রমজানের আগে শাবান দেওয়া হয়েছে রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য। তাই শাবান অনেক বড় একটি সুযোগ। প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ। রমজানের জন্য নিজেদের তৈরি করার সুযোগ।
যে কৃষক বীজ না বুনে ফসল চায় সে পাগল। ফসলের জন্য অবশ্যই সময়মতো বীজ বপন করতে হবে। এমনিভাবে রমজানকে সফল করতে শাবানে নিতে হবে প্রস্তুতি। যে মুসলমান শাবানে প্রস্তুতি ছাড়া রমজানে তাকওয়া চায় সে প্রকৃতপক্ষে নিজেকেই ধোঁকা দেয়।
শাবান মাসের গুরুত্ব ও মুমিনের অনুভূতি
শাবান এমন একটি মাস যে মাস সম্পর্কে নবী ﷺ বলেন, মানুষ এ মাসে গাফেল থাকে।
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، لِمَ تَصُومُ مِنْ شَعْبَانَ مَا لَا تَصُومُ مِنْ غَيْرِهِ؟ فَقَالَ: ذَلِكَ شَهْرٌ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَبٍ وَرَمَضَانَ، وَهُوَ شَهْرٌ تُرْفَعُ فِيهِ الْأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ، فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ
হাদিস: উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন আমি জিজ্ঞেস করলাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি শাবানে এত বেশি রোজা রাখেন কেন?”
তিনি বললেন“এটা এমন এক মাস, রজব ও রমজানের মাঝখানে, মানুষ এ মাসে গাফেল থাকে। অথচ এ মাসে আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়।”
(নাসাঈ)
আমাদের চিন্তা করা চাই যে মাসে আমল আল্লাহর কাছে পেশ হয়, সে মাসে গাফেল থাকা কি নিরাপদ?
না, কখনোই না।
কাজেই শাবান মাস গাফেলদের জন্য সতর্কতা, শাবান মাস তাওবার ডাক, শাবান মাস রমজানের আগমনী ঘণ্টা।
হতে পারে—এটাই আপনার জীবনের শেষ শাবান। কেউ কি গ্যারান্টি দিতে পারে—আগামী রমজান পর্যন্ত বেঁচে থাকব? আজ যদি চোখের পানি না পড়ে, কাল কবরে চোখ খুললেও আর কান্না কাজে আসবে না।
শাবানে নবী ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের আমল
আমাদের নবী ﷺ শাবান মাসে এমনভাবে ইবাদত করতেন যেন তিনি উম্মতকে বলে দিচ্ছেন। রমজানকে হালকাভাবে নিলে, রমজানও তোমাকে হালকাভাবে নেবে। প্রিয় নবীজির আমল হাদিস থেকে
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلَّا رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ فِي شَهْرٍ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ
সহিহ বুখারি: 1969, সহিহ মুসলিম: 1156
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন,
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে রমযান ছাড়া কোনো মাস পূর্ণ রোযা রাখতে দেখিনি। আর শা‘বান মাসের মতো অন্য কোনো মাসে তাঁকে এত বেশি রোযা রাখতে দেখিনি।
সাহাবাদের সমাজ শাবান এলে তারা বলতেন:
“هذا شهر القراء” — এটা কুরআনের মাস
দোকান খোলা থাকত, কিন্তু মন থাকত মসজিদে , ব্যবসা চলত, কিন্তু দ্বীন অগ্রাধিকার পেত
আজ শাবান চলছে কিন্তু শাবান নিয়ে কোন আলোচনা নেই। সামনে রমজান কিন্তু কোন পরিকল্পনা নেই।
শাবানে প্রস্তুতি গ্রহণ না করলে রমজানে জীবনের পরিবর্তন আসে না। শাবানে কুরআন না ধরলে রমজানে কুরআন ধরা হয় না। শাবানে নিয়ত ঠিক না হলে রমজানে দিক ঠিক হয় না। কাজেই শাবানের প্রস্তুতি ছাড়া রমজান সফল করা যায় না।
আর এটাই চূড়ান্ত রমজান যদি আপনাকে বদলাতে না পারে তাহলে আপনি রমজান পাননি। রমজানের রহমতের বৃষ্টির ছোঁয়া আপনি পাননি। এটাই জীবনের বড় দুর্ভাগ্য।
ইসলাম আমাদের কাছে চায় আত্মসমর্পণ। আল্লাহর দ্বীনের জন্য জান মাল সঁপে দেয়া।
আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন—জান্নাতের বিনিময়ে।” (সূরা তাওবা: ১১১)
একটা জান—দুই জায়গায় বিক্রি হয় না।
একটা মাল—দুই মালিকের হয় না।
আজ আমাদের জান কার কাছে বিক্রি? আল্লাহর কাছে, না দুনিয়ার কাছে? যে জান অল্পদিনের দুনিয়া অর্জনের বিক্রি করে দেয়া হলো সে জান্নাতে কিভাবে প্রবেশ করবে।
জান্নাত ফ্রি ঢোকার সুযোগ নেই। বিনিময় দিয়ে ঢুকতে হবে। আর সেদিনই মনে হল জান বিক্রি করে দিতে হবে আল্লাহর কাছে। বিনিময়ে আল্লাহ জান্নাত দিবেন।
ঈমান দাবি করলেই হয় না, ঈমান হলো এক চুক্তি। চুক্তি শুধু করলেই হয় না, চুক্তি রক্ষা করতে হয়। চুক্তি ভঙ্গ মারাত্মক অন্যায় আর তা যদি হয় আল্লাহর সাথে।
আমাদের উপলব্ধি করা চাই ঈমানের দাবি পূরণে সাহাবারা জান দিয়েছেন, আর আমরা আমরা অজুহাত দিচ্ছি। তারা শাহাদাত বেছে নিয়েছেন,
আমরা নিরাপত্তা বেছে নিয়েছি।
এক সাহাবি যুদ্ধ থেকে ফিরলেন। তার শরীরে অসংখ্য জখম। লোকেরা বলল “ভাই, আপনি তো সব হারালেন!”তিনি হাসলেন আর বললেন “না, আমি কিছু হারাইনি। আমি তো সব বিক্রি করেছি—আল্লাহর কাছে।”যে আল্লাহর কাছে বিক্রি করে সে কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
গল্প–১
“আমি ক্ষতিগ্রস্ত হইনি”—যুদ্ধ বদরের প্রাক্কালে
সাহাবি হযরত সুহাইব আর-রূমী (রা.) যার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস ছিল বিক্রির দলিল। তিনি কোনো কুরাইশ নেতা ছিলেন না। মক্কায় তিনি গোত্রসহ বসবাস করতেন না। তিনি ছিলেন একজন বিদেশি। নাম সুহাইব আর-রূমী (রা.)। মক্কায় তিনি ব্যবসা করে ধনী হয়েছিলেন।
কিন্তু যখন তিনি বললেন “আমার রব আল্লাহ, আমার নবী মুহাম্মদ ﷺ”। তিনি ঈমান আনলেন। হিজরতের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। কুরাইশরা তাকে আটক করল।তখন কুরাইশরা বলল, “তুমি যেতে পারো, কিন্তু তোমার সম্পদ রেখে যেতে হবে।”
এক জীবনের উপার্জন, ঘর, দোকান, সঞ্চয় সব এক মুহূর্তে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব!
কুরাইশ বলল,“মাল রেখে যাও, জান নিয়ে চলে যাও।”
আর সুহাইব (রা.) বললেন“যদি সব দিয়ে দেই, তাহলে কি যেতে দিবে?”কুরাইশ বলল“হ্যাঁ।”
তিনি রাজি হয়ে গেলেন। হিজরত করে মদিনায় পৌঁছালেন। নবী ﷺ তাঁকে দেখে বললেন—
«رَبِحَ الْبَيْعُ يَا سُهَيْبُ»
“হে সুহাইব! তোমার ব্যবসা লাভজনক হয়েছে।” (তিরমিজি)
সুহাইব (রা.) জানতেন এক সম্পদ দুইবার বিক্রি হয় না। তিনি দুনিয়ার বাজারে বিক্রি করেননি, তিনি আল্লাহর বাজারে বিক্রি করেছেন।
আমরা কি কখনো এমন বলেছি “হে আল্লাহ, সব নিয়ে নাও—আমাকে জান্নাত দাও”? না কি আমরা বলেছি—
“হে আল্লাহ, জান্নাত দাও—কিন্তু দুনিয়া ছারবো না”?

“আজ আমি শহীদ”—উহুদের প্রান্তরে
সাহাবি হযরত মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা.)
এবার এমন এক যুবকের গল্প যিনি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বিলাসী তরুণ। ধর্নাট্য পরিবারের ছেলে।
নামমুস‘আব ইবনে উমাইর (রা.)
মক্কার রাস্তায় তিনি হাঁটলে মানুষ আগে তার সুগন্ধ পেত। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর মা বললেন,
“ইসলাম ছাড়ো, নইলে সব কেড়ে নেব।”তিনি বললেন
“আমার ঈমান ছাড়া সব নাও।”
উহুদ যুদ্ধের দিন। মুস‘আব (রা.) ইসলামের পতাকা হাতে। এক আঘাতে ডান হাত কেটে গেল। তিনি পতাকা বাম হাতে ধরলেন। আরেক আঘাতে বাম হাত কেটে গেল। কল্পনা করুন দুই হাত নেই, তবু পতাকা পড়তে দেননি। তিনি বুকে চেপে ধরলেন পতাকা।
শেষ আঘাতে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন।
যুদ্ধ শেষে নবী ﷺ তাঁর লাশের কাছে এলেন।
কাফনের কাপড় এত ছোট মাথা ঢাকলে পা বের হয়, পা ঢাকলে মাথা বের হয়।
নবী ﷺ কাঁদলেন। একদিন যিনি রেশম পরতেন,
আজ তাঁর কাফনও পূর্ণ নয়। কেন? কারণ তিনি জান বিক্রি করেছিলেন আল্লাহর কাছে।
আমরা কি ইসলামকে এমন ভালোবাসি—
যাতে ইসলাম পড়ে গেলে আমরা নিজেরা ভেঙে যাই?
গল্প–৩
“একটু পানি নয়, জান্নাত চাই”—বদরের পর
সাহাবি: হযরত খবাব ইবনে আরাত (রা.)
এবার এমন একজন সাহাবির গল্প—
যার পিঠ ছিল আগুনে দগ্ধ। মক্কায় তাঁকে লোহার ওপর শুইয়ে দেওয়া হতো। গরম কয়লা রাখা হতো পিঠে।
চর্বি গলে আগুন নিভে যেত।
তিনি নবী ﷺ-কে বলেছিলেন—
“হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আমাদের জন্য দোয়া করবেন না?” নবী ﷺ বলেছিলেন “তোমাদের আগের উম্মতদেরকে করাত দিয়ে কাটা হয়েছে, তবুও তারা দ্বীন ছাড়েনি।”
খবাব (রা.) বুঝে গিয়েছিলেন এই পথের দাম আছে।
জান্নাত মানে আরাম নয়, জান্নাত মানে আত্মসমর্পণ।
“ইসলাম থাকুক, কিন্তু কষ্ট ছাড়া। কিন্তু সাহাবারা বলেছিলেন— “কষ্ট থাকুক, ইসলাম ছাড়া নয়।”
এই তিনজন সাহাবি সুহাইব, মুস‘আব, খবাব—
তারা কেউ বক্তা ছিলেন না, কেউ নেতা ছিলেন না।
কিন্তু তারা ছিলেন জান্নাতের ব্যবসায়ী। আজ শাবানের এই জুমায় দাঁড়িয়ে যেআল্লাহ আমাদেরও জিজ্ঞেস করছেন“তুমি কি বিক্রি করবে? নাকি শুধু দাম জানতে চাও?”
“আমরা জান্নাত বিশ্বাস করি—কিন্তু জান্নাতের জন্য প্রতিযোগিতা করি কি?”
আজ একেবারে শেষে এসে আমি আপনাদের সামনে
আল্লাহর একটি স্পষ্ট দাবি রেখে যেতে চাই।
আল্লাহ বলেন—
﴿وَسَارِعُوا إِلَىٰ مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ﴾
“তোমরা দৌড়ে চল—তোমাদের রবের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে।”
আরেক জায়গায় বলেন—
﴿فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ﴾
“তোমরা প্রতিযোগিতা কর—নেক কাজের দিকে।”
ভাইয়েরা! আল্লাহ আমাদের বলেননি শুধু জান্নাত বিশ্বাস করো। আল্লাহ বলেছেন—
জান্নাতের জন্য দৌড়াও, প্রতিযোগিতা করো।
আমরা কি জান্নাত বিশ্বাস করি? হ্যাঁ, করি।
কিন্তু আমরা কি জান্নাতের জন্য প্রতিযোগিতা করি?
না… আমরা প্রতিযোগিতা করি দুনিয়ার জন্য।
আমাদের দৌড়—পদ-পদবীর জন্য প্রভাবের জন্য সুবিধার জন্য ক্ষমতার জন্য
আর জান্নাত? জান্নাত যেন শুধু বিশ্বাসের বিষয়,
প্রতিযোগিতার বিষয় নয়।
যে দৌড়ে আপনি অংশ নেন না, সে দৌড়ে আপনি জিতবেন কীভাবে?
যে প্রতিযোগিতায় নামই লেখাননি, সে পুরস্কার আপনি পাবেন কেন? জান্নাত পাবে তারাই যারা জান্নাতের জন্য প্রতিযোগী হয়েছে।
নিরপেক্ষরা জান্নাতে যায় না। দর্শকরা জান্নাতে যায় না। প্রতিযোগীরাই জান্নাতে যায়। আজ শাবানের এই জুমায় দাঁড়িয়ে আমরা যদি সিদ্ধান্ত না নিই “আমি জান্নাতের দৌড়ে নামব”তাহলে রমজান এসে শুধু ক্যালেন্ডার বদলাবে, আমাদের জীবন বদলাবে না।
আজ ঠিক করে যান আমি দুনিয়ার প্রতিযোগী হব,
নাকি জান্নাতের প্রতিযোগী হব।
কারণ— দুনিয়ার প্রতিযোগিতা শেষ হবে কবরে,
আর জান্নাতের প্রতিযোগিতা শুরু হবে কবরে।