বাইতুল্লাহর সামনে এক ভিখারির আর্তনাদ

إلهي تيري چوکھٹ پر بھکاری بن کے آیا ہوں

বাইতুল্লাহর সামনে এক ভিখারির আর্তনাদ

**************************************

শেরগুলো লিখেছেন মুফতি মুহাম্মদ তকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহ। আর এটিকে লক্ষ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন জুনায়েদ জামশেদ (রহ.) তাঁর আবেগময় কণ্ঠে।

মুফতি তকী উসমানী এখানে একজন হাজী, একজন উমরাহকারী, একজন গুনাহগার বান্দা যখন হাজার মাইল অতিক্রম করে কাবার সামনে এসে দাঁড়ায় তার অনূভুতি তুলে ধরেছেন।

১

الہٰی! تیری چوکھٹ پر بھکاری بن کے آیا ہوں

سراپا فقر ہوں ، عجز و ندامت ساتھ لایا ہوں

হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে এক ভিখারির বেশে এসেছি। আমি সম্পূর্ণরূপে অভাবগ্রস্ত; সঙ্গে এনেছি বিনয়, অসহায়ত্ব ও অনুতাপ।

◾বাইতুল্লাহর মুসাফিরকে প্রথমেই শিক্ষা দিচ্ছেন—

কাবার সামনে কী নিয়ে দাঁড়াবে। অনেকে মনে করে কাবার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আমল স্মরণ করতে হবে। কেউ ভাবেন, কত কুরআন পড়েছি। কেউ ভাবেন, কত দান করেছি। কেউ ভাবেন, কত ইবাদত করেছি।

কিন্তু আল্লামা তকী উসমানী বলেন কাবার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আমল নয়, নিজের অভাব দেখো।

“الہٰی! تیری چوکھٹ پر بھکاری بن کے آیا ہوں”

হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে ভিখারি হয়ে এসেছি।

পৃথিবীতে মানুষ অনেক পরিচয় নিয়ে বাঁচে। কেউ আলেম। কেউ মুফতি। কেউ ধনী। কেউ নেতা। কেউ শিক্ষক। কেউ ব্যবসায়ী।‌ কিন্তু কাবার সামনে দাঁড়ালে সব পরিচয় ঝরে পড়ে। কাবার সামনে আবু বকর (রা.)-ও ভিখারি। উমর (রা.)-ও ভিখারি। উসমান (রা.)-ও ভিখারি। আলী (রা.)-ও ভিখারি। কারণ সেখানে সবাই চায়। আর আল্লাহই একমাত্র দাতা।

তাওয়াফের সময় যদি এই অনুভূতি জাগে হে আল্লাহ! আমি কিছু নিয়ে আসিনি। আমি শুধু চাইতে এসেছি।তখন তাওয়াফের রূহ জন্ম নিতে শুরু করে।

এরপর তিনি বলেন—

سراپا فقر ہوں ، عجز و ندامت ساتھ لایا ہوں

আমি সম্পূর্ণরূপে অভাবগ্রস্ত। সঙ্গে এনেছি অসহায়ত্ব ও অনুতাপ।

তিনি বলেননি সঙ্গে এনেছি ইবাদতের তালিকা। সঙ্গে এনেছি অর্জনের খাতা। সঙ্গে এনেছি নেক আমলের হিসাব। তিনি বলছেন আমি এনেছি عجز (অসহায়ত্ব)।আমি এনেছি ندامت (অনুশোচনা)।

হে কাবার মুসাফির! কল্পনা করো , তুমি প্রথমবার কাবাকে দেখছো। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাওয়াফ করছে।

তাদের মাঝে তুমিও একজন। এই মুহূর্তে যদি আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন হে বান্দা! তুমি আমার কাছে কী নিয়ে এসেছ। তখন আমলের কথা বলবে না।

তখন হৃদয় থেকে উত্তর দিবে হে আল্লাহ! আমি আমার ভাঙা হৃদয় নিয়ে এসেছি। আমি আমার গুনাহের লজ্জা নিয়ে এসেছি। আমি আমার অপচয় করা জীবনের অনুশোচনা নিয়ে এসেছি। আমি আমার অসহায়ত্ব নিয়ে এসেছি।

এই অনুভূতি না এলে মানুষ কাবা দেখতে পারে, কিন্তু কাবার মালিককে খুঁজে পায় না। তাওয়াফ করতে করতে নিজের জিবন নিয়ে ভাবো। কত বছর চলে গেছে! কত রমযান চলে গেছে! কত বিপদ থেকে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন! কত গুনাহ তিনি ঢেকে রেখেছেন!

দিল উজার করে বলো “হে আল্লাহ! আমি এক ভিখারি। আমার সবকিছুই আপনার দান। আমি তো কিছুই নই। আমি শুধু আপনার রহমতের দরজায় দাঁড়ানো এক অসহায় বান্দা।

এই শেরের আসল অনুভূতি কান্না নয়। এর আসল অনুভূতি হলো ফকিরি। নিজেকে শূন্য মনে করা।নিজেকে মুখাপেক্ষী মনে করা। নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভরশীল মনে করা।

আর যে হৃদয় এই ফকিরি শিখে ফেলে, তার জন্য কাবার প্রতিটি তাওয়াফ, প্রতিটি দোয়া, প্রতিটি দৃষ্টি এবং প্রতিটি অশ্রু নতুন অর্থ ধারণ করে।

২

بھکاری وہ کہ جس کے پاس جھولی ہے نہ پیالہ ہے

بھکاری وہ جسے حرص و ہوس نے مار ڈالا ہے

আমি এমন এক ভিখারি, যার কাছে ভিক্ষা চাওয়ার ঝুলিও নেই, ভিক্ষা গ্রহণের পাত্রও নেই।

আমি সেই অসহায় ভিখারি, যাকে দুনিয়ার লোভ, কামনা-বাসনা ও নফসের চাহিদা ধ্বংস করে দিয়েছে।

◾সাধারণ ভিখারির অন্তত একটি ঝুলি বা পাত্র থাকে, যার মাধ্যমে সে মানুষের কাছে সাহায্য চায়। কিন্তু কবি বলছেন, আমার অবস্থা তার চেয়েও করুণ। আমার কাছে এমন কোনো পুঁজি নেই, এমনকি ভালো আমল, ইখলাস বা নেকির সেই ঝুলিটুকুও নেই যা নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে পারি।

দ্বিতীয় পংক্তিতে তিনি নিজের পতনের কারণও স্বীকার করছেন। তাকে দারিদ্র্য ধ্বংস করেনি, মানুষ ধ্বংস করেনি; বরং حرص و ہوس—অর্থাৎ লোভ, দুনিয়ার মোহ, নফসের কামনা ও সীমাহীন চাওয়া-পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।

এখানে একজন বান্দার গভীর ইতিরাফ (স্বীকারোক্তি) প্রকাশ পেয়েছে। সে যেন বলছে‌ হে আল্লাহ! আমি শুধু গুনাহগার নই; আমার গুনাহের কারণও আমি জানি।

আমার হৃদয়কে দুনিয়ার লোভ গ্রাস করেছে, নফস আমাকে লুটে নিয়েছে। আজ আমি তোমার দরবারে এমন নিঃস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছি যে, আমার কাছে নিজের বলে কিছুই অবশিষ্ট নেই।”

এই শেরে তাই শুধু ফকিরি নয়, নফসের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণ ভাঙা হৃদয়ে আত্মসমর্পণ—উভয়ই একসাথে ফুটে উঠেছে।

৩

متاعِ دین و دانش نفس کے ہاتھوں سے لٹوا کر

سکونِ قلب کی پونجی ہوس کی بھینٹ چڑھوا کر

দ্বীনের সম্পদ আর জ্ঞানের পুঁজি আমি নিজের নফসের হাতে নষ্ট করে ফেলেছি। হৃদয়ের শান্তি ও প্রশান্তির সঞ্চয়ও লোভ-লালসার কারণে হারিয়ে ফেলেছি।

◾আগের শেরে কবি নিজেকে ভিখারি বলেছিলেন। এই শেরে তিনি বলছেন, কেন তিনি আজ এত নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

আল্লাহ মানুষকে অনেক বড় বড় নিয়ামত দেন। ঈমান দেন, দ্বীনের জ্ঞান দেন, নামাজের তাওফীক দেন, কুরআনের প্রতি ভালোবাসা দেন, দোয়ার স্বাদ দেন। এগুলোই মানুষের আসল সম্পদ। কিন্তু কবি আফসোস করে বলছেন আমি এই সম্পদগুলো রক্ষা করতে পারিনি। কেউ এসে তার সম্পদ ছিনিয়ে নেয়নি। তিনি নিজেই নিজের নফসের কথায় চলতে গিয়ে তা হারিয়েছেন।

নফস তাকে বলেছে একটু দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হও।‌‌একটু নাম-যশের পিছনে ছুটো। একটু গুনাহ করো, পরে তওবা করবে।‌ এভাবে ধীরে ধীরে তার দ্বীনের শক্তি কমে গেছে, ইবাদতের মজা চলে গেছে, হৃদয়ের নূর নিভে গেছে।

দ্বিতীয় লাইনে তিনি আরও বড় ক্ষতির কথা বলছেন।

এক সময় হয়তো তার অন্তরে প্রশান্তি ছিল। নামাজে চোখে পানি আসত। কুরআন পড়ে মন নরম হয়ে যেত। আল্লাহর কথা মনে হলে হৃদয় শান্ত হয়ে যেত।

কিন্তু দুনিয়ার লোভ, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা, অর্থের চিন্তা, মর্যাদার মোহ—এসবের পেছনে ছুটতে ছুটতে সেই শান্তিটুকুও হারিয়ে গেছে। আজ তার অবস্থা এমন যে সবকিছু আছে, কিন্তু শান্তি নেই।‌মানুষ সম্মান করে, কিন্তু অন্তর খালি। জ্ঞান আছে, কিন্তু সেই জ্ঞানের স্বাদ নেই। তাই তিনি আল্লাহর কাছে যেন কাঁদতে কাঁদতে বলছেন হে আল্লাহ! তুমি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছিলে। কিন্তু আমি সেগুলো ঠিকমতো রক্ষা করতে পারিনি। নিজের নফসের কারণে সব হারিয়ে ফেলেছি। এখন তোমার দরবারে এসেছি, তুমি ছাড়া আমার আর কোনো আশ্রয় নেই।”

এই শের আমাদেরও মনে করিয়ে দেয় মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা-পয়সা নয়; ঈমান, দ্বীনের জ্ঞান এবং হৃদয়ের শান্তি। আর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এই সম্পদগুলো হারিয়ে ফেলা।

৪

لٹاکر ساری پونجی غفلت و عصیاں کی دلدل میں

سہارا لینے آیا ہوں ترے کعبے کے آنچل میں

গাফেলতি ও গুনাহের কাদামাটিতে আমার সব পুঁজি হারিয়ে ফেলেছি। এখন তোমার কাবাঘরের ছায়ায় আশ্রয় নিতে এসেছি।

◾এখানে একজন ক্লান্ত বান্দার হৃদয়ের কান্না ফুটে উঠেছে। সে যেন বলছে হে আল্লাহ! তুমি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছিলে। ঈমান দিয়েছিলে, ইবাদতের তাওফীক দিয়েছিলে, চোখের পানি দিয়েছিলে, হৃদয়ের নূর দিয়েছিলে। কিন্তু আমি সেগুলো রক্ষা করতে পারিনি।”

“غفلت” অর্থ আল্লাহকে ভুলে থাকা।

“عصیاں” অর্থ গুনাহ ও অবাধ্যতা।

কবি গুনাহকে শুধু একটি ভুল কাজ বলেননি; তিনি একে জলাভূমির সঙ্গে তুলনা করেছেন।‌ জলাভূমিতে কেউ একবার পা দিলে ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকে। ঠিক তেমনি মানুষও যখন গাফেলতিতে ডুবে যায়, তখন এক গুনাহ তাকে আরেক গুনাহের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

এক সময় সে বুঝতে পারে আমার হৃদয়ের কোমলতা কোথায় হারিয়ে গেল? নামাজের সেই স্বাদ কোথায় গেল? কুরআন পড়ে যে কান্না আসত, তা কোথায় হারিয়ে গেল?

তখন তার মনে হয়, আমি তো সব হারিয়ে ফেলেছি।কিন্তু এই শেরের সবচেয়ে সুন্দর কথা হলো—সব হারানোর পরও সে হতাশ হয়নি। সে বলছে—

“سہارا لینے آیا ہوں ترے کعبے کے آنچل میں”

“আমি তোমার কাবার আঁচলে আশ্রয় নিতে এসেছি।”

এ যেন পথহারা সন্তান দীর্ঘদিন পর মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। সে আর নিজের আমলের ভরসা করছে না। নিজের নেকির হিসাবও দেখাচ্ছে না। সে শুধু বলছে—

হে আমার রব! আমি ব্যর্থ হয়েছি। আমি ভুল করেছি।আমি সব হারিয়েছি। তাই তোমার ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। তোমার দরজা ছাড়া আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই।”

যখন একজন হাজি প্রথম কাবাকে দেখে, তখন এই শেরটি তার হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে। সে কাবার দিকে তাকিয়ে অনুভব করে “ইয়া আল্লাহ! আমি পাপ নিয়ে এসেছি, তুমি ক্ষমা দাও। আমি শূন্য হাতে এসেছি, তুমি ভরে দাও। আমি ভাঙা হৃদয় নিয়ে এসেছি, তুমি জোড়া লাগিয়ে দাও। আমি আশ্রয়হীন হয়ে এসেছি, তোমার ঘরের ছায়ায় আমাকে আশ্রয় দাও।”

এই শেরের মূল কথা হলো যে বান্দা নিজের ভুল স্বীকার করে, নিজের নিঃস্বতা উপলব্ধি করে এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ঘরের দিকে ফিরে আসে, তার জন্য রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।

৫

گناہوں کی لپٹ سے کائناتِ قلب افسردہ

ارادے مضمحل ، ہمت شکستہ ، حوصلے مردہ

গুনাহের আগুনে আমার হৃদয়ের জগৎ মলিন ও বিষণ্ণ হয়ে গেছে। আমার সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়েছে, সাহস ভেঙে গেছে, মনোবল প্রায় মরে গেছে।

◾এখানে কবি গুনাহের কারণে নিজের অন্তরের অবস্থা বর্ণনা করছেন। গুনাহ মানুষকে শুধু আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; দুনিয়াতেও তার প্রভাব হৃদয়ের ওপর পড়ে।

এক সময় মানুষ নামাজ পড়ে আনন্দ পায়, কুরআন পড়ে চোখে পানি আসে, দোয়া করলে হৃদয় নরম হয়ে যায়। কিন্তু যখন গুনাহ বাড়তে থাকে, তখন হৃদয়ের সেই সৌন্দর্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

তাই কবি বলছেন “আমার হৃদয়টা যেন শুকিয়ে গেছে।

ভেতরের সেই আলো আর নেই। সেই আনন্দ, সেই প্রশান্তি, সেই উচ্ছ্বাস কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।”

এরপর তিনি বলেন—

“ارادے مضمحل” — আমার ভালো হওয়ার ইচ্ছাশক্তি দুর্বল হয়ে গেছে।

অনেক সময় মানুষ ভাবে আজ থেকে নিয়মিত নামাজ পড়ব। আজ থেকে গুনাহ ছেড়ে দেব। আজ থেকে আল্লাহর পথে চলব। কিন্তু কিছুদিন পর আবার পিছিয়ে যায়। কারণ গুনাহ মানুষের ইচ্ছাশক্তিকেও দুর্বল করে দেয়।

“ہمت شکستہ” — সাহস ভেঙে গেছে।

সে নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবে আমার দ্বারা আর হবে না। আমি তো অনেক দূরে চলে গেছি।

“حوصلے مردہ” — মনোবল যেন মরে গেছে।

সে আর সামনে এগোনোর শক্তি খুঁজে পায় না।

এই শেরে একজন গুনাহগার বান্দার গভীর ক্লান্তি ফুটে উঠেছে। সে যেন আল্লাহকে বলছে‌ হে আল্লাহ! গুনাহ শুধু আমার আমল নষ্ট করেনি।‌ আমার হৃদয়কেও দুর্বল করে দিয়েছে। ভালো হওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। তাই আমি নিজের ভরসায় নয়, তোমার রহমতের ভরসায় তোমার দরবারে এসেছি।

এই শের পড়ে মনে হয়, কবি কাবার সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলছেন ইয়া আল্লাহ! আমি আর শক্তিশালী সেই মানুষটি নই। আমি ভেঙে পড়েছি।আমার হৃদয় ক্লান্ত। তুমি ছাড়া আমাকে আবার জীবিত করার কেউ নেই।”

এটাই এই শেরের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি—বান্দা নিজের ভাঙাচোরা অবস্থার কথা স্বীকার করে, আর আল্লাহর রহমতের দিকে হাত বাড়ায়।

৬

کہاں سے لاؤں طاقت دل کی سچی ترجمانی کی

کہ کس جنجال میں گزری ہیں گھڑیاں زندگانی کی

আমার হৃদয়ের আসল কথা প্রকাশ করার শক্তি কোথায় পাব? জীবনের দিনগুলো কত ঝামেলা, ভুল আর বিপথগামিতার মধ্যে কেটেছে, তা-ই বা কীভাবে বলব?

◾এখানে কবি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছেন। তিনি যেন বলছেন হে আল্লাহ! আমার বুকের ভেতরে কত কথা জমে আছে। কত আফসোস, কত লজ্জা, কত অনুতাপ। কিন্তু সেগুলো ভাষায় প্রকাশ করার শক্তিও আমার নেই।‌

মানুষের জীবনে এমন সময় আসে, যখন কাঁদতে চায় কিন্তু কান্না আসে না; বলতে চায় কিন্তু কথা বের হয় না। কাবার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক হাজির এমন অনুভূতি হয়। বছরের পর বছর জমে থাকা গুনাহ, ভুল, অবহেলা, ব্যর্থতা—সব একসাথে মনে পড়ে যায়। তখন হৃদয় ভারী হয়ে যায়।

কবি বলছেন‌ আমার জীবন কীভাবে কেটেছে, তা আমি নিজেই বলতে পারছি না।‌কত সময় দুনিয়ার পেছনে ছুটে কেটে গেছে।‌ কত সময় গাফেলতিতে নষ্ট হয়েছে।‌ কত ভালো কাজ করার সুযোগ হারিয়ে গেছে।

কত প্রতিশ্রুতি ভেঙেছি, কত তওবা ভেঙেছি।

এই সব স্মৃতি একসাথে মনে এলে মানুষের ভাষা হারিয়ে যায়।‌ তাই তিনি যেন আল্লাহকে বলছেন হে আমার রব! তুমি তো সব জানো। আমি না বললেও তুমি জানো আমার হৃদয়ের অবস্থা। আমি আমার কাহিনি বলতে পারি না, কিন্তু তুমি আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত দেখেছ।”

এই শেরের সৌন্দর্য এখানেই‌ বান্দা নিজের আমল নিয়ে গর্ব করছে না, নিজের কষ্টের গল্পও শোনাচ্ছে না। বরং সে স্বীকার করছে‌ আমার দুঃখ এত বেশি, আমার ভুল এত বেশি, আমার অন্তরের কথা এত গভীর যে, তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতাও আমার নেই।

কাবার সামনে দাঁড়িয়ে একজন প্রেমিক বান্দার অনুভূতি যেন এমন হয়‌ ইয়া আল্লাহ! আমি কী বলব?

কোথা থেকে শুরু করব?

আমার চোখের পানি, আমার নীরবতা, আমার দীর্ঘশ্বাস—এসবই আজ আমার পক্ষ থেকে কথা বলুক।

কারণ তুমি তো আমার না-বলা কথাও জানো। এই শেরে তাই অনুতাপের গভীরতা, হৃদয়ের ভাঙন এবং আল্লাহর সর্বজ্ঞতার প্রতি পূর্ণ ভরসা একসাথে ফুটে উঠেছে।

৭

تری چوکھٹ کے جو آداب ہیں میں ان سے خالی ہوں

نہیں جس کو سلیقہ مانگنے کا وہ سوالی ہوں

তোমার দরবারে উপস্থিত হওয়ার যে আদব ও শিষ্টাচার, তারও আমি যোগ্য নই। আমি এমন এক ভিখারি, যে ঠিকমতো চাইতেও জানে না।

◾এখানে বান্দার বিনয় আরও গভীর হয়েছে। সে যেন বলছে হে আল্লাহ! আমি শুধু আমলহীন নই, তোমার কাছে কীভাবে চাইতে হয়, তাও ভালো করে জানি না।

দুনিয়ার কোনো দরবারে গেলে মানুষ আগে তার আদব শেখে। কিন্তু আল্লাহর দরবারের আদব হলো—ভাঙা হৃদয়, বিনয়, চোখের পানি এবং নিজের অসহায়ত্বের স্বীকৃতি।

কবি মনে করছেন, তার ভেতরে এই যোগ্যতাও নেই।

তিনি বলছেন আমি এমন এক দরিদ্র, যে ভিক্ষা চাইতেও জানে না। কী চাইব, কীভাবে চাইব, কোন ভাষায় চাইব—তাও জানি না।

এ যেন একটি ছোট শিশু, যে নিজের প্রয়োজন ভাষায় বলতে পারে না; শুধু মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদে। মা তার না-বলা কথাও বুঝে নেয়। কবি তাই আল্লাহকে ইঙ্গিত করে বলছেন আমি চাইতে জানি না, কিন্তু তুমি তো আমার হৃদয়ের কথা জানো।”

৮

یہ تیرا گھر ہے ، تیرے مہر کا دربار ہے مولیٰ!

سراپا نور ہے اک مہبطِ انوار ہے مولیٰ!

হে আমার প্রভু! এটি তোমার ঘর, তোমার দয়া ও অনুগ্রহের দরবার। এটি নূরে পরিপূর্ণ, অসংখ্য রহমত ও আলোর অবতরণস্থল।

◾এতক্ষণ কবি নিজের দুরবস্থার কথা বলছিলেন। এখন তিনি নিজের দিকে না তাকিয়ে কাবার দিকে তাকাচ্ছেন। তিনি যেন বলছেন‌ আমি গুনাহগার হতে পারি, আমি আমলহীন হতে পারি, কিন্তু যে দরজায় এসেছি, সেটি তো রহমতের দরজা।

কাবা শুধু পাথরের একটি ঘর নয়। এটি সেই ঘর, যার দিকে মুখ করে কোটি কোটি মানুষ নামাজ পড়ে। এটি সেই ঘর, যার সঙ্গে অসংখ্য নবী, অলি ও নেককার মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

তাই কবির মনে আশা জাগছে।‌ আমার অবস্থা অন্ধকার হতে পারে, কিন্তু যে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সেটি তো নূরের ঘর। এখানে গুনাহগার বান্দার হৃদয়ে প্রথম আশার আলো ফুটে ওঠে।

৯

یہ آنکھیں خشک ہیں یارب! انھیں رونا نہیں آتا

سلگتے داغ ہیں دل میں جنھیں دھونا نہیں آتا

হে আল্লাহ! আমার চোখ শুকিয়ে গেছে, কাঁদতে জানে না। হৃদয়ে জ্বলন্ত ক্ষত রয়েছে, কিন্তু সেগুলো কীভাবে ধুয়ে ফেলতে হয়, তা জানি না।

◾এটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী একটি শের।

কবি নিজের সবচেয়ে বড় অভাবের কথা বলছেন।

তিনি বলছেন হে আল্লাহ! আমার হৃদয়ে কষ্ট আছে, অনুতাপ আছে, কিন্তু চোখে অশ্রু নেই।

অনেক সময় মানুষ গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়, কিন্তু কাঁদতে পারে না। সে চায় চোখে পানি আসুক, কিন্তু হৃদয় যেন শুকিয়ে গেছে। এই অবস্থাই কবি বর্ণনা করছেন।

“سلگتے داغ” অর্থ হৃদয়ের জ্বলন্ত ক্ষত।

গুনাহের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া সময়ের আফসোস, ভেঙে যাওয়া তওবার বেদনা সবকিছু তার হৃদয়কে জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

সে বলছে‌ ক্ষত আছে, ব্যথা আছে, কিন্তু সেই ক্ষত ধোয়ার মতো অশ্রু নেই। কাবার সামনে দাঁড়িয়ে এমন অনুভূতি সত্যিই অনেক মানুষের হয়।

১০

زباں غرقِ ندامت دل کی ناقص ترجمانی پر

خدایا رحم میری اس زبانِ بے زبانی پر

আমার জিহ্বা লজ্জা ও অনুতাপে ডুবে আছে, কারণ সে হৃদয়ের কথা ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারে না।

হে আল্লাহ! আমার এই অসহায়, বাকরুদ্ধ জিহ্বার ওপর দয়া কর।

◾এখানে বান্দা অনুভব করছে যে, তার হৃদয়ের ভেতরে যা আছে, ভাষা তার সামান্য অংশও প্রকাশ করতে পারছে না। সে যেন বলছে হে আল্লাহ! আমার হৃদয়ে যে আগুন জ্বলছে, যে অনুতাপ জমে আছে, যে ভালোবাসা লুকিয়ে আছে— তা ভাষায় বলা সম্ভব নয়।”

অনেক সময় মানুষ গভীর আবেগে কাঁদে, কিন্তু কথা বলতে পারে না। কারণ অনুভূতি ভাষার চেয়ে বড় হয়ে যায়। কবি সেই অবস্থার কথা বলছেন। তিনি নিজের জিহ্বার অক্ষমতার জন্যও লজ্জিত।

কিন্তু শেষে আশ্রয় নিচ্ছেন আল্লাহর রহমতে‌‌ হে আল্লাহ! আমি ঠিকমতো বলতে পারি না, ঠিকমতো কাঁদতেও পারি না, ঠিকমতো চাইতেও পারি না।

কিন্তু তুমি তো আমার হৃদয়ের ভাষা বোঝো। আমার না-বলা কথাগুলোও জানো। তাই আমার এই অসহায় প্রার্থনার ওপর দয়া কর।

আপনার আলোচনা প্রায় পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। এখন এর শেষে এমন একটি ফিনিশিং আলোচনা দরকার, যা সব শেরকে এক সুতোয় গেঁথে দেয় এবং শ্রোতাকে কাবার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। শুধু ব্যাখ্যা নয়, বরং এই কালামের সামগ্রিক দাওয়াতটি তুলে ধরে।

◾মুফতি তকী উসমানী এই শেলগুলো দ্বারা আমাদের কোনো দোয়া শেখাচ্ছেন না, কোনো ফিকহি মাসআলা শেখাচ্ছেন না, এমনকি কাবার ইতিহাসও বলছেন না।

তিনি আমাদের একটি হৃদয় শেখাচ্ছেন। একটি অনুভূতি শেখাচ্ছেন।

তিনি যেন আমাদের হাত ধরে বাইতুল্লাহর সামনে নিয়ে গিয়ে বলছেন দেখো, এভাবে দাঁড়াতে হয়।‌ এই কথা শুরু ভিখারিত্ব দিয়ে। শেষও ভিখারিত্ব দিয়ে।

প্রথম শেরে বান্দা বলেছিল—

“আমি ভিখারি হয়ে এসেছি।” আর শেষ শেরে এসে সে বলছে আমি আমার হৃদয়ের কথাও বলতে পারছি না।

এটাই আল্লাহর পরিচয় লাভের একটি নিদর্শন।

মানুষ যত আল্লাহকে চিনতে থাকে, নিজের অপূর্ণতা তত বেশি বুঝতে থাকে। তাওয়াফের সময় তুমি কাবার চারপাশে ঘুরছ। আর তুমি বুঝতে শিখছ‌ আমি কিছুই নই।‌ আমি সবসময় তাঁর মুখাপেক্ষী।

প্রতিটি শের যেন তাওয়াফের একটি চক্কর। প্রথম চক্করে মানুষ নিজের অভাব দেখে। দ্বিতীয় চক্করে নিজের নফসের অত্যাচার দেখে। তৃতীয় চক্করে নিজের হারিয়ে ফেলা সম্পদ দেখে। চতুর্থ চক্করে নিজের গুনাহের জলাভূমি দেখে। পঞ্চম চক্করে নিজের ভাঙা হৃদয় দেখে। ষষ্ঠ চক্করে নিজের ভাষার অক্ষমতা দেখে।

আর সপ্তম চক্করে এসে শুধু আল্লাহর রহমত দেখে।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে বাঁচায় তার আমল নয আল্লাহর রহমত। তাই এই শেলগুলোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো বাইতুল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নেকির খাতা খুলবে না। নিজের পরিচয়ের ব্যাজ দেখাবে না।নিজের অর্জনের গল্প বলবে না। বরং নিজের হৃদয় খুলে দাও। নিজের অনুতাপ খুলে দাও।

মুলতাযামের সামনে দাঁড়িয়ে যদি কিছু বলতেই হয়, তবে বলো হে আল্লাহ! আমি অনেক দেরি করে এসেছি। কিন্তু চলে যাইনি। আমি অনেক ভুল করেছি। কিন্তু তোমাকে ছেড়ে দিইনি। আমি অনেকবার পড়ে গেছি। কিন্তু আজ তোমার দরজায় ফিরে এসেছি।

হাজরে আসওয়াদের দিকে তাকিয়ে বলো—

হে আল্লাহ! এই পাথর জান্নাত থেকে এসেছে।‌আর আমি পৃথিবীর ধুলো-মাটি মেখে এসেছি। তবুও তুমি আমাকে তোমার ঘরে ডেকেছ। এটাই আমার সবচেয়ে বড় আশা।

কাবার গিলাফের দিকে তাকিয়ে বলো—

হে আল্লাহ! আমি জানি না আমার তাওয়াফ কবুল হবে কি না। আমি জানি না আমার দোয়া কতটুকু গ্রহণযোগ্য।‌আমি জানি না আমার চোখের পানি কতটুকু সত্য।

কিন্তু আমি জানি তুমি রহমান। তুমি রহীম। তুমি তাওয়াব।‌তুমি গফ্ফার।‌ এবং যখন তাওয়াফ শেষ হবে, তখন এই শেলগুলোর সারমর্ম যেন হৃদয়ে গেঁথে যায়— আমি কাবার কাছে আসিনি। আমি কাবার মালিকের কাছে এসেছি। আমি শুধুতাওয়াফ করতে আসিনি। আমি ফিরে আসতে এসেছি।

আমি শুধু দোয়া করতে আসিনি। আমি নিজেকে সোপর্দ করতে এসেছি। আমি শুধু ক্ষমা চাইতে আসিনি। আমি তাঁর ভালোবাসা চাইতে এসেছি।

আর যদি এই অনুভূতি হৃদয়ে জন্ম নেয়, তবে তাওয়াফ আর সাতটি চক্কর থাকে না। তা হয়ে যায় এক ভিখারির তার রবের কাছে ফিরে আসার গল্প।

এক পথহারা বান্দার তার প্রকৃত আশ্রয়ে ফিরে আসার গল্প।‌ এক প্রেমিকের তার প্রিয়তমের দরজায় দাঁড়ানোর গল্প। আর তখন হৃদয়ের গভীর থেকে শুধু একটি কথাই বের হয়—

الہٰی! تیری چوکھٹ پر بھکاری بن کے آیا ہوں

হে আল্লাহ!

আমি তোমার দরজায় ভিখারি হয়ে এসেছি।‌আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিও না।

Scroll to Top