প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা।

আজকের আলোচনার বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—মানবতার সেবায় দাঁড়ানো, দুর্বলদের অধিকার রক্ষা করা এবং প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা।

প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন রহমাতাল্লিল আলামিন। সকলের জন্য রহমত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় রাসূলকে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ ঘোষণা করেন। তার জীবনের সমস্ত কাজগুলো আমাদের জন্য অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয়। আমরা যখন তার অনুসরণ অনুকরণ করব তখন আমরাও পৃথিবীর জন্য সকলের জন্য রহমতে পরিণত হবো। আমাদের দ্বারা গড়ে উঠবে আলোকিত সমাজ।

প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গড়ে তোলা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এই পৃথিবীর জন্য ছিল রহমত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর বৈশিষ্ট্য ছিল মানবতার সেবায় দাঁড়ানো দুর্বলদের অধিকার রক্ষা করা মজলুমের পাশে দাঁড়ানো।

আজ অনেক মানুষ—এমনকি মুসলমানদের একটি অংশও—ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা শুনে ভয় পান। মনে করেন, ইসলামী সমাজ রাষ্ট্রকায়েম হলে জীবন কঠিন হয়ে যাবে, স্বাধীনতা হারিয়ে যাবে। অথচ বাস্তবে এটি হলো আল্লাহ প্রদত্ত একমাত্র সঠিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। এর চাইতে উন্নত কোনো ফর্মুলা আজ পর্যন্ত মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি, কারণ যা আল্লাহ দেন, তার বিকল্প কিছুই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।

নিজ সৃষ্টির প্রতি আল্লাহ সীমাহীন মেহেরবান। আল্লাহর বিধি-বিধান সকলের জন্য সর্বোচ্চ ইনসাফভিত্তিক।

وگر در دهد یک صلاح کرم

عزا زیل گوید نصیب برم

دوکونش یک قطرة در بحر علم

گنه بیند و پرده پوشد بحلم

وگر بر جفا پیشه بتافتی

که از دست قهرش امان یافته

আল্লাহর বিধানে মুসলিম অমুসলিম সমান। শুধুমাত্র অমুসলিম হওয়ার কারণে শাস্তির বিধানে কোন পার্থক্য নেই। অমুসলিম হওয়ার শাস্তি দুনিয়াতে নয় আখেরাতে হবে। ঈমান গ্রহণের ব্যাপারে মানুষ স্বাধীন। আল্লাহ বলেছেন

لا اكراه في الدين

আল্লাহর বিধানে জুলুম ও অবিচারের ময়লা আবর্জনা মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার জন্য জালেম ও দুষ্কৃতিকারীদের শাস্তি আছে।

প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গড়ে তোলা সমাজ ব্যবস্থা পৃথিবীবাসীর জন্য রহমত। এর মাধ্যমে দুর্বল তার সহায় পাবে। অধিকারী তার অধিকার পাবে।

প্রিয় নবী ﷺ মদিনায় যে রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন, তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—দুর্বলদের অধিকার রক্ষা, মজলুমের পাশে দাঁড়ানো।

কুরআন বলে:

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

“আমি আপনাকে তো সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (আনবিয়া: ১০৭)

তাই রসূল ﷺ শুধু মুসলমানদের নয়, অমুসলিম নাগরিকদের অধিকারও রক্ষা করেছেন।

হযরত আবু বকর রা. খেলাফত গ্রহণের পর প্রথম খুতবায় বলেছিলেন:

“তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বলই আমার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী, যতক্ষণ না আমি তার অধিকার আদায় করে দিই। আর তোমাদের ধনী শ্রেণীই আমার কাছে দুর্বল, যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে মজলুমের অধিকার আদায় করে নিই।”

এই ঘোষণাই প্রমাণ করে—খেলাফত দুর্বলদের ঢাল, জুলুমের প্রতিরোধ, মানবাধিকারের সর্বোচ্চ রক্ষক।

মদিনায় এক ইহুদি নাগরিক খলিফা উমর রা.-এর কাছে অভিযোগ করলেন যে এক মুসলিম তার জমি দখল করেছে। খলিফা উমর রা. সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করলেন এবং মুসলিম নাগরিককেই দোষী প্রমাণিত করে জমি ইহুদির হাতে ফিরিয়ে দিলেন।

এটাই ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার সৌন্দর্য্য —যেখানে সত্য ও ন্যায়ের সামনে মুসলিম-অমুসলিম, ধনী-গরিব সবার মর্যাদা সমান।

আল্লাহ কুরআনে বলেছেন-

۞ یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ كُونُوا۟ قَوَّ ٰ⁠مِینَ بِٱلۡقِسۡطِ شُهَدَاۤءَ لِلَّهِ وَلَوۡ عَلَىٰۤ أَنفُسِكُمۡ أَوِ ٱلۡوَ ٰ⁠لِدَیۡنِ وَٱلۡأَقۡرَبِینَۚ

وَلَا یَجۡرِمَنَّكُمۡ شَنَـَٔانُ قَوۡمٍ أَن صَدُّوكُمۡ عَنِ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ أَن تَعۡتَدُوا۟ۘ

{ یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ كُونُوا۟ قَوَّ ٰ⁠مِینَ لِلَّهِ شُهَدَاۤءَ بِٱلۡقِسۡطِۖ وَلَا یَجۡرِمَنَّكُمۡ شَنَـَٔانُ قَوۡمٍ عَلَىٰۤ أَلَّا تَعۡدِلُوا۟ۚ ٱعۡدِلُوا۟ هُوَ أَقۡرَبُ لِلتَّقۡوَىٰۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِیرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ }

[Surah Al-Māʾidah: 8]

প্রিয় রাসূলের রাষ্ট্র ও সামাজিক কাঠামো ছিল দুর্বল ও অসহায়দের সহায়। খলিফা ওমর রাতের অন্ধকারে ক্ষুধার্ত অসহায় পরিবার খুঁজে বের করতেন। বৃদ্ধ অসহায় অমুসলিম রাষ্ট্রপতিতে ভাতা পেত।

খালিফা হযরত ওসমান নিজের সমস্ত সম্পদ অসহায়দের জন্য বিলিয়ে দিয়েছিলেন। প্রিয় রাসূলের সে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছিল পৃথিবীর জন্য রহমত। খ্রিষ্ট ধর্মের রক্ষক রোমান দ্বারা নির্যাতিত খ্রিস্টানরা ইসলামে রাখতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। অমুসলিমরা ছিল এ রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপদ ও স্বাধীন।

আজকের বিশ্বে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, সমতা—সবকিছু লঙ্ঘিত হচ্ছে। আজকের পৃথিবী ভয়, দারিদ্র্য ও অবিচারে জর্জরিত।

এমন সময়ে যদি আমরা প্রিয় নবীর রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুসরণ করি, তবে তা হতে পারে আজকের সমস্যার চমৎকার সমাধান।

প্রিয় রাসূলের রাষ্ট্রীয় অসামাজিক কাঠামোর প্রতি অবজ্ঞা করা ঈমানের জন্য বড় হুমকি। আর এর প্রতি ভালোবাসা ভক্তি খাঁটি ঈমানের পরিচয়।

আসুন আমরা রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের খেলাফত থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্বলদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসি।

اللهم أرنا الحق حقا وارزقنا اتباعه، وأرنا الباطل باطلا وارزقنا اجتنابه…

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে খেলাফতের প্রতি ভালোবাসা দাও, দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দাও, এবং মানবতার সেবায় আমাদের কবুল করো।

Scroll to Top