মসজিদ নিয়ে এবারের আলোচনার বিষয় অত্যন্ত স্পর্শকাতর, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্নটি হলো এই মসজিদ কার?যে ব্যক্তি জমি দিয়েছেন, মসজিদ কি তার? যেই মহল্লায় মসজিদ হয়েছে মসজিদ কি সেই মহল্লা বাসীর। যে ব্যক্তি টাকা দিয়েছেন, মসজিদ কি তার? যে কমিটি পরিচালনা করে, মসজিদ কি তাদের? যে ইমাম নামাজ পড়ান, মসজিদ কি তার?
নাকি মসজিদ একমাত্র আল্লাহর?
কুরআন আমাদের এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য; অতএব তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে আহ্বান করো না।(সূরা জিন: ১৮)
খেয়াল করুন আল্লাহ বলেননি, মসজিদ ধনীদের আল্লাহ বলেননি, মসজিদ কমিটির। আল্লাহ বলেননি, মসজিদ কোনো বংশ বা পরিবারের। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন মসজিদ আল্লাহর।
মসজিদ নির্মাণের পর মালিকানা কার?
***************************”*****
ইসলামী শরীয়তে যখন কোনো জমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ হিসেবে ওয়াকফ করা হয়, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকে না। এটি আল্লাহর ঘরে পরিণত হয়।
যে ব্যক্তি কোটি টাকা খরচ করে মসজিদ নির্মাণ করলেন, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন। রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَنْ بَنَى لِلَّهِ مَسْجِدًا بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ
যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।
(সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
কিন্তু মসজিদ নির্মাণের সওয়াব পাওয়া আর মসজিদের মালিক হওয়া এক কথা নয়। মালিকানা আল্লাহর। তবে আল্লাহর ঘর নির্মাণে যারা যে পরিমাণ অংশগ্রহণ করেছে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবাইকে তাদের পাওনা বুঝিয়ে দিবেন। কিন্তু এ অংশগ্রহণের কারণে কাউকে মালিকানা দিবেন না। এটা সম্ভব না।
একটি বিপজ্জনক মানসিকতা
***************************
আমাদের সমাজে অনেক সময় শোনা যায়—এই মসজিদ আমার টাকায় হয়েছে। এই মসজিদের সব সিদ্ধান্ত আমার। ইমামকে আমি এনেছি, আমি তাড়াবো। আমার অনুমতি ছাড়া কিছু হবে না।
এই ভাষা আল্লাহর ঘরের ভাষা নয়। মসজিদ যদি আল্লাহর হয়, তাহলে সেখানে কারো ব্যক্তিগত আধিপত্যের সুযোগ নেই। এখানে সবাই আল্লাহর গোলাম। এই ঘরে রাজা-প্রজা সবাই সমান।
কাবা শরীফ আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মসজিদ হলো
মাসজিদুল হারাম। এটি নির্মাণ করেছিলেন ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)।
কিন্তু কখনো কি তারা বলেছিলেন এটা আমাদের পারিবারিক মসজিদ। বরং এ মসজিদ নির্মাণের পর তারা দোয়া করেছিলেন:
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا
“ষহে আমাদের রব! আপনি আমাদের থেকে কবুল করুন।্য(সূরা বাকারা: ১২৭)
এটাই মুমিনের ভাষা। সে কাজ করে। একজন মুমিন তার নেকি দ্বারা সওয়াবের আশা করে।্কিন্তু মালিকানা দাবি করে না।
মসজিদের প্রকৃত মালিক কারা? অনেকে বলবেন তাহলে মসজিদের মালিক কে? উত্তর হলো মসজিদের মালিক আল্লাহ।আর মসজিদের প্রকৃত আবাদকারী হলো মুমিনরা। আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ
আল্লাহর মসজিদ আবাদ করে তারাই, যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে। (সূরা তাওবা: ১৮)
আবাদ মানে শুধু দেয়াল তোলা নয়। আবাদ মানে নামাজ, কুরআন শিক্ষা, জিকির, দাওয়াত, নৈতিকতা
সমাজসেবা।ৎমসজিদে এ আমল গুলো থাকতে হবে। এই আমলগুলো একটি জীবন্ত মসজিদ গড়ে তোলে।
রাসূল ﷺ-এর যুগে মসজিদে কার প্রভাব চলত?
রাসূল ﷺ-এর যুগে মসজিদে নববীতে অনেক ধনী সাহাবী ছিলেন।
হযরত আবু বকর ছিলেন ধনী সাহাবী। হযরত ওমর ছিলেন প্রভাবশালী। হযরত ওসমান ছিলেন সম্পদশালী। হযরত আব্দুর রহমান ছিলেন ব্যবসায়ী।
কিন্তু কখনো কি তারা অর্থের জোরে মসজিদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? এমনটি কখনো হয়নি।
সেখানে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব ছিল ওহীর। তারপর রাসূল ﷺ-এর। তারপর জ্ঞান, তাকওয়া ও শরীয়তের। উমর (রা.)-এর যুগের একটি ঘটন। খলিফা উমর ফারুক (রা.) একবার মসজিদে নববীতে খুতবা দিচ্ছিলেন।
তিনি বললেনযদি আমি সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হই, তাহলে তোমরা কী করবে?
এক সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন আমরা আমাদের তরবারি দিয়ে আপনাকে সোজা করে দেব। উমর (রা.) রাগ করেননি। বরং আল্লাহর প্রশংসা করেছেন যে তাঁর উম্মতের মধ্যে এমন মানুষ আছে যারা সত্য কথা বলতে সাহস করে। কারণ মসজিদ ছিল সত্যের স্থান, ব্যক্তিপূজার স্থান নয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা আজ কিছু জায়গায় দেখা যায়
মসজিদের ভেতরেও দলাদলি। বংশের আধিপত্য। রাজনৈতিক প্রভাব। দানকারীর প্রভাব। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ। মহল্লাবাসীর প্রভাব। ফলে মসজিদ ঐক্যের কেন্দ্র না হয়ে বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়। কখনো কখনো দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে মুসল্লিরা বিভক্ত হয়ে যায়।
মসজিদের ইমাম ও দায়িত্বশীলরা অস্থিরতায় ভোগেন।
তারা উভয় পক্ষের চাপে মানসিক টর্চারের শিকার হোন।
একই মহল্লায় দুই জামাত, দুই ঈদ, দুই কমিটি। শয়তান এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারে? মসজিদে ক্ষমতার লড়াই কেন বিপজ্জনক? কারণ মসজিদ আল্লাহর ঘর। এখানে মানুষের অহংকার প্রবেশ করলে বরকত কমে যায়। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহীহ মুসলিম)
যখন মানুষ আল্লাহর ঘরকে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র বানায়, তখন মসজিদের রূহ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। মসজিদের প্রকৃত খাদেম কারা?
মসজিদের প্রকৃত খাদেম সেই ব্যক্তি যিনি জুতা গুছিয়ে রাখেন। যিনি পরিষ্কার করেন। যিনি আজান দেন। যিনি নামাজ পড়ান। যিনি বিদ্যুৎ বিল দেন। যিনি নীরবে দান করেন।যিনি মুসল্লিদের খোঁজ নেন। যিনি ফজরের জামাতে হাজির হন। আল্লাহর কাছে সবাই সম্মানিত।কারো পদবী নয়, নিয়তই আসল।
একটি আবেগময় দৃশ্য কল্পনা করুন আপনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আপনার বাড়ি অন্যের হয়ে গেছে। আপনার ব্যবসা অন্যের হাতে গেছে। আপনার ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে গেছে। আপনার সন্তানরাও একদিন চলে যাবে।
কিন্তু যে মসজিদের জন্য আপনি একটি ইট দিয়েছিলেন, একটি ফ্যান কিনেছিলেন, একটি কার্পেট দিয়েছিলেন সেই সওয়াব হয়তো কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে।তাহলে আমরা কেন আল্লাহর ঘরকে নিজের সম্পত্তি মনে করি?
একটি চমৎকার মসজিদ গড়ে তোলার জন্য করণীয়
১. মসজিদকে ব্যক্তি গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
২. কমিটিকে খাদেমের মানসিকতায় কাজ করতে হবে।
৩. ইমামকে মর্যাদা দিতে হবে।
৪. মুসল্লিদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
৫. মসজিদকে শুধু নামাজের স্থান নয়, সমাজ গঠনের কেন্দ্র বানাতে হবে।
মসজিদ আমার নয়। মসজিদ আপনার নয়। মসজিদ কোনো কমিটির নয়। মসজিদ কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। মসজিদ কোনো পরিবারের নয়। মসজিদ আল্লাহর। আমরা সবাই শুধু সাময়িক খাদেম।আজ আমরা আছি, কাল থাকব না।কিন্তু আল্লাহর ঘর থাকবে।
সুতরাং আসুন মালিকের মতো নয়,খাদেমের মতো মসজিদের সাথে সম্পর্ক গড়ি।ক্ষমতার জন্য নয়,
সওয়াবের জন্য কাজ করি। আধিপত্যের জন্য নয়,
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদকে ভালোবাসি।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর ঘরের প্রকৃত খাদেম হিসেবে কবুল করুন।