আজ আমরা সমাজের সংকট নিয়ে অনেক কথা বলি।
যুবকরা মসজিদে আসে না। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে।
মাদক ছড়িয়ে পড়ছে। অশ্লীলতা মহামারীর মতো বাড়ছে। সুদ অর্থনীতিকে গ্রাস করছে। আত্মহত্যা বাড়ছে। মানুষ কুরআন থেকে দূরে যাচ্ছে।
কিন্তু আমি আজ একটি কঠিন প্রশ্ন করতে চাই সমাজের মানসিকতা বদলানোর আগে কি ইমামদের মানসিকতা বদলানো দরকার নয়? কারণ মসজিদের মিম্বর সমাজের হৃদয়। হৃদয় অসুস্থ হলে শরীর সুস্থ থাকে না।
ইমামের কাছে সমাজ পাওনাদার
****************************
সমাজ আমাকে কী দিল? কমিটি আমাকে কী দিল?
মুসল্লিরা আমাকে কত সম্মান দিল?
কিন্তু খুব কমই ভাবি আমি সমাজকে কী দিলাম?
আমি কত মানুষের জীবন বদলেছি? আমি কত যুবককে আল্লাহর পথে এনেছি? আমি কত পরিবারকে ভাঙন থেকে রক্ষা করেছি?
একজন ইমামের ভাবা উচিত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআন ও হাদিসের এলেম দিয়ে আমাদের সম্মানিত করেছেন। এই এলেমের প্রকৃত মালিক আমরা নই। আমরা আমানতদার। সমাজ হলো হকদার। মেম্বার অন হারাম ও ইমামতির দায়িত্ব সেই আমানত আদায়ের এক মহা সুযোগ।
সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত আমরা মেহরাবের ইমাম নাকি উম্মাহর ইমাম। রাসূল ﷺ শুধু মেহরাবের ইমাম ছিলেন না। তিনি মানুষের হৃদয়ের ইমাম ছিলেন।
আজ একজন যুবক পথ হারালে কি আমরা কষ্ট পাই?একটি পরিবার ভেঙে গেলে কি আমাদের ঘুম হারাম হয়?একজন মুসল্লির সন্তান নাস্তিক হয়ে গেলে কি আমাদের চোখে পানি আসে?
রাসূল ﷺ-এর আসত। মানুষ জাহান্নামে যাবে এই চিন্তায় তাঁর হৃদয় ভেঙে যেত। আজ আমরা নামাজহীন মানুষের জীবন নিয়ে কতটুকু চিন্তিত?
নেতৃত্বের ভাষা: গ্রহণ নয়, প্রদান
***************************
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ কে?
সবচেয়ে বেশি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন কে?
নিঃসন্দেহে তিনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ ছিলেন না। তাঁর নামে অট্টালিকা ছিল না।
সোনা-রূপার ভাণ্ডার ছিল না। মৃত্যুর সময় তিনি বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন না। বরং এমনও সময় গেছে, যখন তাঁর ঘরে মাসের পর মাস চুলা জ্বলেনি।
তবুও তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাতা। কারণ দান শুধু অর্থের মাধ্যমে হয় না। দান শুরু হয় হৃদয় থেকে।
রাসূল ﷺ মানুষকে কী দিয়েছেন?
তিনি সময় দিয়েছেন। যখন সবাই ব্যস্ত ছিল, তিনি মানুষের কথা শুনেছেন। একজন বৃদ্ধা কথা বলতে চাইলে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। একজন সাহাবী সমস্যা নিয়ে এলে সময় দিয়েছেন। একজন যুবক প্রশ্ন নিয়ে এলে তাকে ফিরিয়ে দেননি।
তিনি ভালোবাসা দিয়েছেন। এতিমকে ভালোবাসা দিয়েছেন। গরিবকে ভালোবাসা দিয়েছেন। শিশুদের ভালোবাসা দিয়েছেন। যুবকদের ভালোবাসা দিয়েছেন।
এমনকি যারা তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, তাদেরও ভালোবাসা দিয়েছেন।
তিনি ক্ষমা দিয়েছেন। মক্কার মানুষ তাঁকে নির্যাতন করেছে। অপমান করেছে। বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। যুদ্ধ করেছে। তাঁর সাহাবীদের হত্যা করেছে।
কিন্তু মক্কা বিজয়ের দিন তিনি বললেন—
اذهبوا فأنتم الطلقاء
যাও, আজ তোমরা মুক্ত। ক্ষমা করার মতো শক্তি খুব কম মানুষের থাকে। আর এটাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়।
তিনি ইলম দিয়েছেন। অন্ধকার পৃথিবীকে আলো দিয়েছেন। জাহেলিয়াতকে হিদায়াতে রূপান্তর করেছেন। একটি অশিক্ষিত জাতিকে পৃথিবীর শিক্ষক বানিয়েছেন।
আজ আমরা কুরআন জানি, সুন্নাহ জানি, ইসলাম জানি কার মাধ্যমে? রাসূল ﷺ-এর মাধ্যমে।
তিনি দোয়া দিয়েছেন। উম্মাহর জন্য কেঁদেছেন।
উম্মাহর জন্য রাত জেগেছেন। উম্মাহর জন্য হাত তুলেছেন। কিয়ামতের দিনও তাঁর সবচেয়ে বড় চিন্তা হবে উম্মাতি, উম্মাতি।”
তিনি করুণা দিয়েছেন। আল্লাহ তাঁকে পরিচয় করিয়েছেন—
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি।
তিনি শুধু মুসলমানদের জন্য রহমত ছিলেন না। তিনি সমগ্র মানবতার জন্য রহমত ছিলেন।
আর সবশেষে তিনি নিজের জীবনও দিয়েছেন। তাঁর শরীর ক্লান্ত হয়েছে। তাঁর পা ফুলে গেছে। তাঁর কপাল রক্তাক্ত হয়েছে। তাঁর দাঁত শহীদ হয়েছে। তাঁর প্রিয় সাহাবীরা শহীদ হয়েছে। তবুও তিনি থামেননি। কারণ তিনি নেওয়ার জন্য আসেননি। দেওয়ার জন্য এসেছিলেন।
এখানেই নববী নেতৃত্ব আর সাধারণ নেতৃত্বের পার্থক্য।সাধারণ মানুষ হিসাব করে আমাকে কত সম্মান দিল?আমাকে কত মূল্যায়ন করল? আমাকে কত টাকা দিল? আমাকে কত সুযোগ দিল?
কিন্তু নবীরা হিসাব করেন আমি কতজনকে আল্লাহর দিকে আনলাম? আমি কতজনের কষ্ট কমালাম? আমি কতজনের চোখের পানি মুছলাম? আমি কতজনের জীবন বদলাতে পারলাম?
আজ আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা দরকার। আমি কি সমাজ থেকে শুধু পাওয়ার অপেক্ষায় আছি? নাকি দেওয়ার জন্য বেঁচে আছি? আমি কি শুধু সম্মান চাই?নাকি মানুষের উপকার করতে চাই? আমি কি শুধু নিজের অভাবের হিসাব রাখি? নাকি আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তার হিসাবও রাখি?
যারা শুধু পেতে চায়, তারা মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। আর যারা দিতে জানে, তারা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। রাসূল ﷺ আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে জীবিত। কারণ তিনি সবচেয়ে বেশি নিয়েছিলেন বলে নয়। বরং তিনি সবচেয়ে বেশি দিয়েছিলেন বলে।
সুতরাং প্রকৃত নেতৃত্বের ভাষা হলো আমি কী পেলাম?” নয়। আমি কী দিলাম। এটাই নবীদের ভাষা। এটাই সাহাবীদের ভাষা। এটাই প্রকৃত ইমামতির ভাষা। এটাই উম্মাহ গঠনের ভাষা।আমাদের ইমামদেরকে এই মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ইমাম সমাজ পরিবর্তন হলে সমাজ পরিবর্তন হবে।
সাহাবীরা কেন ইতিহাস বদলেছেন?
*****************************
আবু বকর (রা.) নিজেকে উজাড় করেছেন। উমর (রা.) আরাম ত্যাগ করেছেন। উসমান (রা.) সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছেন। আলী (রা.) জীবন উৎসর্গ করেছেন। তারা অধিকার দিয়ে ইতিহাসে অমর হননি। ত্যাগ দিয়ে অমর হয়েছেন।
যারা বেশি পেতে চেয়েছে, তারা ইতিহাসে হারিয়ে গেছে। যারা বেশি দিয়েছে, তারা ইতিহাস তৈরি করেছে।
দিনমজুর সাহাবীরাও দাতা ছিলেন ইতিহাসের অনেক সাহাবী ছিলেন শ্রমিক। দিনভর কাজ করেছেন। ক্ষুধা সহ্য করেছেন। কিন্তু মসজিদে এসে দিয়েছেন। আজ আমাদের কাছে তাদের চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ আছে। তবুও আমরা কেন নিজেদের সবচেয়ে বঞ্চিত মনে করি?
কেন আমরা সবসময় অভাবের হিসাব করি, অথচ আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের হিসাব করি না?
পাওয়ার মানসিকতার বিষ
***********************
একজন ইমাম যখন প্রতিনিয়ত ভাবেন আমাকে কত বেতন দিল? আমাকে কত সম্মান দিল? আমাকে কত হাদিয়া দিল?
তখন ধীরে ধীরে তার হৃদয় সংকুচিত হয়ে যায়। সে আর সমাজের ব্যথা অনুভব করতে পারে না। সে শুধু নিজের ব্যথা অনুভব করে। কিন্তু নবীরা নিজেদের কষ্টের চেয়ে উম্মাহর কষ্ট বেশি অনুভব করতেন।
সমাজের প্রতিটি সংকট আমার জন্য একটি প্রশ্ন।
আজ একজন যুবক মাদকাসক্ত। এটি শুধু তার ব্যর্থতা নয়। এটি আমার জন্যও একটি প্রশ্ন।
আজ একটি পরিবার ভেঙে গেছে। আমি কি কখনো তাদের সাথে বসেছিলাম? আজ একজন ব্যবসায়ী সুদে ডুবে গেছে। আমি কি তাকে হালাল অর্থনীতির শিক্ষা দিয়েছিলাম? আজ একজন কিশোর পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। আমি কি তার বন্ধু হয়েছিলাম?
আজ একজন মেয়ে ইসলাম নিয়ে সংশয়ে ভুগছে। আমি কি তার প্রশ্নের উত্তর পৌঁছে দিয়েছিলাম?
মসজিদের বাইরে আমার উম্মাহ
****************************
আমরা অনেক সময় মনে করি মানুষ মসজিদে এলে আমার দায়িত্ব। কিন্তু রাসূল ﷺ মানুষের অপেক্ষা করেননি। তিনি মানুষের কাছে গেছেন। বাজারে গেছেন। রাস্তায় গেছেন। ঘরে গেছেন। অসুস্থদের কাছে গেছেন। যুবকদের কাছে গেছেন। যারা মসজিদে আসে না, তাদের কাছেও গেছেন।
কিয়ামতের দিনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন
*********************************
কিয়ামতের দিন আল্লাহ হয়তো আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না তোমার বেতন কত ছিল? তোমাকে কত হাদিয়া দেওয়া হতো? তোমাকে কত সম্মান করা হতো?
কিন্তু জিজ্ঞাসা করবেন তোমার এলাকার যুবকদের জন্য তুমি কী করেছিলে? তোমার এলাকার পরিবারগুলোর জন্য তুমি কী করেছিলে? তোমার মসজিদের বাইরের মানুষদের জন্য তুমি কী করেছিলে? আমি তোমাকে যে ইলম দিয়েছিলাম, তুমি কতজনের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলে?
আমরা পাওনাদার নই, আমানতদার
*******************************
ইমামতি চাকরি নয়। ইমামতি ভাতা নয়। ইমামতি শুধু সম্মানের আসন নয়। ইমামতি হলো নবুওয়াতের উত্তরাধিকার।্যআমরা সমাজের মালিক নই। আমরা সমাজের খাদেম। আমরা পাওনাদার নই। আমরা আমানতদার।
আমাদের কাজ দাবি করা নয়। আমাদের কাজ দেওয়া। আমাদের কাজ অভিযোগ করা নয়। আমাদের কাজ মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা।
যেদিন ইমামের চিন্তা বদলাবে, সেদিন মসজিদ বদলাবে। যেদিন মসজিদ বদলাবে, সেদিন সমাজ বদলাবে। আর যেদিন সমাজ বদলাবে, সেদিন ইতিহাস বদলাবে। কারণ নবীদের পথ ছিল পাওয়ার পথ নয়, দেওয়ার পথ।