আরাফাহ: পরিচয়ের ময়দান, ক্ষমার ময়দান

মক্কার পূর্বদিকে অবস্থিত বিস্তীর্ণ প্রান্তরের নাম আরাফাহ। হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন এখানেই আদায় করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেছেন:

“الحج عرفة”

হজ হলো আরাফাহ।অর্থাৎ আরাফায় অবস্থান ছাড়া হজই সম্পন্ন হয় না। একজন মানুষ যদি সব কাজ সম্পন্ন করে কিন্তু আরাফায় নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে না পারে, তবে তার হজ আদায় হবে না।

আরাফাহ নামকরণের কারণ

*************************

আরাফাহ” শব্দটি আরবি “عرف” (আরাফা) ধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ—চেনা, জানা, পরিচয় লাভ করা।ইসলামী ঐতিহ্যে এ নামকরণ সম্পর্কে কয়েকটি প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়

১. আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলন

জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণের পর দীর্ঘ বিচ্ছেদের শেষে হযরত আদম (আ.) ও হযরত হাওয়া (আ.) এখানে পরস্পরকে চিনতে ও খুঁজে পান। তাই এর নাম হয় “আরাফাহ”—পরিচয়ের স্থান।

২. ইবরাহিম (আ.)-এর শিক্ষা সম্পন্ন হওয়া। জিবরাইল (আ.) হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে হজের বিভিন্ন আমল শিক্ষা দিচ্ছিলেন। আরাফাহ প্রান্তরে এসে তিনি জিজ্ঞেস করলেন:

“أَعَرَفْتَ؟”

তুমি কি বুঝেছ? তিনি উত্তর দিলেন:

“عَرَفْتُ”

“হ্যাঁ, আমি বুঝেছি।”

এ থেকেই “আরাফাহ” নামটি প্রসিদ্ধ হয়েছে বলে অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন।

৩. আত্মপরিচয়ের ময়দান

অনেক আলেম বলেন, মানুষ এখানে এসে নিজেকে চিনে। সে বুঝতে পারে নিজের পরিচয়, সে কোথা থেকে এসেছে। কোথায় যাবে তার জীবনের উদ্দেশ্য কী। এ যেন আত্ম-আবিষ্কারের এক মহাসম্মেলন।

◾ আরাফাহ ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ময়দানগুলোর একটি। পৃথিবীতে অনেক বিখ্যাত ময়দান আছে। কিন্তু আরাফাহ এমন একটি ময়দান যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ একসাথে দাঁড়িয়ে শুধু একটি কাজ করে ক্ষমা ভিক্ষা। এখানে রাজা ও ভিখারি একই পোশাকে। এখানে ধনী ও গরিবের কোন পার্থক্য নেই।এখানে জাতি, ভাষা, বর্ণ, দেশের অহংকার গলে যায়।

মানুষ শুধু বান্দা হয়ে দাঁড়ায়। আর আল্লাহ শুধু রব হয়ে থাকেন।

◾আরাফাহ: কিয়ামতের মহড়া

****************************

আরাফাহয় দাঁড়ালে প্রথম যে অনুভূতি জাগে এটাই যেন হাশরের ময়দানের ট্রেইলার। সাদা ইহরামে লক্ষ লক্ষ মানুষ। কারও মাথায় মুকুট নেই। কেউ মন্ত্রী নয়।কেউ ব্যবসায়ী নয়। কেউ নেতা নয়। সব পরিচয় হারিয়ে গেছে।

শুধু একটি পরিচয় বেঁচে আছে আমি আল্লাহর বান্দা।সেদিন হাশরের মাঠেও এমনই হবে। কবর থেকে মানুষ উঠবে। কেউ সম্পদ নিয়ে আসবে না। কেউ ক্ষমতা নিয়ে আসবে না। শুধু আমল নিয়ে দাঁড়াবে। তখন আরাফাহর এই দিনের কথা মনে পড়বে।

◾জাবালে রহমাহর দিকে তাকিয়ে

*****************************

আরাফার বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট পাহাড়জাবালে রহমাহ (রহমতের পাহাড়)।পাহাড়টি খুব উঁচু নয়, খুব বিশালও নয়। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অল্প কিছু স্থান আছে, যেগুলোর পাশে দাঁড়ালে মানুষ নিজের অস্তিত্বকেই নতুন করে চিনতে শেখে। জাবালে রহমাহ তেমনই একটি স্থান।

এখানে দাঁড়িয়ে প্রথম যে অনুভূতি জাগে আমি কত ক্ষুদ্র! আর আল্লাহর রহমত কত বিশাল! এই পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ভাবুন চৌদ্দশত বছর আগে এই আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা মুহাম্মাদ ﷺ। লক্ষাধিক সাহাবী তাঁকে ঘিরে ছিলেন। তিনি বিদায় হজের ভাষণ দিচ্ছিলেন।

হয়তো তখনও কেউ জানত না এটাই মানবজাতির উদ্দেশে তাঁর শেষ মহান ঘোষণা। আজ আমরা সেই স্থানেই দাঁড়িয়ে আছি। তিনি চলে গেছেন। সাহাবারা চলে গেছেন। রাজা-বাদশাহরা চলে গেছে। বিজেতারা চলে গেছে। কিন্তু এই পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে।

নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে‌ পৃথিবীতে কেউ স্থায়ী নয়। জাবালে রহমাহ যেন একটি প্রশ্ন করে তুমি কেন এসেছ?”

হজ করতে নাকি আল্লাহকে খুঁজতে? কাবা দেখতে নাকি নিজের হারিয়ে যাওয়া হৃদয়কে ফিরে পেতে?

অনেকেই মক্কায় আসে। কিন্তু সবাই আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে পারে না। জাবালে রহমাহ যেন মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে বাধ্য করে।

◾এই পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনকে দেখুন কত বছর বেঁচে আছি? কত বছর বাকি আছে? কত স্বপ্ন পূরণ হয়েছে? কত স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে?

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আল্লাহ কি আমার প্রতি সন্তুষ্ট?

কারণ কবরের অন্ধকারে ডিগ্রি যাবে না। পদমর্যাদা যাবে না। সম্মান যাবে না। সঙ্গে যাবে শুধু একটি জিনিস আল্লাহর সন্তুষ্টি অথবা অসন্তুষ্টি। জাবালে রহমাহ যেন কিয়ামতের কথা মনে করিয়ে দেয়

আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ সাদা কাপড়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আগামীকাল সবাই কাফনে জড়ানো হবে। আজ আরাফার ময়দান। আগামীকাল হাশরের ময়দান। আজ হাত তুলে দোয়া করা যাচ্ছে। আগামীকাল হিসাব দেওয়া হবে। আজ কান্না করলে লাভ হবে।

আগামীকাল কান্না করে লাভ হবে না।

পাহাড়টি যেন বলছে হে মানুষ! তুমি দুনিয়ার জন্য অনেক কেঁদেছ। সম্পদের জন্য কেঁদেছ। মানুষের জন্য কেঁদেছ। অপমানের জন্য কেঁদেছ। একবার আল্লাহর জন্য কেঁদে দেখো। একবার নিজের গুনাহের জন্য কেঁদে দেখো। জাবালে রহমাহর পাশে একটি নিঃশব্দ প্রার্থনা হে আল্লাহ! এই পাহাড় কত মানুষকে দেখেছে।কত নবীপ্রেমিককে দেখেছে। কত কান্না দেখেছে। কত তওবা দেখেছে। আজ সেই তালিকায় আমার নামটাও লিখে দিন। আমি খালি হাতে এসেছি। আমার কাছে আমল নেই। আমার কাছে দাবি নেই। আমার কাছে শুধু অপরাধের বোঝা আছে।

আপনার রহমতের পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে

আপনার রহমতই চাই। যেদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব, সেদিন যেন এই আরাফার বিকেলের কান্না

আমার মুক্তির সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়।

জাবালে রহমাহর দিকে তাকালে শেষ পর্যন্ত একটি কথাই হৃদয়ে গভীরভাবে নেমে আসে পাহাড়টি রহমতের নয়; রহমতের মালিক আল্লাহ। পাহাড়টি শুধু সেই রহমতের দিকে ইশারা করে। আরাফার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মানুষ যত বড় গুনাহগারই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও অনেক বড়।

◾আরাফাহয় একজন হাজীর অনুভূতি

********************************

যখন একজন হাজী আরাফার ময়দানে দাঁড়ায়, তখন তার হৃদয়ে এমন কিছু অনুভূতি জাগতে পারে—

১. আমি কি ক্ষমা পাব?.হাজারো গুনাহ নিয়ে এসেছি।

জীবনের কত অবহেলা। কত নামাজ নষ্ট হয়েছে।

কত ভুল হয়েছে। আজ যদি আল্লাহ ক্ষমা না করেন তবে আর কোথায় যাব?

২. এটাই কি আমার শেষ আরাফাহ?

অনেকেই তো গত বছর এখানে দাঁড়িয়েছিল। আজ তারা কবরে। হয়তো এটাই আমার জীবনের শেষ হজ।শেষ আরাফাহ। শেষ সুযোগ।

৩. আল্লাহ আমাকে ডেকেছেন আমি টিকিট কিনে আসিনি। আমি ভিসা পেয়ে আসিনি। আল্লাহ না ডাকলে কেউ এখানে আসতে পারে না। কোটি কোটি মুসলমানের মধ্য থেকে আমাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।এ কেমন সৌভাগ্য!

৪. হাশরের আগে একটি সুযোগ কিয়ামতের দিনও তো দাঁড়াতে হবে। কিন্তু সেদিন আর তওবা হবে না। আজ আরাফাহয় দাঁড়িয়ে তওবা করা যাচ্ছে। কান্না করা যাচ্ছে।‌ ক্ষমা চাওয়া যাচ্ছে। সেদিন তা হবে না।

◾আরাফাহ আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

******************************

১. পরিচয় আল্লাহর সাথে

আরাফাহ শেখায়‌ মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার জাতি নয়। তার বংশ নয়। তার পেশা নয়। তার পরিচয় সে আল্লাহর বান্দা।

২. জীবন ক্ষণস্থায়ী

প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ আসে। আবার চলে যায়।দুনিয়াও এমনই। আজ আছি। কাল থাকব না।

৩. তওবার দরজা খোলা

যত বড় গুনাহই হোক আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বড়। আরাফাহ সেই আশার নাম।‌ আরাফাহ থেকে বিদায়ের সময় সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। ধীরে ধীরে মুযদালিফার দিকে যাত্রা শুরু হবে। পেছনে পড়ে থাকবে আরাফার ময়দান। তখন একজন হাজীর হৃদয়ে হয়তো এই কথাগুলো ঘুরপাক খাবে হে আল্লাহ!

আমি আজ তোমার দরবারে দাঁড়িয়েছিলাম। জানি না তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ কি না। কিন্তু আমি আমার হৃদয় এখানে রেখে যাচ্ছি। যদি আবার আসার তাওফিক না দাও তবে আজকের এই আরাফাহকে আমার মুক্তির দিন বানিয়ে দিও। আর সেই মুহূর্তে আরাফাহ আর একটি ভৌগোলিক স্থান থাকে না।

এটি হয়ে যায়—

আত্মপরিচয়ের ময়দান, তওবার ময়দান, রহমতের ময়দান এবং হাশরের পূর্বাভাস।

◾আরাফায় উপস্থিত হওয়ার অনুভূতি

********************************

আরাফাহ এমন একটি ময়দান, যেখানে মানুষ পৃথিবীর সব পরিচয় ভুলে শুধু আল্লাহর বান্দা হয়ে দাঁড়ায়। হজের অন্য আমলগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আরাফাহ হলো হজের হৃদয়। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“الحج عرفة”

“হজ হলো আরাফাহ।”

৯ জিলহজ সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দান যেন আসমানি রহমতের বৃষ্টিতে ভিজে থাকে। এই কয়েক ঘণ্টা একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলোর একটি।

◾আরাফার প্রধান আমলসমূহ

*************************

১. আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ

আরাফায় এসে প্রথম অনুভূতি হওয়া উচিত হে আল্লাহ! আমি এসে গেছি। বছরের পর বছর দুনিয়ার পেছনে ছুটেছি। আজ আমি আপনার দরবারে দাঁড়িয়েছি। আজ আর কোন দাবি নেই। শুধু ক্ষমা চাই।

২. বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার

আরাফার দিনের সবচেয়ে বড় আমল হলো আন্তরিক তওবা। বারবার পড়তে হবে—

أستغفر الله وأتوب إليه

“আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর দিকে ফিরে আসি।”

শুধু মুখের তওবা নয়। জীবনের ভুলগুলোর জন্য হৃদয় ভেঙে কান্না করতে হবে।

৩. দীর্ঘ দোয়া করা

আরাফার দিন হলো দোয়ার দিন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন “সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া। এদিন নিজের জন্য, পরিবার, সন্তান, উস্তাদ, বন্ধু, দেশ, উম্মাহ—সবার জন্য দোয়া করতে হবে।

বিশেষভাবে বেশি পড়তে হবে—

لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير

৪. কুরআন তিলাওয়াত

আরাফার নির্জনতায় কুরআন পড়লে আয়াতগুলো নতুনভাবে হৃদয়ে নেমে আসে। বিশেষ করে তওবা, জান্নাত, জাহান্নাম ও আখিরাত সম্পর্কিত আয়াতগুলো।

৫. দরুদ শরীফ

যিনি আমাদের এই পথে এনেছেন, সেই প্রিয় নবী ﷺ-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। কারণ বিদায় হজের আরাফাহতেই তিনি উম্মতের জন্য সর্বশেষ মহান উপদেশ দিয়েছিলেন।

৬. যিকিরে মশগুল থাকা

তাহলীল, তাকবীর, তাহমীদ, তাসবীহ—

سبحان الله

الحمد لله

الله أكبر

لا إله إلا الله

এই যিকিরগুলো আরাফার পরিবেশকে হৃদয়ের মধ্যে জীবন্ত করে তোলে।

◾আরাফায় উপস্থিত হওয়ার অনুভূতি

******************************

১. মনে হবে আমি হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছি

চারদিকে সাদা ইহরাম। লক্ষ লক্ষ মানুষ। কেউ কাউকে চেনে না। কেউ নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ব করছে না।

মনে হবে আজ যেন কবর থেকে উঠে হাশরের মাঠে এসে দাঁড়িয়েছি।

২. মনে হবে আমার জীবনের হিসাব শুরু হয়ে গেছে

জীবনের প্রতিটি ভুল সামনে ভেসে উঠবে। কত নামাজ নষ্ট হয়েছে। কত গীবত করেছি। কত মানুষের হৃদয় ভেঙেছি। কত অবহেলা করেছি। মনে হবে আজ যদি ক্ষমা না পাই, তবে কবে পাব?

৩. মনে হবে আল্লাহ আমাকে ডেকেছেন

কোটি কোটি মুসলমানের মধ্য থেকে আমাকে এখানে আনা হয়েছে। এটা আমার যোগ্যতার কারণে নয়। এটা আল্লাহর বিশেষ দয়া। তখন হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরে যাবে।

৪. মনে হবে আমি একা নই। চারদিকে হাজার ভাষার মানুষ। কিন্তু সবার কান্না এক। সবার প্রার্থনা এক।সবার রব এক। এ যেন উম্মাহর সবচেয়ে সুন্দর মিলনমেলা।

৫. মনে হবে আসমান খুব কাছে

আরাফার বিকেলে যখন হাত উঠবে, মনে হবে আসমান ও জমিনের দূরত্ব কমে গেছে। দোয়া যেন সরাসরি আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যাচ্ছে।

৬. সূর্যাস্তের সময় হৃদয় কেঁপে উঠবে

আরাফার সূর্যাস্ত সাধারণ সূর্যাস্ত নয়। এটি একটি সুযোগের সমাপ্তি। একজন হাজী তখন ভাবতে পারে—

“আজকের এই কয়েক ঘণ্টায় কি আমি সত্যিই বদলাতে পেরেছি? আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করেছেন? আমি কি নতুন জীবন নিয়ে ফিরতে পারব?”

আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে একটি অনুভূতি

হয়তো আপনি জাবালে রহমার দিকে তাকিয়ে আছেন।

গরম বাতাস বইছে।

হাজার হাজার হাত আকাশের দিকে উঠেছে। কেউ কাঁদছে। কেউ কুরআন পড়ছে। কেউ নিঃশব্দে ক্ষমা চাইছে। সেই মুহূর্তে হৃদয়ের গভীর থেকে একটি কথাই বেরিয়ে আসে হে আল্লাহ! আজ আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়েছি। আমার কাছে কোন আমল নেই, কোন যোগ্যতা নেই, কোন দাবি নেই।

শুধু একটি আশা আছে আপনার রহমত। আজ যদি আপনি ক্ষমা করেন, তবে আমি সফল। আর যদি ফিরিয়ে দেন, তবে আমি সর্বহারা।

এই অনুভূতিই আরাফার প্রাণ। এখানে মানুষ শুধু দোয়া করে না; বরং নতুন জীবন নিয়ে ফিরে আসার অঙ্গীকার করে। আরাফাহ একজন হাজীকে শেখায় দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আল্লাহর ক্ষমা।

◾আরাফায় যে কথাগুলো স্মরণ করা যেতে পারে

****************************************

১. হয়তো এটাই আমার জীবনের শেষ আরাফাহ

গত বছরও লক্ষ মানুষ এখানে দাঁড়িয়েছিল। তাদের অনেকেই আজ কবরে শুয়ে আছে। তারা ভেবেছিল আরও একবার আসবে। আরও একবার তওবা করবে।আরও একবার কাবা দেখবে। কিন্তু আর আসতে পারেনি। হয়তো আগামী বছর আমার নামও জীবিতদের তালিকায় থাকবে না।‌ হয়তো এটাই আমার শেষ আরাফাহ।

২. আল্লাহ আমাকে বহুবার সুযোগ দিয়েছেন

আমি কতবার গুনাহ করেছি! কতবার তওবা ভেঙেছি!কতবার নামাজে অবহেলা করেছি!‌ কতবার আল্লাহর নাফরমানি করেছি! তবুও তিনি আমার রিজিক বন্ধ করেননি।

আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করেননি। আমাকে অপমানিত করেননি। বরং আজও তাঁর ঘরের মেহমান বানিয়ে এখানে দাঁড় করিয়েছেন। আমি কি এমন রবের সামনে লজ্জিত হব না?

৩. আমার গুনাহগুলো আমি ভুলে গেছি, কিন্তু আল্লাহ জানেন। অনেক গুনাহ আমার নিজেরও মনে নেই।

যে চোখে হারাম দেখেছি। যে কথায় কাউকে কষ্ট দিয়েছি। যে রাতে গোপনে পাপ করেছি। যে নিয়তে মানুষকে ধোঁকা দিয়েছি। সবই তাঁর জানা। আজ আমি এমন এক সত্তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যার কাছ থেকে কিছুই গোপন নয়।

৪. যদি আজ ক্ষমা না পাই?

আজকের দিনের মতো আর কোন দিন নেই। আজকের ময়দানের মতো আর কোন ময়দান নেই।আজ যদি আমি ক্ষমা না পাই তবে আর কবে পাব?

আজ যদি আমি না কাঁদি‌ তবে আর কোথায় কাঁদব?

৫. কিয়ামতের দিনও আমাকে এমনই দাঁড়াতে হবে

আজ আমি ইহরামে আছি। কাল কাফনে থাকব। আজ মানুষে মানুষে ভরা ময়দান। কাল হাশরের ময়দান। আজ দোয়া করার সুযোগ আছে। কাল শুধু হিসাব হবে। আজ কান্না কাজে লাগবে। কাল অনুশোচনা কাজে লাগবে না।

৬. আমি কি সত্যিই রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসি?

যার জন্য আজ আমি এখানে। যার সুন্নাহ আমাকে এখানে এনেছে। যিনি তায়েফে রক্তাক্ত হয়েছেন। যিনি রাতভর উম্মতের জন্য কেঁদেছেন। আমি কি তাঁর জন্য কিছু ত্যাগ করেছি? নাকি শুধু মুখে ভালোবাসার দাবি করেছি?

৮. আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করলে কী বলব?

যৌবন কোথায় ব্যয় করেছ? সম্পদ কোথায় খরচ করেছ? ইলমের উপর কতটুকু আমল করেছ? মানুষের হক কতটুকু আদায় করেছ? তখন আমার উত্তর কী হবে?

৯. আমি কত মানুষকে কষ্ট দিয়ে এসেছি

হয়তো কারও চোখের পানি আমার কারণে ঝরেছে।

কোন এতিমের হক নষ্ট হয়েছে। কোন আত্মীয় আমার আচরণে কষ্ট পেয়েছে। কোন ছাত্র, কোন প্রতিবেশী, কোন বন্ধু আমার কারণে আহত হয়েছে। আজ যদি তারা আমাকে ক্ষমা না করে?

১০. আল্লাহ আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না তো?

আরাফার ময়দানে সবচেয়ে বড় ভয় আল্লাহ যেন আমাকে বঞ্চিত না করেন। সবাই রহমত নিয়ে ফিরে যাবে, আর আমি খালি হাতে ফিরে যাব‌ এর চেয়ে ভয়ঙ্কর ক্ষতি আর কী হতে পারে?

◾একটি আরাফার মুনাজাত

************************

হে আল্লাহ! আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।আমার মুখে মানুষের কাছে সম্মান আছে কিন্তু আপনি আমার বাস্তবতা জানেন। মানুষ আমার ভালো দিক দেখেছে, আপনি আমার গোপন অন্ধকারও জানেন।

আমার আমল কম, গুনাহ বেশি। পুঁজি সামান্য, দাবি অসংখ্য। তবুও আমি আপনার দরজায় এসেছি।

কারণ আমি জানি আপনার দরজা ছাড়া আমার আর কোন দরজা নেই।

হে আল্লাহ! যেদিন আমার সন্তানরা আমার জানাজার পাশে দাঁড়াবে, যেদিন মানুষ আমাকে কবরের মাটিতে শুইয়ে চলে যাবে, সেদিন যদি আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট না থাকেন, তবে আমি ধ্বংস হয়ে গেলাম।

তাই আজ আরাফার এই বিকেলে, আমার সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন। আমার হৃদয়কে আপনার দিকে ফিরিয়ে দিন। আর আমাকে এমনভাবে বদলে দিন,

যেন এই আরাফাহ আমার জীবনের নতুন জন্ম হয়ে যায়।

অনেক সময় কান্না আসে শব্দের কারণে নয়; আসে যখন মানুষ অনুভব করে—”আল্লাহ এত দয়া করেছেন, অথচ আমি তাঁর জন্য কী করেছি?” এই প্রশ্নটি যদি হৃদয়ের গভীরে নেমে যায়, তবে পাথরের মতো কঠিন হৃদয়ও নরম হয়ে আসে।

Scroll to Top