশেষভাবে তিনি সালাতুত তাসবীহের কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন সালাতুত তাসবির নামাজ পড়ে সালাম দেয়ার জন্য রওজার সামনে উপস্থিত হবে। হৃদয় প্রস্তুত করে, নিজেকে গুছিয়ে, দরূদে ভেজা অন্তর নিয়ে প্রিয় নবীর সামনে উপস্থিত হবে।
কথাটি আমার হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল।
বড়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে শুধু কথা শেখা যায় না, তাদের ভালোবাসাও দেখা যায়। তাদের চোখে মহব্বত দেখা যায়। তাদের অশ্রুতে মহব্বত দেখা যায়। তাদের আদবে মহব্বত দেখা যায়।
তাদের উপস্থিতিতে বোঝা যায়, তারা রওজা পাকের সামনে শুধু দাঁড়াতে যান না তারা ভালোবাসা নিয়ে যান, শ্রদ্ধা নিয়ে যান, অশ্রু নিয়ে যান।
আমরা যারা মদিনায় উপস্থিত হই, আমাদেরও মসজিদে নববীতে যাওয়া এবং প্রিয় নবীর রওজার সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়ার অর্থ অনুভব করা উচিত।
নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত আমি কী হৃদয় নিয়ে সালাম দিতে যাচ্ছি? আমি কী নিয়ে উপস্থিত হচ্ছি? আমার এই উপস্থিতির উপহার কী? আমার সঙ্গে কি দরূদ আছে? আমার সঙ্গে কি ভালোবাসা আছে? আমার সঙ্গে কি সুন্নাহর প্রতি অঙ্গীকার আছে? নাকি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি?
দুঃখের বিষয়, আজকাল অনেক মানুষ রওজা পাকের সামনে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ ছবি তোলার চিন্তায় থাকে, কেউ ভিডিও করার চিন্তায় থাকে, কেউ চারপাশ দেখাতে ব্যস্ত থাকে।
কিন্তু যে হৃদয় প্রিয় নবীর দরবারে উপস্থিত হওয়ার স্বাদ পেল না, সে তো আসল প্রাপ্তিটাই হারিয়ে ফেলল।
এমন আচরণে মহব্বতের প্রকাশ হয় না। এতে শ্রদ্ধার পরিচয় ফুটে ওঠে না।
রওজা পাকের সামনে শতবার উপস্থিত হওয়ার চেয়ে একবার আদবের সঙ্গে, একবার ভালোবাসার সঙ্গে, একবার অশ্রুসিক্ত হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হওয়া অনেক বড় সৌভাগ্য। যদি আদব রক্ষা করা না যায়, যদি হৃদয় প্রস্তুত না হয়, তাহলে অন্তত বেয়াদবির মধ্যে না যাওয়াই ভালো।
আমাদের উচিত রওজা পাকে যাওয়ার আগে আদব শেখা। মহব্বত তৈরি করা। দরূদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা। বুযুর্গ আলেমদের পরামর্শ নেওয়া। তাদের সোহবতে থাকা।
তাদের কাছ থেকে শেখা, কীভাবে প্রিয় নবী ﷺ-কে সালাম দিতে হয়। কীভাবে তাঁর সামনে দাঁড়াতে হয়।কীভাবে চোখের পানি ফেলতে হয়। কীভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়। কারণ রওজা পাকে পৌঁছে যাওয়াই সব নয়।
সফলতা হলো—রওজা পাকের সামনে দাঁড়িয়ে এমন একটি হৃদয় অর্জন করা, যে হৃদয় ফিরে আসার পরও প্রিয় রাসূল ﷺ-এর মহব্বতে বেঁচে থাকে, তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে এবং বারবার সেই দরবারে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে। প্রথমবারের সাক্ষাতে মহব্বত যেন বেড়ে যায়। আরো বেশি মহব্বত নিয়ে যেন দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয়।
রওজা পাকের সামনে দাঁড়াতে পারা জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামতগুলোর একটি। এই মহান নেয়ামতের মুহূর্তে একজন মুমিনের হৃদয় শুকরিয়ায় ভরে যাওয়া উচিত।
সে আল্লাহর দরবারে কাঁদতে কাঁদতে বলতে পারে হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে আপনার হাবীব ﷺ-এর রওজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। কোটি কোটি মানুষের মধ্য থেকে আমাকে নির্বাচন করেছেন। এই অনুগ্রহের জন্য আমি আপনার শুকরিয়া আদায় করছি।
হে আল্লাহ! এত বড় নেয়ামত লাভের পর আমাকে আর বিপথগামিতার পথে ফিরিয়ে দেবেন না। আমাকে এমন জীবন দান করুন, যা আপনার সন্তুষ্টির পথে অতিবাহিত হবে।
আপনার প্রিয় হাবীব ﷺ-এর রওজা পর্যন্ত যখন আপনি আমাকে এনেছেন, তখন জীবনের বাকি সময়টুকুও তাঁর মহব্বত, তাঁর সুন্নাহ এবং তাঁর আদর্শের ছায়াতলে কাটানোর তাওফীক দান করুন।
হে আল্লাহ! যে দ্বীনের জন্য আপনার প্রিয় নবী ﷺ কষ্ট সহ্য করেছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন, রক্ত দিয়েছেন, অপমান সহ্য করেছেন এবং একটি জীবন উৎসর্গ করেছেন—সেই দ্বীনের খিদমতে আমাকেও কবুল করে নিন।
যে কাজের জন্য তিনি উম্মত গড়েছেন, যে মিশনের জন্য তিনি রাত জেগে কেঁদেছেন, সেই মিশনের একজন নগণ্য কর্মী হিসেবে আমাকেও গ্রহণ করুন।
হে আল্লাহ! দুনিয়ায় আমি তাঁর রওজার সামনে দাঁড়িয়েছি, আখিরাতে যেন তাঁর সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত না হই। দুনিয়ায় আমি তাঁকে সালাম দিয়েছি, আখিরাতে যেন তাঁর হাত থেকে হাউযে কাওসারের পানি পান করতে পারি।
দুনিয়ায় আমি তাঁর শহরে এসেছি, আখিরাতে যেন তাঁর সঙ্গেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। আমাকে আমার পরিবারকে কবুল করুন।
আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।