আমাদের সমাজে দুইটি বড় ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে।প্রথম ভুল ধারণা কিছু ইমাম মনে করেন, কোথায় চাকরি করলাম, কত বেতন পেলাম, কত সুযোগ-সুবিধা পেলাম এটাই সফলতার মাপকাঠি।
দ্বিতীয় ভুল ধারণা কিছু মসজিদ কমিটি ও মুসল্লি মনে করেন, যে ইমাম কম বেতনে চাকরি করবে,সেই বেশি ইখলাসওয়ালা। যে নিজের প্রাপ্য চাইবে,সে দুনিয়াদার।
যে পরিবারের কথা বলবে,সে ইখলাসহীন। মহল্লা বাসী কম বেতনে মোখলেছ ইমাম তালাশ করে।
এই দুই ধারণাই ভুল। এবং এই দুই ধারণাই উম্মাহর ক্ষতি করছে।ইখলাসের সাথে বেতনের সম্পর্ক নেই।
আমাদের প্রিয় রাসূল ﷺ অবশ্যই ইখলাসওয়ালা ছিলেন। কোন সন্দেহ নেই। অবশ্যই সাহাবায়ে কেরাম ইখলাসওয়ালা ছিলেন। কোন সন্দেহ নেই।কিন্তু তাদের সকলেরই জীবিকা ছিল। তাদের পরিবার ছিল। সন্তান ছিল। তাদের পরিবারে খাদ্যের প্রয়োজন ছিল। পোশাকের প্রয়োজন ছিল। তাদের বাসস্থানের প্রয়োজন ছিল। আর এজন্য প্রয়োজন হালাল উপার্জন। কাজেই পরিবার পরিচালনার জন্য পরিশ্রমের প্রতিদান প্রয়োজন।
ইসলামের কোথাও এমন কথা নেই যত বেশি কষ্টে থাকবে, তত বেশি ইখলাস হবে? ইসলাম এমন কথা বলে না। ইসলাম সুন্দর স্বচ্ছল জীবনের প্রতি উৎসাহিত করে। ইসলাম বলে হালাল রিজিক গ্রহণ করো। মর্যাদার সাথে জীবনযাপন করো। মানুষের মুখাপেক্ষী হয়ো না।
ইহা একটি অদ্ভুত মানসিকতা আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায় মসজিদের ঝাড়বাতি বদলানো হবে। লক্ষ লক্ষ টাকা চলে আসে। কার্পেট বদলানো হবে। টাকা চলে আসে। টাইলস লাগানো হবে। টাকা চলে আসে। গম্বুজ সুন্দর করা হবে। টাকা চলে আসে।
মিনার উঁচু করা হবে। টাকা চলে আসে।
কিন্তু যখন বলা হয় ইমামের বেতন বাড়াতে হবে। তখন বলা হয় এত টাকা কোথা থেকে আসবে। মহল্লা বাসী চায় ইমাম যেন আল্লাহর জন্য খেদমত করে। মসজিদ কমিটি বলে এত টাকার দরকার কী? আগের ইমাম তো কম টাকায় ছিল! এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক আলোচনা। এটা নিচু দৃষ্টিভঙ্গি। এর দ্বারা একজন ইমামকে নয় বরং দ্বীনকে খাটো দৃষ্টিতে দেখা হয়।
একটু চিন্তা করুন। মসজিদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস কি ঝাড়বাতি? সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস কি টাইলস? সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস কি মার্বেল?
মসজিদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সেই মানুষটি যার অধীনে আপনি নামাজ পড়েন। যিনি প্রতিদিন আপনাকে কুরআন শোনায়। যে মানুষটি আপনার সন্তানের ঈমান রক্ষা করে। যে মানুষটি আপনার জানাজা পড়াবে। যে মানুষটি আপনার সন্তানকে কুরআন শেখাবে। যে মানুষটি আপনার পরিবারকে দ্বীনের সাথে যুক্ত রাখবে।
ইট-পাথরের চেয়ে মানুষ বেশি মূল্যবান। একটি মসজিদের সৌন্দর্য শুধু দেয়ালে নয়। একটি মসজিদের সৌন্দর্য তার ইমামে। একটি মসজিদের সৌন্দর্য ইমামের ইলমে। একটি মসজিদের সৌন্দর্য ইমামের সঠিক তারবিয়াতে।
একটি মসজিদের সৌন্দর্য ইমামের কুরআনের আলোতে।আজ অনেক জায়গায় ইট-পাথরের মূল্য আছে।কিন্তু আফসোস ইমামের মূল্য নেই। তারা মসজিদের জন্য দামি মার্বেল ক্রয় করে। কিন্তু ইমামকে দাম দেয় না।
ইমামসহ মসজিদ স্টাফদের কম বেতন দেওয়া কোনো ফজিলত নয়। আমি আবার বলছি কম বেতন দেওয়া কোনো ফজিলত নয়।ইমামকে কষ্টে রাখা কোনো ইবাদত নয়। ইমামের সন্তানকে কষ্টে রাখা কোনো তাকওয়া নয়। ইমামের পরিবারকে অনিশ্চয়তায় রাখা কোনো দ্বীনদারী নয়।
বরং একজন আলেমকে সম্মানিত করা, একজন দ্বীনের খাদেমকে স্বাবলম্বী করা, একজন ইমামের দুশ্চিন্তা কমিয়ে দেওয়া এগুলো নেক আমল।
এগুলো সাদাকায়ে জারিয়া। এগুলো আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যম। ইট পাথর ক্রয় করা থেকে বেশি ফজিলতপূর্ণ।
ইমামেরও একটি পরীক্ষা আছে। যদি বেতন বাড়ে অহংকার নয়। যদি সম্মান বাড়ে, দম্ভ নয়। যদি সুযোগ-সুবিধা বাড়ে আলস্য নয়। বরং আরও বেশি দায়িত্ব। আরও বেশি খিদমত। আরও বেশি জবাবদিহি।
সফল ইমামের সংজ্ঞা কী?
**********************
সফল ইমাম কি সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া ইমাম? সবচেয়ে বড় মসজিদে থাকা ইমাম? বরং সবচেয়ে সফল ইমাম তিনি যিনি সবচেয়ে বেশি মানুষের হৃদয় বদলেছেন। যিনি সবচেয়ে বেশি যুবককে মসজিদে এনেছেন। যিনি সবচেয়ে বেশি পরিবারকে বাঁচিয়েছেন। যিনি সবচেয়ে বেশি মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়েছেন।
সফল মসজিদ কমিটি মুসল্লির সংজ্ঞা কী?
**********************************
সবচেয়ে কম খরচে ইমাম নিয়োগ করা কি মসজিদ কমিটির সফলতা? ব্যাংকে লক্ষ কোটি টাকা জমা করতে পারা কি মসজিদ কমিটির সফলতা।
বরং সবচেয়ে সফল মুসল্লি ও মসজিদ কমিটি হলো যারা তাদের ইমামকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। তার পরিবারের খোঁজ নিয়েছে। তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেছে। তাকে মানুষের কাছে হাত পাততে বাধ্য করেনি। তাকে মর্যাদার সাথে দ্বীনের খিদমত করার সুযোগ দিয়েছে।
আমরা অনেকেই কিয়ামতের দিন হয়তো দেখব আমরা ঝাড়বাতি দিয়েছি। মার্বেল দিয়েছি। মসজিদে গম্বুজ বানিয়েছি। কিন্তু যে মানুষটি সারা জীবন সেই মসজিদে কুরআন পড়িয়েছে তার কষ্ট আমরা দেখিনি।তার সন্তানের কান্না আমরা শুনিনি। তার চিকিৎসার খবর আমরা রাখিনি। ইট পাথরের সেবা করেছি। কিন্তু আলেমের পাশে কখনো দাঁড়াইনি।
তখন আল্লাহ যদি জিজ্ঞাসা করেন আমি তোমাদের মাঝে আমার দ্বীনের একজন খাদেম পাঠিয়েছিলাম।
তোমরা তার সাথে কেমন আচরণ করেছিলে?সেই প্রশ্নের উত্তর কী হবে? এই প্রশ্নটিই অনেক কঠিন প্রশ্ন হয়। আজকের সমাজের মসজিদ কমিটি ও মুসল্লিদের বিষয়টি বারবার ভাবা চাই।
মসজিদ কমিটিতে থাকা সফলতা নয়। বরং এই সময়ের সবচেয়ে বিপদজনক কাজ। মসজিদ কমিটির প্রতি ইমাম মসজিদ স্টাফদের যে কষ্ট থাকে। নামাজের সেজদায় যেয়ে তাদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে যৈ অভিযোগ থাকে তা তাদের দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বনাশ করার জন্য যথেষ্ট।
মসজিদ কমিটির দায়িত্ব শুধু ভালো আচরণ করা নয়। মসজিদের ইমাম ও দায়িত্বশীলদের সম্মান নিশ্চিত করা। কমিটির কেহ অথবা সমাজের কেহ ইমামের সাথে অন্যায় আচরণ করলে কমিটিতে থাকা অন্যদের তখন দায়িত্ব হয় ইমামের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। এ ব্যাপারে নীরবতা বিপদজনক।
ইমামদের বলছি বেতনকে লক্ষ্য বানাবেন না।
খিদমতকে লক্ষ্য বানান। মহল্লাবাসীদের বলছি কম বেতন দেওয়াকে ইখলাসের পরীক্ষা বানাবেন না। দ্বীনের খাদেমকে সম্মানিত করুন। কারণ যে সমাজ আলেমকে সম্মান করে, আল্লাহ সেই সমাজকে সম্মান দেন।
আর যে সমাজ আলেমকে অবমূল্যায়ন করে, তারা ইমামকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না বরং নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কষ্টে কষ্টে ইমামের দিন শেষ হয়। কিন্তু ইমামকে কষ্ট দেয়ার ফলে ধীরে ধীরে সেই সমাজের দ্বীন দুর্বল হয়ে যায়। তাদের দুনিয়াও বরবাদ হয়ে যায়।
ইমাম বলবেন আমি আরও কী দিতে পারি?
মুসল্লিরা বলবেন আমরা আমাদের ইমামকে আর কীভাবে সহযোগিতা করতে পারি?”
এই দুই বাক্য একত্রিত হলেই মসজিদ জীবন্ত হবে, মহল্লা জীবন্ত হবে, উম্মাহ জীবন্ত হবে।