আজকের আলোচনা প্রিয় নবীজির মেরাজ নিয়ে।
মেরাজ শুধুমাত্র একটি ইতিহাস নয়, মেরাজ এই উম্মতের সম্মান, মেরাজ, প্রিয় নবী ﷺ–এর অবস্থান,
মেরাজ আমাদের ঈমানের মানদণ্ড।
প্রিয় নবীজির মেরাজের আলোচনা কোরআনের মাঝে এসেছে। অসংখ্য হাদিসের মাঝে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজের ঘটনা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
আল্লাহ বলেন— سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا
“পবিত্র তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতে নিয়ে গিয়েছেন।” (সূরা ইসরা: ১)
কোরআনে কারীমের এই আয়াতের মাঝে লক্ষ্য করুন
আল্লাহ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করেছেন আমার বান্দা। আল্লাহ বলেছেন আব্দিহি— আমার বান্দা। এই শব্দের মাঝেই রয়েছে মেরাজের রহস্য।
এখানে বলা হয়েছে “عَبْدُهُ” — আল্লাহর প্রিয় ডাক। এই ডাকের মাঝে আছে সম্মান মর্যাদা ভালোবাসা। মেরাজের আলোচনা করতে যেয়ে আল্লাহ প্রিয় রাসূলকে স্মরণ করলেন কিভাবে। নবী রাসুল খলিল হাবিব ইত্যাদি কোন উপাধিতে আল্লাহ তাকে স্মরণ করেননি
আল্লাহ বললেন—سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا
“পবিত্র তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতে নিয়ে গিয়েছেন।” (সূরা ইসরা: ১)
আল্লাহ তাকে স্মরণ করেছেন আব্দিহি— আমার বান্দা।
কেন “আব্দুহু” বললেন আল্লাহ?
কারণ— আল্লাহ জানিয়ে দিলেন এই সম্মান ক্ষমতার কারণে নয়, এই সম্মান নবুয়তের কারণে নয়, এই সম্মান এসেছে সম্পূর্ণ বান্দাগিরির কারণে।
আরেকটি জায়গায় আল্লাহ বলেন—
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ
“বরকতময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দার উপর কুরআন নাজিল করেছেন।” (সূরা ফুরকান: ১)
কুরআন নাজিলেও— আব্দুহু মেরাজেও— আব্দুহু
অর্থাৎ—নবী ﷺ–এর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি আল্লাহর সম্পূর্ণ বান্দা।
আজ আমাদের কেউ উপলব্ধি করতে হবে যে নবী—
আমাদের জন্য কেঁদেছেন, আমাদের জন্য মেরাজে দরকষাকষি করেছেন, আমাদের জন্য কিয়ামতে সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তাঁকে পরিচয় দিলেন—
“আমার বান্দা।”
আজ আমরা যদি আল্লাহর কাছে প্রিয় হতে চাই—
তবে রাসূল ﷺ–এর এই পরিচয়কেই ধরতে হবে।
এখানে “বান্দা” শব্দটি অপমানের নয়, এটি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদার পরিচয়। কারণ—নবুয়ত এসেছে বান্দার পর, রিসালাত এসেছে বান্দার পর, মেরাজ এসেছে বান্দার পর। যে যত বড় বান্দা—সে তত আল্লাহর কাছে প্রিয়।
মেরাজের প্রেক্ষাপট
প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে মেরাজ কখন এসেছিল। মেরাজ হঠাৎ আসেনি। মেরাজ এসেছে চূড়ান্ত কষ্টের পর। নবুওতির দশম বছর।
নবুয়তের দশম বছর খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল। হযরত খাদিজা ছিলেন প্রিয় নবীজির ঘরের শান্তি, দাওয়াতের সাহস, দুঃখের সান্ত্বনা।
নবী ﷺ বলেছেন— “খাদিজা আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন, যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করেছিল।”(মুসনাদ আহমদ)
নবুয়তের দশম বছর আবু তালিবের ইন্তেকাল
যিনি ঈমান আনেননি, কিন্তু পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রিয় নবীজির পাশে।
শি‘বে আবি তালিব তিন বছর অবরুদ্ধ ছিলেন প্রিয় নবী এবং তার গোত্র। তাদেরকে ঠিক এ সময় মোকাবেলা করতে হয়েছে ক্ষুধার যন্ত্রণা শিশুদের কান্না এবং কঠিন বয়কট।
তায়েফের নির্যাতন। পাথরের আঘাতে নবী ﷺ–এর পা রক্তাক্ত। হাদিসে আছে—
“আমি মাথা তুললে দেখতাম রক্তে জুতা ভিজে গেছে।”
(সহিহ বুখারি)
প্রিয় নবী এই অবস্থায়ও তিনি বদদোয়া করেননি। বলেছিলেন—“হে আল্লাহ! যদি তুমি অসন্তুষ্ট না হও, তবে আমার কোনো দুঃখ নেই।”
প্রিয় রাসূলের জীবনে মেরাজ এসেছে কখন। এমন এক সময়ে ঠিক যখন দুনিয়ার চোখে তিনি ছিলেন নির্যাতিত…তায়েফে পাথর খেয়েছেন, মক্কায় অপমানিত হয়েছেন, একাকী কেঁদেছেন আল্লাহ তখন তাকে মেরাজ দিলেন। আর আল্লাহ ঘোষণা করলেন— “এ আমার বান্দা।” আল্লাহ যেন বলছেন—
“হে দুনিয়া! যাকে তুমি অপমান করেছ, সে আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা।”
প্রশ্ন: আল্লাহ কি নবীকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এসব দিলেন? উত্তর: না।
আল্লাহ কষ্ট দেন না—
আল্লাহ যখন কাউকে উঁচুতে তুলতে চান তখন তার জন্য কষ্টের একটি সিঁড়ি বানান। আল্লাহ যখন দুনিয়াকে নতুন একটি সকাল দিতে চান তার আগে পৃথিবীতে অন্ধকার একটি রাত দান করেন। মেরাজ ছিল প্রিয় নবীজির জীবনে কঠিন কষ্টের পর আল্লাহর দেয়া শ্রেষ্ঠতম উপহার।
ইসরা: দুনিয়া থেকে আসমানের পথে
নবী ﷺ–এর কাছে এলেন জিবরাঈল (আ.)। বুক চিরে দেওয়া হলো। সর্বপ্রথম প্রিয় নবীজির ওপেন হার্ট সার্জারি হল। ঠিক এমনটি তার হয়েছে জীবনে তিনবার। ঈমান, হিকমাহ, নূর দিয়ে ভরা হলো।
তারপর এল বোরাক। হাদিসে আছে—
“বোরাক এমন বাহন, যার গতি চোখের দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত।” (সহিহ মুসলিম)
এই বোরাকে করেই মক্কা থেকে বাইতুল মাকদিস মসজিদে আকসা মুহূর্তের মাঝে তিনি উপস্থিত হন।
মসজিদে আকসা: নেতৃত্বের ঘোষণা
সব নবী উপস্থিত। মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম জমায়েত। সেখানে হলো ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম জামায়াত। যে জামায়াতের সমস্ত মুক্তাদী নবী ও রাসুল। হযরত আদম থেকে সর্বপ্রথম নবী থেকে সর্বশেষ নবী। জিবরাঈল (আ.) বললেন—
“ইমামতি করুন, হে মুহাম্মদ ﷺ।” নবীজির পেছনে সব নবী! এটাই উম্মতের মর্যাদা।
প্রশ্ন: আকসার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী?
উত্তর: আকসা শুধু ভূমি নয়। আকসা আমাদের সেই সম্মানিত মসজিদ যেখানে আমাদের নবী ইমামতি করেছেন সমস্ত নবীদের। এটা আমাদের নবীর ইমামতির মসজিদ।
মসজিদে আকসা থেকে উর্ধগমন আসমানসমূহে ভ্রমণ। প্রত্যেক আসমানে সম্মান, অভ্যর্থনা জানানো হয় তাকে। সেখানে তাকে অভ্যর্থনা জানান শ্রেষ্ঠতম নবীগণ। প্রত্যেক নবীর মুখে এক কথা“স্বাগতম হে প্রিয় নবী।” বিশেষ করে মূসা (আ.) কাঁদলেন।
বললেন—“তোমার উম্মত আমার উম্মতের চেয়ে বেশি জান্নাতে যাবে।” এভাবেই চলতে থাকে উর্ধগমন।
সিদরাতুল মুনতাহা ও বিশেষ সাক্ষাৎ
এখানে জিবরাঈল থেমে গেলেন। বললেন—
“আমি আর এগোতে পারবো না।”
কিন্তু নবী ﷺ এগোলেন।
আল্লাহ বলেন— لَقَدْ رَأَىٰ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَىٰ
(সূরা নাজম: ১৮)
মেরাজ আমাদের শিক্ষা দেয়। দুনিয়া ছেড়ে দিলে আসমান মেলে। কষ্টের পর সম্মান আসে। নবী ﷺ কখনো একা নন। আজ আমরা দুঃখে ভেঙে পড়ি,
কিন্তু আমাদের নবী ﷺ শিখিয়ে গেছেন “আল্লাহ থাকলে কেউ একা নয়।”
মেরাজের সবচেয়ে বড় শিক্ষা: সালাত
মেরাজ থেকে নবী ﷺ অনেক কিছু দেখেছেন।
জান্নাত দেখেছেন, জাহান্নাম দেখেছেন, ফেরেশতাদের ইবাদত দেখেছেনকিন্তু উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছেন মাত্র একটি জিনিস সালাত
আল্লাহ বলেন— وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي
“আমাকে স্মরণ করার জন্য সালাত কায়েম করো।”
(সূরা ত্বহা: ১৪)
সালাত ইসলামের এমন এক এবাদত যা সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে নবীজি উপহার গ্রহণ করেছেন। কোনো ফেরেশতার মাধ্যমে নয় কোনো ওহির মাধ্যমেও নয়। এজন্যই বলা হয়—সালাত হলো মুমিনের মেরাজ
প্রশ্ন: সালাত এত গুরুত্বপূর্ণ হলে আমরা অবহেলা করি কেন? উত্তর: কারণ আমরা সালাতকে দায়িত্ব ভাবি, মেরাজ ভাবি না। যেদিন সালাতে দাঁড়িয়ে মনে হবে—
“আমি এখন আল্লাহর সামনে”সেদিন সালাত বদলে যাবে।
মেরাজের সবচেয়ে আবেগময় দৃশ্য
যখন আল্লাহ প্রথমে দিলেন ৫০ ওয়াক্ত সালাত। প্রিয় নবী তা নিয়ে ফিরছিলেন। দেখা হলো হযরত মুসার সাথে। মূসা (আ.) বললেন “আপনার উম্মত পারবে না।” নবী ﷺ ফিরে গেলেন। কমিয়ে আনলেন। আবার ফিরে গেলেন কমিয়ে আনলেন আবার ফিরে গেলেন কমিয়ে আনলেন। এভাবে অনেকবার।
এই যাতায়াত কার জন্য? আমার জন্য। আপনার জন্য। এই উম্মতের জন্য। জীবনের এই শ্রেষ্ঠতম সফরেও প্রিয় নবী উম্মতকে ভুলে যাননি।
শেষ পর্যন্ত ৫০ ওয়াক্ত হলো পাঁচ ওয়াক্ত। প্রিয় নবীজির আবেদনে আল্লাহ দায়িত্ব কমিয়ে দিলেন কিন্তু পুরস্কার কমালেন না। আল্লাহ বললেন—“পাঁচই থাকবে, কিন্তু সওয়াব পঞ্চাশ।” এখানে আমাদের দেখতে হবে আল্লাহর দয়া নবীর দরদ উম্মতের প্রতি ভালোবাসা।
প্রশ্ন: নবী ﷺ কেন বারবার ফিরে গেলেন?
উত্তর: কারণ তিনি শুধু নবী নন। তিনি দয়ালু পিতা।
মেরাজ ও আমাদের জীবন
মেরাজের এই অসাধারণ উপহার আমরা কি সালাতকে মেরাজ বানিয়েছি? নবী ﷺ আসমানে উঠলেন, আর আমরা কি দুনিয়ায় ডুবে যাচ্ছি?
প্রশ্ন: আমরা কি মেরাজ পেতে পারি?
উত্তর:হ্যাঁ।
যেদিন সেজদা গভীর হবে,
সেদিন রূহ উঁচু হবে।
উম্মতের প্রতি প্রিয় নবীজির দরদকে একবার কল্পনা করুন—সেদিন কিয়ামতের মাঠ।সবাই ব্যস্ত।সবাই ভীত।
সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ এক কণ্ঠ শোনা যাবে। সেদিন যার জবান থেকে উচ্চারিত হবে“উম্মতি, উম্মতি!”
এই কণ্ঠ কার? সেই নবীর যিনি মেরাজে গিয়েআমাদের ভুলেননি। তিনি বলবেন—“হে আল্লাহ! এরা আমার উম্মত।”
প্রশ্ন একটাই আমরা কি তাঁর উম্মত হিসেবে উঠতে পারবো? যে নবী পাথরের আঘাতের পর বদ দোয়া না করে দুআ দিয়েছেন। মেরাজে গিয়েও উম্মত ভোলেননি।আমাদের জন্য কেঁদেছেন। আজ আমরা কি তাঁর সালাতকে অবহেলা করবো? মেরাজ পালন করা হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা। আসুন নামাজে যত্নবান হই। আমরা সবাই মেরাজের শিক্ষাতে সামনে রেখে আসুন আল্লাহর বান্দা হই। এটা আমাদের সবচেয়ে মর্যাদার পরিচয়।