ডিসেম্বর: ইতিহাস, রক্ত ও প্রশ্নের মাস
ডিসেম্বর শুধু একটি মাস নয়, ডিসেম্বর স্মৃতি,ডিসেম্বর ত্যাগ, ডিসেম্বর দায়িত্ব। উসমান হাদীর শাহাদাত ডিসেম্বরকে আরো স্মরণীয় করে তুললো।
এই ডিসেম্বর আমাদের জিজ্ঞেস করে—
যে স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া হয়েছিল, তা কি মানুষের মুক্তি এনেছে?
যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ছিল, তা কোথায়?
যুগে যুগে জুলুমের মোকাবেলায় আত্মত্যাগ:
৪৭ এর আজাদীর সংগ্রাম ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ২৪ এর বৈষম্য বিরোধী সমাজ গড়ার বিপ্লব। এগুলো ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন নয়—এটা একটানা সংগ্রাম।
১৯৪৭: আজাদীর আকাঙ্ক্ষা
মানুষ চেয়েছিল, দ্বীন পালন করার স্বাধীনতা, শোষণমুক্ত জীবন
কিন্তু আজাদী যদি শুধু ক্ষমতার বদল হয়—
মানুষের মুক্তি না হয় তাহলে সেই আজাদী অসম্পূর্ণ।
১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য
একাত্তরে মানুষ জীবন দিয়েছে জুলুমের বিরুদ্ধে বৈষম্যের বিরুদ্ধে মর্যাদার জন্য
আল্লাহ বলেন—
وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا
“তোমরা জালিমদের দিকে ঝুঁকো না”
(সূরা হুদ: ১১৩)
২০২৪: তরুণের আর্তনাদ
আজকের বিপ্লব—
এটা ৪৭ ও ৭১–এর অসমাপ্ত স্বপ্নের ধারাবাহিকতা। এই মুক্তির সংগ্রামে অসংখ্য তরুনের রক্তে এ জমিন রঞ্জিত হয়েছে। স্বাধীনতার জন্য আমাদের রক্ত দেওয়ার ইতিহাস অনেক লম্বা। গতকাল রাতে বিপ্লবী তরুন ওসমান হাদী শহীদ হলো।
শহীদের রক্ত বৃথা যায় না
আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন—
> وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا
بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ
(সূরা আলে ইমরান: ১৬৯)
শহীদ ওসমান হাদী,
শহীদ একাত্তর—
তাঁরা সবাই আজ আমাদের প্রশ্ন করছেন—
তোমরা কি আমাদের রক্তকে শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখবে?
নাকি আদর্শে রূপ দেবে?
সুন্দর বাংলাদেশ চাই—কিন্তু কোথায় সেই বাংলাদেশ?
আমরা বলি—সোনার বাংলাদেশ।
কিন্তু এই দেশ এমন এক দেশ এই দেশে সত্য বললে বিপদ ন্যায় চাইলে ভোগান্তি জালিম নিরাপদ শক্তিশালী।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
إِذَا ضُيِّعَتِ الْأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ
“যখন আমানত নষ্ট হবে, কিয়ামতের অপেক্ষা করো।”
(সহিহ বুখারি)
আমাদের সংকট— নৈতিকতার সংকট আমানতের সংকট। এদেশে আমানতের খেয়ানত হয়। নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা হয়। এটা কিভাবে হবে সোনার বাংলাদেশ।
চারদিকে অন্ধকার—কিন্তু আলোর দায়িত্ব আমাদের। আজকের অবস্থা যদি আমরা বলতে চাই তাহলে বলতে হবে।
কোন দিকে পথ নেই সব দিকে বদ্ধ দুয়ার
কোন দিকে আলো নেই চারিদিকে ঘিরেছে আধার।
কিন্তু তাই বলে কি থানা যাবে। আমরা কি অন্ধকারের মাঝেই থাকবো। তা নয়। তবুও চলতে হবে সামনে যেতেই হবে। এক আলোকিত বাংলাদেশ আমাদের কি করে তুলতে হবে। সেজন্যই সংগ্রাম। অন্ধকারের মাঝে এক আলোকিত পৃথিবী গড়ে তোলার জন্যই আল্লাহ তার প্রিয় রাসূলকে পাঠিয়েছিলেন কোরআন দিয়ে
আল্লাহ বলেন—
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ
(সূরা ইবরাহিম: ১)
আজ রাসূল ﷺ নেই—
কিন্তু তাঁর উম্মত আছে। আমাদের কাছে প্রিয় রাসূলের কুরআন আছে।
আমরা কি আলো হবো, না অন্ধকারের অংশ? আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা আলো হবো। আর আমাদের আলোতে পৃথিবী আলোকিত হবে।
রাসূল ﷺ–এর সমাজব্যবস্থা বনাম আমাদের সমাজ
রাসূল ﷺ বলেছেন—
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ
“আমি প্রেরিত হয়েছি চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য।”
(মুয়াত্তা মালেক)
তাঁর সমাজেশাসক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে ছিলেন না
অমুসলিমও নিরাপদ ছিল দুর্বল অবহেলিত ছিল না
পৃথিবী ছিল আলোকিত।
তরুণদের দায়িত্ব: ইতিহাস সাক্ষী
তরুণ সমাজকে জেগে উঠতে হবে। তরুণরাই শক্তি। আজকে এ তরুণদের শক্তি অন্যায় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তরুণরা আজকে সবচাইতে অবহেলিত। আজ সমাজে তরুণদের বলা হয় কিশোর গ্যাং তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় তারা ত্রাস তৈরি করছে।
এ সমস্ত ত্বরণরা আজকে কেন অপরাধী। এরা কি মায়ের পেট থেকে অপরাধী হিসেবে জন্ম নিয়েছিল। সঠিক শিক্ষা এবং অভিভাবকত্বের অভাবে এবং সমাজের একশ্রেণীর নষ্ট নেতৃত্বের কারণে আজকের তরুণরা বিপথগামী।
অথচ এ তরুণরাই ছিল সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমাদের এ তরুণদের শক্তি কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে তরুণদের আলোচনা করেছেন।
আসহাবে কাহাফ এর আলোচনা। একটা অন্ধকার সমাজে অল্প কিছু তরুণ জেগে উঠেছিল। সেই গল্প আল্লাহ আলোচনা করেছেন কুরআনে। আল্লাহ বলেন—
إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ
“তারা ছিল কিছু যুবক, যারা তাদের রবের ওপর ঈমান এনেছিল।”
(সূরা কাহফ: ১৩)
রাসূল ﷺ–এর চারপাশে যারা ছিলেন—
তাঁরা তরুণই ছিলেন। প্রিয় রাসূল তরুণদের শক্তিকে এই কাজে লাগিয়েছিলেন। তাদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন নতুন সমাজ।
তরুণদের বলছি— আবেগ থাকবে
কিন্তু হিকমাহ লাগবে
রাসূল ﷺ বলেছেন—
الرِّفْقُ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ
“নরমতা যেখানে থাকে, সেখানেই সৌন্দর্য আসে।”
(মুসলিম)
প্রতিবেশী আধিপত্যবাদ ও ইসলামের কর্মনীতি
আমাদের এই ছোট্ট দেশটির চতুর্দিকে একটি বড় আধিপত্যবাদী দেশ। আমরা নানাভাবে তাদের দ্বারা আক্রান্ত। আমাদের স্বাধীনতা তাদের কাছে অপছন্দনীয়। আমাদেরকে এই শক্তির ব্যাপারে সাবধান হতে হবে। কিন্তু তার পদ্ধতি কি
আমাদের প্রিয় রাসূল মদিনায় হিজরত করার পর এক কঠিন পরিস্থিতির শিকার হলেন। মদিনার চতুর্দিক শত্রু দ্বারা বেষ্টিত ছিল। চতুর্দিকে শত্রু আর শত্রু। মদিনাতে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারে তারা ছিল বদ্ধপরিকর। ঠিক সেই মুহূর্তে দুটি পথ খোলা ছিল রাসূলুল্লাহর সামনে।
একটি হলো বেঁচে থাকার জন্য আপোষ করা। আর দ্বিতীয় হল শত্রুর পক্ষের সাথে লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। যুদ্ধের মাধ্যমে ফয়সালা হবে আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে না জাহিলিয়াত টিকে থাকবে।
সে কঠিন মুহূর্ত আল্লাহ হুকুম দিলেন মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার। জাহেলিয়াতের কাছে আত্মসমর্পণ করা যাবে না। নত হওয়া যাবে না।
আজকে আমাদের মাতৃভূমি তিন দিক দ্বারা শত্রু দ্বারা আক্রান্ত। আমরা কি আত্মসমর্পণ করবো না লড়াই করে স্বাধীনতা টিকাবো।
আল্লাহ বলেন—
وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ
(সূরা আনফাল: ৬০)
শক্তি মানে—ঈমানী শক্তিতে ঐক্যের শক্তিতে শিক্ষার শক্তিতে এগিয়ে যেতে হবে। কাপুরুষতা উগ্রতা কোনোটিই কাম্য নয়। ইসলাম শেখায় ইনসাফপূর্ণ দৃঢ়তা। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কিছু করা যাবে না।
কঠিন পরিস্থিতিতে ঈমানের পরীক্ষা হয়। ঈমানদাররা এ পরীক্ষায় জিতে যায়। পরীক্ষায় হেরে যায় মুনাফিক। আমাদেরকে এ পরীক্ষায় জিততে হবে। সাহস নিয়ে লড়তে হবে।
পরিবর্তনের বাস্তব পথ
রসূল ﷺ বলেছেন—
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল।”
(বুখারি, মুসলিম)
নিজে বদলাই, পরিবার বদলাই, সমাজে দাঁড়াই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গড়ি
আমরা কি শহীদের উত্তরসূরি হবো?
নাকি ইতিহাসের বোঝা?
মনে রাখবেন—
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
(সূরা রা’দ: ১১)
আমরা পরিবর্তন না হলে দেশ পরিবর্তন হবে না। আমার থেকে পরিবর্তন শুরু করতে হবে। আমরা পরিবর্তন না হলে দেশ পরিবর্তন হবে না।