জান্নাতুল বাকী: যেথায় ঘুমিয়ে আছে হাজারো সাহাবী

মদিনার হৃদয়ে, মসজিদে নববীর ঠিক পূর্ব পাশে রয়েছে জান্নাতুল বাকী। মদিনার কবরস্থান। পৃথিবীর বুকে এমন কবরস্থান আর নেই, যেখানে এত সংখ্যক সাহাবী, আহলে বাইত, উম্মাহাতুল মুমিনীন, তাবেয়ী ও সালেহীন একত্রে শায়িত আছেন।

ইসলামের প্রথম ও সবচেয়ে ঐতিহাসিক কবরস্থান। রাসূল ﷺ-এর যুগ থেকেই এটি মদিনাবাসীর প্রধান কবরস্থান। এখানে হাজার হাজার সাহাবী দাফন হয়েছেন।

◾জান্নাতুল বাকীর ইতিহাস। বাকী শব্দের অর্থ হলো খোলা ভূমি বা বৃক্ষবেষ্টিত প্রান্তর। রাসূল ﷺ যখন হিজরত করে মদিনায় এলেন, তখন এই এলাকা ছিল গারকাদ নামক কাঁটাযুক্ত গাছে পরিপূর্ণ একটি প্রান্তর। পরবর্তীতে এটিকে মুসলমানদের কবরস্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

মদিনার ইতিহাসে বহু কবরস্থান ছিল, কিন্তু আল্লাহর রাসূল ﷺ এই স্থানকে মুসলিম সমাজের কেন্দ্রীয় কবরস্থান হিসেবে গ্রহণ করেন।

মদিনা সফরের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল জান্নাতুল বাকী যিয়ারাহ করা। ফজরের নামাজের পর এবং আসরের নামাজের পর সর্বসাধারণের প্রবেশের জন্য এর দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

রাসূল ﷺ নিজে জান্নাতুল বাকির এই জমিনে হেঁটেছেন। রাতে এখানে এসেছেন। কবরবাসীদের জন্য দোয়া করেছেন। সাহাবীরা এখানে জানাজা নিয়ে এসেছেন। এখানে এসে কেঁদেছেন। চোখের কান্নায় তাদের দাড়ি পর্যন্ত ভিজেছে। আজ আমরা সেই মাটিতে প্রবেশ করেছি সেখানে দাঁড়িয়ে আছি।

◾এখানে সর্বপ্রথম দাফন হয়েছিলেন মুহাজির সাহাবী উসমান ইবনে মাযঊন (রা.)। রাসূল ﷺ নিজ হাতে তাঁর কবর চিহ্নিত করেছিলেন এবং বলেছিলেন:

এর মাধ্যমে আমি আমার ভাইয়ের কবর চিনতে পারব।

মক্কার নির্যাতিত মুহাজিরদের একজন ছিলেন উসমান ইবনে মাযঊন (রা.)। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তিনি মদিনায় এসে ইন্তিকাল করেন। রাসূল ﷺ তাঁকে বিদায় দিতে নিজে কবর পর্যন্ত এসেছিলেন।

◾রাসূল ﷺ-এর সাথে বাকীর সম্পর্ক

রাসূল ﷺ প্রায়ই বাকীতে যেতেন। হাদিসে এসেছে তিনি রাতে বাকীতে গিয়ে কবরবাসীদের জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলতেন: হে মুমিনদের ঘরের অধিবাসীগণ! তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব।

কবরস্থান জিয়ারতের উদ্দেশ্য হলো কবর মানুষকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।ৎযে মানুষ গতকাল বাজারে ছিল, আজ সে মাটির নিচে।

যে মানুষ গতকাল নেতৃত্ব দিচ্ছিল, আজ সে নীরব।

যে মানুষ গতকাল ধনী ছিল, আজ সে কাফনের মালিক।

কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য। অনেক মানুষ মনে করে কবর জিয়ারত শুধু মৃতদের জন্য। আসলে কবর জিয়ারতের সবচেয়ে বড় উপকার জীবিতদের।

রাসূল ﷺ বলেছেন কবর জিয়ারত করো। এটি তোমাদের আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেয়। কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য—

১. মৃত্যুকে স্মরণ করা

২. আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া

৩. মৃতদের জন্য দোয়া করা

৪. অহংকার ভাঙা

৫. দুনিয়ার মোহ কমানো

◾জান্নাতুল বাকীতে হাজার হাজার সাহাবী এখানে দাফন হয়েছেন। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) তৃতীয় খলিফা। প্রিয় রাসুলের দুই কন্যার স্বামী হওয়ার কারণে যুন নূরাইন। হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.)

রাসূল ﷺ-এর দৌহিত্র। জান্নাতি যুবকদের নেতা।রাসূল ﷺ-এর চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) ইবরাহিম (রা.) রাসূল ﷺ-এর পুত্র।

উম্মাহাতুল মুমিনীন, রাসূল ﷺ-এর অধিকাংশ স্ত্রী এখানে শায়িত। রাসূল ﷺ-এর কন্যাগণ হযরত রুকাইয়া (রা.) হযরত উম্মে কুলসুম (রা.) হযরত জয়নাব (রা.) হযরত সাফিয়া (রা.)। রাসূল ﷺ-এর ফুফু। অসংখ্য বদরী সাহাবী‌। হাজার হাজার আনসার ও মুহাজির

◾ জান্নাতুল বাকিতে আপনি সাহাবীদের শহরে দাঁড়ানে আছেন। ভাবুন আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। সামনের মাটির নিচে হয়তো এমন একজন শুয়ে আছেন যিনি বদরে অংশ নিয়েছেন। যিনি উহুদে রক্ত দিয়েছেন। যিনি খন্দকে ক্ষুধার্ত ছিলেন। যিনি হুদাইবিয়ায় বায়আত করেছিলেন। যিনি রাসূল ﷺ-এর পেছনে নামাজ পড়েছেন। যিনি সরাসরি ওহী নাজিল হতে দেখেছেন। এই জমিনে আজ তিনি নীরব শুয়ে আছেন। মাটির ওপরে আপনি‌‌ মাটির নিচে তিনি।

জান্নাতুল বাকীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আজ জান্নাতুল বাকীতে গেলে কোনো প্রাসাদ নেই। কোনো রাজসিংহাসন নেই। কোনো পদবি নেই।‌ কোনো ক্ষমতা নেই।

খলিফা আর সাধারণ মানুষ সবাই একই মাটির নিচে।

উসমান (রা.) আছেন। হাসান (রা.) আছেন। উম্মাহাতুল মুমিনীন আছেন। হাজারো সাহাবী আছেন।

কিন্তু তাদের কবরের ওপর কোনো দুনিয়াবী গৌরব নেই। এ যেন আল্লাহ বলছেন মানুষ, তোমার শেষ ঠিকানাও এই।

জান্নাতুল বাকীর সুসংবাদ। রাসূল ﷺ বাকীবাসীদের জন্য দোয়া করেছেন। এটি এমন এক কবরস্থান যার বাসিন্দাদের জন্য তিনি বিশেষভাবে মাগফিরাত প্রার্থনা করেছেন।

আর এখানে শায়িত অধিকাংশ মানুষ সাহাবী। আহলে বাইত। উম্মাহাতুল মুমিনীন। বদরী মুজাহিদ। আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত বান্দা। এটি এমন এক ভূমি যার প্রতিটি কবর ইসলামের ইতিহাসের একটি অধ্যায়।

◾বর্তমান বাকী দেখে যে অনুভূতি আসে

অনেক হাজী প্রথমবার বাকী দেখে অবাক হন। তারা ভাবেন এত বড় মানুষদের কবর এত সাধারণ কেন?

এখানে কোনো জাঁকজমক নেই কেন? এখানে কোনো বিশাল গম্বুজ নেই কেন?

উত্তর হলো ইসলাম মানুষের দৃষ্টি কবরের অলংকারে নয়, আমলের দিকে ফেরাতে চায়।‌কবরের সৌন্দর্য নয়,

কবরবাসীর ঈমানই আসল সৌন্দর্য।

◾বাকীর সামনে দাঁড়িয়ে শেষ আহ্বান

যখন বাকীর পাশে দাঁড়াবেন। একটু চোখ বন্ধ করুন।

কল্পনা করুন রাসূল ﷺ এখানে দাঁড়িয়ে দোয়া করছেন। আবু বকর (রা.) এখানে এসেছেন। উমর (রা.) এখানে এসেছেন। আলী (রা.) এখানে এসেছেন।হাসান (রা.) এখানে আছেন। উসমান (রা.) এখানে আছেন।

রাসূল ﷺ-এর সন্তানরা এখানে আছেন। উম্মাহাতুল মুমিনীন এখানে আছেন। তারপর নিজের হৃদয়কে জিজ্ঞেস করুন আমি যদি আজ বাকীর বাসিন্দা হয়ে যাই, আল্লাহর কাছে কী নিয়ে যাব?

আমার নামাজ আমার কুরআন আমার দাওয়াত০ আমার তাওবা, আমার চোখের পানি, আমার ঈমান, নাকি শুধু অপচয় করা জীবন।

জান্নাতুল বাকীর সামনে দাঁড়ালে আরেকটি বিষয় হৃদয়কে নাড়া দেয়। এই কবরস্থানে শায়িত হওয়া ছিল অনেক মানুষের স্বপ্ন। অনেক মানুষ আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন‌ হে আল্লাহ! আমার মৃত্যু যেন মদিনায় হয়।

কারণ তারা জানতেন, মদিনা শুধু একটি শহর নয়।এটি প্রিয় নবীর শহর। এটি ঈমানের শহর। এটি ভালোবাসার শহর। ইতিহাসে বহু মানুষ জীবনের শেষ সময়ে মদিনায় চলে এসেছেন। কেউ ব্যবসার জন্য নয়। কেউ সম্পদের জন্য নয়। কেউ সম্মানের জন্য নয়।

শুধু একটি আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমার মৃত্যু যেন নবীর শহরে হয়। অনেকে আর মদিনা ছেড়ে যাননি। তারা অপেক্ষা করেছেন মৃত্যুর। ভয়ের কারণে নয়। ভালোবাসার কারণে।

কারণ তাদের হৃদয়ে একটি স্বপ্ন ছিল জীবন নবীর ভালোবাসায় কাটুক। মৃত্যুও নবীর শহরে আসুক। আর কবরও হোক নবীর প্রতিবেশীদের মাঝে।

জান্নাতুল বাকীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানে এসে মানুষ বুঝতে পারে শেষ পর্যন্ত সবাইকে এই মাটির নিচেই যেতে হবে। আজ যারা বাকীতে শুয়ে আছেন, তারা একদিন আমাদের মতোই হেঁটেছেন।

তারপর একদিন তাদের জানাজা হয়েছে। তাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। আজ তারা অপেক্ষা করছেন। আর একদিন আমরাও অপেক্ষা করব।

সুতরাং বাকী আমাদের শুধু ইতিহাস শেখায় না। বাকী আমাদের মৃত্যু শেখায়। বাকী আমাদের আখিরাত শেখায়। বাকী আমাদের দুনিয়ার বাস্তবতা শেখায়।

বাকী আমাদের শেখায় মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সম্পদ নয়। তার পদ নয়। তার খ্যাতি নয়। তার পরিচয় হলো তার ঈমান। তার আমল।‌তার আল্লাহর সাথে সম্পর্ক। তাই বাকীর পাশে দাঁড়িয়ে আমরা দোয়া করি হে আল্লাহ! আপনি যেমন এই কবরগুলোর নিচে শায়িত নেককার বান্দাদের প্রতি রহমত করেছেন, আমাদের প্রতিও রহমত করুন। তাদের ঈমানের অংশ আমাদের দিন। তাদের আখিরাতমুখিতা আমাদের দিন। তাদের নবীপ্রেম আমাদের দিন। তাদের ত্যাগের চেতনা আমাদের দিন। আর যেদিন আমাদের মৃত্যু হবে, সেদিন আমাদেরকে ঈমানের উপর মৃত্যু দান করুন।

হে আল্লাহ! সাহাবীদের ভালোবাসা আমাদের অন্তরে দান করুন। আহলে বাইতের মুহাব্বত দান করুন।মৃত্যুর পূর্বে খাঁটি তাওবা দান করুন।‌ মদিনার প্রতি ভালোবাসা দান করুন। মসজিদে নববীর পাশে ঈমানের সাথে জীবন কাটানোর তাওফিক দিন। আর যেদিন আমরা এই পৃথিবী ছেড়ে যাব,সেদিন আমাদেরকে আপনার প্রিয় বান্দাদের কাতারে উঠিয়ে নিন। আমিন।

Scroll to Top