আজ অনেক পিতা-মাতা আক্ষেপ করে বলেন আমি আমার সন্তানের জন্য জীবনের সবকিছু ত্যাগ করেছি। নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়েছি। দিনরাত পরিশ্রম করেছি। কিন্তু আজ সে আমার কাছে বসতে চায় না। কেউ বলেন ছোটবেলায় আমার সন্তান আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতো। আজ সে রাতভর মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু আমার সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলার সময় তার নেই। কেউ বলেন আমি তার জন্য নতুন পোশাক কিনেছি, ভালো স্কুলে পড়িয়েছি, তার সব চাহিদা পূরণ করেছি। কিন্তু সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে না। অথচ একটি মোবাইল ফোনের জন্য কাঁদে, একটি গেমের জন্য অস্থির হয়, এগুলো শুধু কিছু অভিযোগ নয় এগুলো হাজারো বাবা-মায়ের নীরব কান্না।
আর সন্তানদের দিকেও তাকান। অনেক সন্তানও আজ নিঃসঙ্গ। তাদের ঘরে খাবার আছে, খেলনা আছে, মোবাইল আছে, ইন্টারনেট আছে; কিন্তু কথা বলার মানুষ নেই। তাদের পাশে বাবা আছে, মা আছে, কিন্তু সময় নেই। তারা অনেক কিছু পেয়েছে, কিন্তু মনোযোগ পায়নি। অনেক সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু সঙ্গ পায়নি।
আজ আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে যোগাযোগের মাধ্যম সবচেয়ে বেশি, কিন্তু হৃদয়ের যোগাযোগ সবচেয়ে কম। আগে মানুষ চিঠির জন্য অপেক্ষা করত, তবুও সম্পর্ক বেঁচে থাকত। আজ মুহূর্তে বার্তা পৌঁছে যায়, ভিডিও কল হয়, শত শত ছবি আদান-প্রদান হয়, তবুও সম্পর্ক শুকিয়ে যাচ্ছে।
আগে পরিবার ভাঙত দূরত্বের কারণে। আজ পরিবার ভাঙছে নৈকট্যের ভিতরে। আগে বাবা বিদেশে থাকতেন, দূরে থাকলেও সম্পর্কটা ছিল কাছের। আজ বাবা পাশের রুমে আছেন, তবুও দূরত্ব অনেক। কাছে থেকেও দূরে।আগে মা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকতেন, তাই কথা কম হতো। আজ মা সন্তানের পাশেই বসে আছেন, কিন্তু দু’জনের হাতেই আলাদা স্ক্রিন। আগে বাবা দূরে থাকলেও সন্তানের প্রতি মনোযোগী ছিলেন সন্তান বাবার প্রতি মনোযোগী ছিল। আজ তারা আছেন পাশাপাশি কিন্তু একের অন্যের প্রতি মনোযোগ নেই।
একসময় মানুষ পরিবারে ফিরে শান্তি খুঁজত। আজ অনেক মানুষ পরিবারে থেকেও একাকীত্ব অনুভব করে। একসময় সন্তান মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে গল্প শুনত। আজ সন্তান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। একসময় বাবা ঘরে ফিরলে সন্তান দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরত। আজ অনেক সন্তান বাবার ফেরার খবরও জানে না; কারণ সে তখন ভার্চুয়াল জগতের মধ্যে ডুবে আছে।
এটা শুধু প্রযুক্তির সংকট নয়। এটা সম্পর্কের সংকট। এটা ভালোবাসা প্রকাশের সংকট। এটা মনোযোগ হারানোর সংকট। এটা হৃদয় হারানোর সংকট। আমাদের সন্তানরা খারাপ নয়। তারা শুধু এমন এক পৃথিবীর মধ্যে বড় হচ্ছে, যেখানে হাজারো কোম্পানি, হাজারো অ্যাপ, হাজারো অ্যালগরিদম দিনরাত চেষ্টা করছে তাদের মনোযোগ দখল করার জন্য।
আপনি আপনার সন্তানকে দিনে এক ঘণ্টা সময় দেন। কিন্তু তার মোবাইল তাকে দিনে ছয়-সাত ঘণ্টা সময় দেয়। আপনি মাঝে মাঝে তার কথা শোনেন। কিন্তু তার স্ক্রিন তাকে সবসময় বিনোদন দেয়। আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন।কিন্তু তার মোবাইল কখনো ক্লান্ত হয় না। তাই আজকের লড়াই শুধু সন্তানের বিরুদ্ধে নয়। আজকের লড়াই একটি সম্পূর্ণ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। একটি আসক্তির বিরুদ্ধে। একটি বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে।
আজকের লড়াই একটি এমন স্রোতের বিরুদ্ধে, যা ধীরে ধীরে আমাদের পরিবার, আমাদের সন্তান, আমাদের সম্পর্ক এবং আমাদের ঈমানকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আমরা নিরাশ নই। কারণ যে রব সন্তান দিয়েছেন, তিনি পথনির্দেশনাও দিয়েছেন।
যে আল্লাহ নূহ (আ.), ইবরাহীম (আ.), ইয়াকূব (আ.) ও লুকমান (আ.)-কে সন্তান গঠনের তাওফীক দিয়েছেন, সেই আল্লাহ আজও আমাদের সন্তানদের হেফাজত করতে সক্ষম। তবে এজন্য শুধু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়। শুধু টাকা-পয়সা যথেষ্ট নয়। শুধু স্কুল-মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেওয়াও যথেষ্ট নয়।
আমাদের জানতে হবে কিভাবে সন্তানের হৃদয়ে পৌঁছাতে হয়। কিভাবে প্রযুক্তির যুগে ঈমান রক্ষা করতে হয়। কিভাবে সন্তানকে যুগোপযোগীও বানাতে হয়, আবার দ্বীনের উপর অটলও রাখতে হয়। কিভাবে সাপও মারতে হয়, আবার লাঠিও অক্ষত রাখতে হয়।
আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু কর্মসংস্থানের সমস্যা নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু শিক্ষার সমস্যাও নয়। আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সম্পর্কের দারিদ্র্য। আজ ঘর আছে, পরিবার আছে, কিন্তু পারিবারিক বন্ধন নেই।একসঙ্গে বসবাস করছি, কিন্তু একে অপরের জীবনে উপস্থিত নেই।
একটু চিন্তা করে দেখুন আপনি কি জানেন আপনার সন্তান এই মুহূর্তে কী নিয়ে ভাবছে, সে কী নিয়ে দুশ্চিন্তা করে, তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু কে, সে কোন বিষয়ে কষ্ট পায়, সে কাদের অনুসরণ করে, সে অবসর সময়ে কী দেখে?
অনেক বাবা-মা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারবেন না। কারণ তারা সন্তানের জন্য অনেক কিছু করেছেন, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটাননি। আজ এমন অসংখ্য সন্তান আছে, যারা দিনের পর দিন বাবার সঙ্গে অর্থপূর্ণ পাঁচ মিনিটও কথা বলার সুযোগ পায় না।
বাবা সকালে বের হন, রাতে ফিরে আসেন। ফিরে এসে ক্লান্ত। সন্তান কিছু বলতে চায়। বাবা বলেন, পরে বলো, এখন খুব ক্লান্ত। মা সারাদিন সংসারের কাজে ব্যস্ত।সন্তান কিছু বলতে চায়। মা বলেন, এখন না, পরে কথা বলব। এই পরে অনেক সময় আর আসে না। দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। একসময় বাবা-মা বুঝতে পারেন, সন্তান আর কিছু বলতে চায় না। সে নিজের একটি আলাদা জগৎ তৈরি করে ফেলেছে। আমরা তখন অবাক হয়ে বলি, আমার সন্তান এত বদলে গেল কীভাবে? আসলে সে হঠাৎ বদলে যায়নি। সে ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছে, আর আমরা তা খেয়াল করিনি।
অনেক বাবা-মা আন্তরিকভাবে বলেন, আমি তো সন্তানের জন্য অনেক কষ্ট করি। কথাটি সত্য। অনেক বাবা নিজের আরাম ত্যাগ করেন। মা নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করেন। সন্তানের জন্য টাকা উপার্জন করেন। ভালো পোশাক দেন।ভালো শিক্ষা দেন। ভালো খাবার দেন। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরকেই করতে হবে আমি সন্তানের জন্য অর্থ ব্যয় করেছি, কিন্তু আমি কি তার জন্য সময় ব্যয় করেছি, কারণ সন্তানের হৃদয়ে পৌঁছানোর রাস্তা টাকা দিয়ে তৈরি হয় না। সেটি তৈরি হয় সময় দিয়ে। মনোযোগ দিয়ে। কথা শুনে। তার অনুভূতির মূল্য দিয়ে।
একজন শিশু অনেক সময় নতুন খেলনা ভুলে যায়, কিন্তু যে মানুষ তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে, তাকে সহজে ভুলে না। তাই সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দামি উপহার নয়; তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এমন একজন মানুষ, যে তার কথাগুলো ব্যথাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনবে।
এ কারণেই আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনে দেখি, তিনি শিশুদের হৃদয় জয় করেছিলেন। তিনি শুধু উপদেশ দেননি।তিনি তাদের কাছে গিয়েছেন।তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।তাদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ ভাগ করেছেন। হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে কাঁধে নিয়েছেন। নামাজের মধ্যে নাতি পিঠে উঠে গেলে সিজদা দীর্ঘ করেছেন।
তিনি উম্মতকে শিখিয়েছেন, শিশুদের হৃদয়ে পৌঁছাতে হলে আগে তাদের প্রতি ভালোবাসা ও মনোযোগ দিতে হবে।আজকের শিশুদের সবচেয়ে বড় অভাব খেলনা নয় সবচেয়ে বড় অভাব দামি স্কুল নয়। সবচেয়ে বড় অভাব পোশাক নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় অভাব হলো মনোযোগ।
অনেক সন্তান আজও বাবার সঙ্গে আধা ঘণ্টা গল্প করার জন্য অপেক্ষা করে। মায়ের সঙ্গে নির্ভয়ে কথা বলার সুযোগ চায়। কিন্তু আমরা অনেক সময় সেটি বুঝতে পারি না।তারপর একদিন আমরা দেখি, সে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, সন্তান কেন মোবাইলের দিকে চলে যায়?
এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেখানে আকৃষ্ট হয়, যেখানে সে আনন্দ পায়, গুরুত্ব পায় এবং নিজেকে গ্রহণযোগ্য মনে করে।
আজ মোবাইল সন্তানের কাছে এই তিনটি বিষয় খুব সহজে পৌঁছে দিচ্ছে। সে বিরক্ত হলে মোবাইল তাকে বিনোদন দেয়। সে একা অনুভব করলে মোবাইল তাকে ব্যস্ত রাখে।
সে দুঃখ পেলে মোবাইল তাকে অন্য জগতে নিয়ে যায়।
একটি ভিডিও শেষ হলে আরেকটি ভিডিও আসে। একটি গেম শেষ হলে আরেকটি গেম শুরু হয়। একটি উত্তেজনা শেষ হলে আরেকটি উত্তেজনা অপেক্ষা করে।
অন্যদিকে আমরা অনেক সময় সন্তানের সামনে কী নিয়ে উপস্থিত হই? এটা করো না। ওটা ধরো না। চুপ করে বসো। তোমার ফলাফল খারাপ কেন? তুমি এত মোবাইল ব্যবহার করো কেন? সে যখন আমাদের কাছে আসে, অনেক সময় ভালোবাসার চেয়ে সমালোচনা বেশি পায়। বোঝাপড়ার চেয়ে বকাঝকা বেশি পায়। উৎসাহের চেয়ে চাপ বেশি পায়।
ফলে ধীরে ধীরে সে এমন জায়গার দিকে ঝুঁকে যায়, যেখানে তাকে কেউ থামায় না, কেউ প্রশ্ন করে না, কেউ সমালোচনা করে না। এখানে একটি বিষয় খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। মোবাইল সব সময় মূল সমস্যা নয়।অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল একটি লক্ষণ মাত্র।
মূল অসুস্থতা অন্য জায়গায়। যেমন জ্বর নিজে রোগ নয়, রোগের লক্ষণ। তেমনি অনেক সময় মোবাইল-আসক্তি সম্পর্কের দুর্বলতার একটি লক্ষণ। যেখানে পরিবার সন্তানের হৃদয়ে জায়গা হারিয়ে ফেলে, সেখানে অন্য কিছু এসে সেই জায়গা দখল করে নেয়। তাই শুধু মোবাইল কেড়ে নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। সন্তানের হৃদয় ফিরে পেতে হবে। তার সঙ্গে বসতে হবে। তার কথা শুনতে হবে।তার বন্ধু হতে হবে। তার জীবনে উপস্থিত থাকতে হবে।
কারণ সন্তান শেষ পর্যন্ত মোবাইলের প্রেমে পড়ে না। সে আকৃষ্ট হয় সেখানে, যেখানে সে গুরুত্ব পায়।
যদি পরিবার তাকে সেই গুরুত্ব দেয়, সেই ভালোবাসা দেয়, সেই মনোযোগ দেয়, তাহলে পরিবারের আকর্ষণ কোনো স্ক্রিনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
এবং সন্তানকে বাঁচানোর প্রথম পদক্ষেপ শুধু মোবাইল বন্ধ করা নয়; বরং পরিবারের হৃদয়ের দরজা আবার খুলে দেওয়া। মনোযোগ ভালোবাসা দিয়ে আন্তরিকতা মায়া-মমতা দিয়ে সন্তানদের হৃদয়কে জয় করতে হবে। সন্তানদের দুনিয়া এবং আখেরাতের কল্যাণের স্বার্থে এই লড়াইয়ে প্রতিটি বাবা-মাকে জিততে হবে। অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে সন্তান কলিজার টুকরা সাথে বাবা মাও হবে ক্ষতিগ্রস্ত।