রিয়াযুল জান্নাহ, জান্নাতের এক বাগান

জীবনে অনেক নেয়ামত আছে। কিন্তু কিছু নেয়ামত আছে, যা মানুষের সমস্ত অর্জনকে ছাপিয়ে যায়। কিছু মুহূর্ত আছে, যা শুধু স্মৃতিতে নয়, হৃদয়ের গভীরতম স্থানে চিরস্থায়ী হয়ে যায়।

রিয়াজুল জান্নাহ সেই স্থান, যার ব্যাপারে প্রিয় নবী ﷺ ঘোষণা করেছেন—

«مَا بَيْنَ بَيْتِي وَمِنْبَرِي رَوْضَةٌ مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ»

“আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

মসজিদে নববীর ফজিলত পূর্ণ স্থান রিয়াজুল জান্নাহয় অবস্থান দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম জায়গায় অবস্থান করা।

এখানে কিছুটা সময় থাকার সুযোগ হয়। ডান-বামে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ। কারো চোখে অশ্রু, কারো ঠোঁটে দোয়া, কেউ কুরআন তিলাওয়াত করছে, কেউ সিজদায় পড়ে আছে। আর এখানে বসে ভাবা চাই কত কোটি মানুষ এই স্থানে আসার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়! অথচ আল্লাহ আমাকে এখানে বসার সুযোগ দিয়েছেন।

কোন আমলের বিনিময়ে? কোন যোগ্যতায়? এ তো শুধুই আল্লাহর অনুগ্রহ। এটি শুধু একটি জায়গা নয়, ইসলামের ইতিহাসের হৃদয়। এই মসজিদ শুধু একটি ইবাদতের স্থান ছিল না। এখান থেকেই একটি জাতি গড়ে উঠেছে। এখান থেকেই একটি সভ্যতার জন্ম হয়েছে।‌এখান থেকেই মানবতার ইতিহাস বদলে গেছে।

আজ যেখানে আমি বসে আছি, এই পথ দিয়েই প্রিয় রাসূল ﷺ তাঁর ঘর থেকে মসজিদে এসেছেন। এই পথ দিয়েই তিনি মসজিদ থেকে নিজের ঘরে ফিরেছেন।

এই মসজিদের মেঝেতে তিনি হেঁটেছেন। এই মসজিদের খুঁটির পাশে তিনি বসেছেন। এই মসজিদের আঙিনায় তিনি সাহাবাদের শিক্ষা দিয়েছেন। এই মসজিদের মাটিতে তাঁর অশ্রু ঝরেছে।‌এই মসজিদের বাতাস তাঁর তাকবীর শুনেছে। এই মসজিদের দেয়াল তাঁর কুরআন তিলাওয়াত শুনেছে।্যএই মসজিদের আকাশ তাঁর দোয়া শুনেছে।

এখানেই নাযিল হয়েছে ওহী

***********************

আজ যে স্থানে আমি বসে আছি, এখানেই বহুবার ওহী নাযিল হয়েছে। জিবরীল (আ.) আসমান থেকে নেমে এসেছেন। আল্লাহর বাণী নিয়ে এসেছেন। রাসূল ﷺ সেই ওহী সাহাবাদের শুনিয়েছেন।

তারপর সেই ওহী পৃথিবী বদলে দিয়েছে। আজ আমি সেই জায়গায় বসে কুরআন পড়ছি, যেখানে কুরআনের বহু আয়াত প্রথমবার মানুষের কানে পৌঁছেছিল।‌ এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

এখানেই বসে গড়ে উঠেছে সাহাবাদের প্রজন্ম। এই মসজিদ ছিল পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়। এর শিক্ষক ছিলেন মুহাম্মাদ ﷺ। এর শিক্ষার্থী ছিলেন আবু বকর (রা.), উমর (রা.), উসমান (রা.), আলী (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.), উবাই ইবনে কা’ব (রা.), আবু হুরায়রা (রা.) এবং হাজার হাজার সাহাবী।

এখানে বসেই তারা ঈমান শিখেছেন।‌এখানে বসেই তারা কুরআন শিখেছেন।‌ এখানে বসেই তারা আখলাক শিখেছেন। এখানে বসেই তারা জীবন গড়েছেন।এখান থেকেই তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে মানবতাকে আলোর পথ দেখিয়েছেন।‌

এটি ছিল রাসূল ﷺ-এর আদালত‌। আজকের ভাষায় বললে, এটি ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কার্যালয়। এখানে বসেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। এখানে বিচার হয়েছে।

এখানে প্রতিনিধি দল এসেছে। এখানে যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতিমালা নির্ধারিত হয়েছে। এখানে বসেই রাসূল ﷺ উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেছেন।‌অথচ সবকিছু হয়েছে একটি মসজিদকে কেন্দ্র করে।

এ কারণেই নববী মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সভ্যতার কেন্দ্র। এখানেই করেছেন ইতিকাফ। রমযানের শেষ দশকে রাসূল ﷺ এখানেই ইতিকাফ করেছেন। রাতের পর রাত আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছেন। কেঁদেছেন। দোয়া করেছেন।

উম্মাহর জন্য মাগফিরাত চেয়েছেন। আজ আমি সেই স্থানেই বসে আছি।্যযেখানে একদিন রাসূল ﷺ তাঁর রবের সঙ্গে নির্জনে কথা বলেছেন।

পাশে প্রিয়তমের রওজা

**********************

রিয়াযুল জান্নাহয় বসে যখন চোখ ওঠে, তখন মনে পড়ে কয়েক কদম দূরেই রয়েছেন আমার প্রিয় নবী ﷺ। সেখানেই তাঁর রওজা মুবারক। সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।

সেখানেই আছেন আবু বকর সিদ্দীক (রা.)।‌সেখানেই আছেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।‌ সালাম পেশ করার পর মনে হয়‌ এতদিন যার নাম শুনেছি, যার হাদিস পড়েছি, যার সুন্নাহ অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি, আজ আমি তাঁর মসজিদে, তাঁর শহরে, তাঁর রওজার পাশে।

নববী মসজিদের স্মৃতিবিজড়িত স্তম্ভসমূহ

***********************************

নববী মসজিদে আজও কিছু ঐতিহাসিক স্তম্ভের স্থান চিহ্নিত করা আছে, যা রাসূল ﷺ-এর যুগের স্মৃতি বহন করে।

আপনি যখন রিয়াযুল জান্নাহয় প্রবেশ করবেন, তখন শুধু একটি সবুজ কার্পেটের জায়গায় প্রবেশ করছেন না বরং এমন এক ইতিহাসের মাঝে প্রবেশ করছেন, যার প্রতিটি স্তম্ভ, প্রতিটি কোণ, প্রতিটি স্থান রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, সাহাবাদের ঈমান, অশ্রু, ত্যাগ ও ভালোবাসার স্মৃতি বহন করে।

নববী মসজিদের ভেতরে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্তম্ভ (أساطين) বিশেষভাবে চিহ্নিত করা আছে। এগুলো শুধু পাথরের স্তম্ভ নয়; বরং ইসলামের জীবন্ত ইতিহাসের সাক্ষী।

◾اسْطُوَانَةُ الْحَنَّانَةِ (উস্তুওয়ানাতুল হান্নানাহ)

এটি নববী মসজিদের সবচেয়ে আবেগময় স্মৃতিগুলোর একটি। মসজিদ নির্মাণের পর প্রথমদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি খেজুর গাছের কাণ্ডের সঙ্গে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। পরে সাহাবায়ে কেরাম একটি মিম্বর নির্মাণ করে দিলেন যাতে তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতে পারেন।

রাসূল ﷺ যখন সেই খেজুর কাণ্ডটি ছেড়ে নতুন মিম্বারে উঠলেন, তখন সেই কাণ্ড থেকে এমন কান্নার শব্দ বের হতে লাগল, যা মসজিদে উপস্থিত সাহাবারা স্পষ্ট শুনতে পেলেন।

হাদীসে এসেছে—

«فَحَنَّتِ النَّخْلَةُ حَتَّى سَمِعَ لَهَا أَنِينٌ»

খেজুরের কাণ্ডটি এমনভাবে ক্রন্দন করতে লাগল যে তার আহাজারির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

অবশেষে রাসূল ﷺ মিম্বর থেকে নেমে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন তার কান্না থেমে গেল।

উলামায়ে কেরাম বলেন, যদি একটি শুকনো কাঠ রাসূল ﷺ-এর বিচ্ছেদ সহ্য করতে না পারে, তবে একজন মুমিনের হৃদয় কিভাবে তাঁর ভালোবাসা ছাড়া শান্ত থাকতে পারে?

◾اُسْطُوَانَةُ التَّوْبَةِ (তওবার স্তম্ভ)

এটি “আবু লুবাবা (রা.)-এর স্তম্ভ” নামেও পরিচিত।

বনু কুরাইযার ঘটনায় আবু লুবাবা (রা.) অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি ইশারা করে ফেলেছিলেন, যা পরে তিনি নিজের জন্য বড় ভুল মনে করেন। ভুল বুঝতে পেরে তিনি সরাসরি মসজিদে এসে এই স্তম্ভের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেললেন।

তিনি বললেন “যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমার তওবা কবুল না করবেন, আমি এখান থেকে সরে যাব না।‌দিনের পর দিন তিনি এভাবেই অবস্থান করলেন।

অবশেষে আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করলেন এবং সে খবর ওহীর মাধ্যমে রাসূল ﷺ-কে জানানো হলো।

এটি আমাদের শেখায় মুমিন ভুল করতেই পারে, কিন্তু প্রকৃত মুমিন ভুলের ওপর অটল থাকে না; সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।

◾اُسْطُوَانَةُ السَّرِيرِ (শয্যার স্তম্ভ)

এটি সেই স্থানের স্মৃতি বহন করে যেখানে রাসূল ﷺ ইতিকাফের সময় তাঁর বিশ্রামের বিছানা বা শয্যা রাখতেন। রমযানের শেষ দশকে তিনি যখন ইতিকাফ করতেন, তখন দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে আলাদা করে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হয়ে যেতেন।

আজ যখন একজন মুসলিম এই স্থানটির দিকে তাকায়, তখন তার মনে হয় এই স্থানেই হয়তো উম্মাহর জন্য অশ্রুসিক্ত দোয়া করা হয়েছে। এই স্থানেই হয়তো কদরের রাতের অপেক্ষায় দীর্ঘ কিয়াম হয়েছে।

◾اُسْطُوَانَةُ الْوُفُودِ (প্রতিনিধিদলের স্তম্ভ)

মদীনায় ইসলামের প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পর আরবের বিভিন্ন গোত্র থেকে প্রতিনিধি দল আসতে শুরু করে।

তারা ইসলাম সম্পর্কে জানতে আসত। বাইআত করতে আসত। চুক্তি করতে আসত।‌রাষ্ট্র পরিচালনা, সমাজ গঠন ও দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করতে আসত।

রাসূল ﷺ প্রায়ই এই স্থানের কাছে বসে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। আজকের ভাষায় বলতে গেলে, এটি ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

◾اُسْطُوَانَةُ الْمُهَاجِرِينَ (মুহাজিরদের স্তম্ভ)

এটি সেই স্থানের স্মৃতি বহন করে যেখানে মুহাজির সাহাবায়ে কেরাম প্রায়ই সমবেত হতেন।

মক্কার ঘরবাড়ি, সম্পদ, ব্যবসা, আত্মীয়স্বজন সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করে তারা মদীনায় এসেছিলেন।

এই স্তম্ভের কাছে দাঁড়ালে মুহাজিরদের সেই ত্যাগ, ঈমান এবং কুরবানির ইতিহাস মনে পড়ে।

যারা দুনিয়া ছেড়েছিলেন আল্লাহর জন্য, আল্লাহ তাদেরকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষদের কাতারে স্থান দিয়েছেন।

◾اُسْطُوَانَةُ الْحَرَسِ (পাহারাদারদের স্তম্ভ)

ইসলামের প্রাথমিক যুগে কিছু সময় সাহাবায়ে কেরাম রাসূল ﷺ-এর নিরাপত্তার জন্য পাহারা দিতেন।

বিশেষ করে যখন ইসলামের শত্রুরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তখন সাহাবারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন।

এই স্থানে দাঁড়ালে মনে পড়ে যায়‌ কত সাহাবী নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে রাসূল ﷺ-এর নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

তারা জানতেন, নিজেদের জীবন চলে গেলেও চলবে, কিন্তু আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কোনো ক্ষতি হতে দেওয়া যাবে না।

◾রিয়াযুল জান্নাহর এই স্তম্ভগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়,‌এগুলো যেন ঈমানের স্মৃতিস্তম্ভ। কোথাও রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসায় কাঁদছে একটি খেজুর গাছ, কোথাও এক সাহাবীর অশ্রুসিক্ত তওবা, কোথাও ইতিকাফের নির্জনতা, কোথাও ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থা, কোথাও হিজরতের ত্যাগ, আবার কোথাও রাসূল ﷺ-কে রক্ষা করার জন্য প্রাণ উৎসর্গে প্রস্তুত সাহাবাদের ভালোবাসা।

এসব স্মৃতির মাঝে বসে একজন মুমিনের হৃদয় অনিচ্ছায় বলে ওঠে—

اللَّهُمَّ لَا تَحْرِمْنَا زِيَارَةَ مَسْجِدِ نَبِيِّكَ ﷺ مَرَّةً بَعْدَ مَرَّةٍ

“হে আল্লাহ! তোমার নবীর মসজিদ বারবার জিয়ারত করার সৌভাগ্য থেকে আমাদের বঞ্চিত করো না।” আমীন।

আজ এসব চিহ্নের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় ইতিহাস শুধু পড়া যায় না, ইতিহাসকে অনুভবও করা যায়।

◾রিয়াযুল জান্নাহ একবার, কিন্তু নববী মসজিদ বারবার। রিয়াযুল জান্নাহয় প্রবেশের সুযোগ সাধারণত সীমিত।

এখন সফরে একবারই আসে। কিন্তু নববী মসজিদ তো উন্মুক্ত। বারবার এখানে আসা যায়।‌ বারবার সালাম পেশ করা যায়।‌ বারবার মিম্বরের দিকে তাকানো যায়।বারবার সেই স্থানগুলো দেখা যায়, যেখানে রাসূল ﷺ বসতেন, হাঁটতেন, শিক্ষা দিতেন।

তাই শুধু রিয়াযুল জান্নাহয় প্রবেশ করেই যেন সফর শেষ না হয়। বরং নববী মসজিদের প্রতিটি কোণকে চিনতে হবে।‌এর ইতিহাস জানতে হবে। এর স্মৃতিগুলো অনুভব করতে হবে

হে আল্লাহ! যে নেয়ামতের কল্পনাও আমি করিনি, সেই নেয়ামত তুমি আমাকে দান করেছ।

তুমি আমাকে তোমার হাবিব ﷺ-এর মসজিদে এনেছ।

তুমি আমাকে জান্নাতের এক বাগানে বসার সুযোগ দিয়েছ।

হে আল্লাহ! এই নেয়ামতের পর আমাকে আর গুনাহের পথে ফিরিয়ে দিও না। আমাকে সুন্নাহর পথে অটল রাখো।্যআমার হৃদয়কে রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসায় পূর্ণ করে দাও।্যআমার মৃত্যু পর্যন্ত আমাকে তাঁর অনুসরণে অটল রাখো।

আর যেভাবে তুমি আমাকে তাঁর মসজিদে পৌঁছে দিয়েছ, সেভাবে কিয়ামতের দিন তাঁর হাউযে কাওসারের কাছেও পৌঁছে দিও।

Scroll to Top