রাসূল ﷺ-এর ইমামতি ছিল নেতৃত্ব। রাসূলুল্লাহর মসজিদ ছিল সমাজের হৃদয়। প্রিয় রাসূল ছিলেন ইমাম। আর তিনি ছিলেনপথপ্রদর্শক। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন মসজিদের খাদেম। মুসল্লিরা ছিল সহযোগী। যুবকরা ছিল মসজিদের প্রাণ।
এখন প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে আবার মসজিদকে সমাজের কেন্দ্র বানাব? কীভাবে আবার মিম্বরকে নেতৃত্বের আসনে ফিরিয়ে আনব? কীভাবে আবার এমন প্রজন্ম তৈরি করব, যারা মসজিদ থেকে উঠে এসে সমাজকে নেতৃত্ব দেবে?
প্রথম কথা: মসজিদকে শুধু নামাজের স্থানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। আজ অনেক মুসলমানের কাছে মসজিদের পরিচয় হলো আজান হবে। নামাজ হবে।দোয়া হবে। তারপর তালা ঝুলবে। কিন্তু নববী মডেল এমন ছিল না।
রাসূল ﷺ-এর মসজিদে শিক্ষা হতো। শূরা হতো।দাওয়াত হতো। সমাজসেবা হতো।
যুবকদের প্রশিক্ষণ হতো। মানুষের সমস্যা সমাধান হতো। মসজিদ ছিল জীবনের কেন্দ্র।
দ্বিতীয় কথা: ইমামকে আবার নেতা বানাতে হবে
আমাদের সমাজে একটি বড় ভুল হলো আমরা ইমামকে নামাজের কর্মচারী বানিয়ে ফেলেছি।
কিন্তু রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ হলো ইমাম সমাজের নৈতিক নেতা। আল্লাহ বলেন:
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا
“আমি তাদের মধ্য থেকে এমন ইমাম বানিয়েছি, যারা আমার নির্দেশে মানুষকে পথ দেখায়।” (সূরা সাজদাহ: ২৪)
খেয়াল করুন ইমামের কাজ শুধু নামাজ পড়ানো নয়;
মানুষকে পথ দেখানো। একটি জীবন মসজিদ গড়ে তোলায় ইমামকে তার মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
তৃতীয় কথা: ইমামের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে একটি বাস্তব কথা বলতে হবে। যে ব্যক্তি প্রতিদিন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য বলবে, তার ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা থাকতে হবে। একজন ইমাম যদি প্রতিনিয়ত বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, বাজারের চিন্তায় ডুবে থাকেন, তাহলে তার মনোযোগ নেতৃত্ব থেকে জীবিকা সংগ্রামে সরে যাবে।
তাই একটি এলাকার মানুষ যদি সত্যিই মসজিদকে শক্তিশালী করতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হবে ইমামের সম্মানজনক জীবিকা নিশ্চিত করা।
চতুর্থ কথা: কমিটির পরিচয় মালিক নয়, খাদেম।আজ অনেক মসজিদের সংকটের মূল কারণ কমিটি নিজেদেরকে মালিক ভাবতে শুরু করেছে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে মসজিদ আল্লাহর। আমরা সবাই খাদেম। যে সভাপতি, সে খাদেম। যে সম্পাদক সে খাদেম। যে দানকারী, সে খাদেম। যে ইমাম, সে খাদেম।
যে মুসল্লি, সে খাদেম। মালিক একমাত্র আল্লাহ।
এই উপলব্ধি ফিরে আসলে অনেক সমস্যা শেষ হয়ে যাবে।
পঞ্চম কথা: যুবকদের জন্য মসজিদের দরজা খুলতে হবে আজকের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হবে যুবকদের মধ্যে বিনিয়োগ। রাসূল ﷺ যুবকদের উপর ভরসা করেছিলেন। তাই যুবকরা ইতিহাস গড়েছিল।
আজ আমাদের মসজিদে দরকার কিশোর হালাকা
কুরআন শিক্ষা, বইপাঠ সিরাত চর্চা দক্ষতা উন্নয়ন,
সমাজসেবা কার্যক্রম, যুবকদের শুধু শাসন নয় দায়িত্ব দিতে হবে।
ষষ্ঠ কথা: মসজিদভিত্তিক সমাজসেবা চালু করতে হবে। রাসূল ﷺ-এর মসজিদে দরিদ্ররা আশ্রয় পেত।ক্ষুধার্তরা সাহায্য পেত।
আজ আমাদের এলাকায় অসুস্থ মানুষ আছে। বিধবা আছে। এতিম আছে। বেকার যুবক আছে। নেশাগ্রস্ত কিশোর আছে। মসজিদ যদি তাদের পাশে না দাঁড়ায়,
তাহলে কে দাঁড়াবে?
সপ্তম কথা: হারাম উপার্জনের বিরুদ্ধে মিম্বরকে জাগ্রত করতে হবে। আজ সমাজের বড় রোগ সুদ ঘুষ, দুর্নীতি প্রতারণা, অসততা। রাসূল ﷺ বলেছেন:
كُلُّ جَسَدٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ
“যে দেহ হারাম দ্বারা পুষ্ট হয়েছে, জাহান্নামের আগুনই তার জন্য অধিক উপযুক্ত। (তাবারানি; অর্থগতভাবে বিভিন্ন হাদিসে সমর্থিত)
যে সমাজ হারামকে স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলে, সেই সমাজে বরকত থাকে না। তাই মিম্বরের দায়িত্ব মানুষের হৃদয়ে তাকওয়া ফিরিয়ে আনতে হবে।
অষ্টম কথা: মুসল্লিকে দর্শক নয়, অংশীদার হতে হবে। আজ অনেক মুসল্লি শুধু নামাজ পড়ে চলে যান।
কিন্তু মসজিদ শুধু ইমাম বা কমিটির দায়িত্ব নয়। এটি পুরো এলাকার আমানত। যদি একটি মসজিদ শক্তিশালী হয়, পুরো সমাজ শক্তিশালী হয়। যদি একটি মসজিদ দুর্বল হয়, পুরো সমাজ দুর্বল হয়।
মসজিদ নববী মডেলের একটি চিত্র। একটি মসজিদ কল্পনা করুন ফজরে মুসল্লি আসে।সকালে শিশুদের কুরআন শিক্ষা হয়। বিকেলে কিশোরদের হালাকা হয়। রাতে পারিবারিক পরামর্শ হয়।গরিবদের জন্য সাহায্য তহবিল আছে।
যুবকদের জন্য দিকনির্দেশনা আছে। ইমাম সমাজের সুখ-দুঃখে পাশে আছেন। কমিটি স্বচ্ছতার সাথে কাজ করছে। মুসল্লিরা সহযোগিতা করছে।এটাই ছিল নববী মডেলের ছায়া।
বাংলাদেশে লক্ষাধিক মসজিদ আছে। যদি প্রতিটি মসজিদ দশজন যুবককে গড়ে তোলে, পাঁচটি পরিবারকে রক্ষা করে, কয়েকজন গরিবের পাশে দাঁড়ায়, হারাম উপার্জনের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করে, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই সমাজে বিশাল পরিবর্তন আসতে পারে।
পরিবর্তনের শক্তি সংসদে যতটা নেই, তার চেয়েও বেশি আছে মসজিদের মিম্বারে যদি সেটি কুরআন ও সুন্নাহর আলোয় জাগ্রত হয়।
একদিন আমরা সবাই চলে যাব। কমিটির পদ থাকবে না। সভাপতির চেয়ার থাকবে না। ইমামের চাকরি থাকবে না। আমাদের নামও মানুষ ভুলে যাবে। কিন্তু যদি আমরা একটি জীবন্ত মসজিদ রেখে যেতে পারি,
একটি ঈমানী প্রজন্ম রেখে যেতে পারি,একটি জাগ্রত মিম্বর রেখে যেতে পারি,তাহলে আমাদের আমলনামা বন্ধ হবে না।
রাসূল ﷺ-এর মসজিদ মাটির ছিল,কিন্তু মানুষ গড়ত।
আজ আমাদের মসজিদ মার্বেলের,এখন প্রয়োজন মানুষ গড়ার।
মিনার উঁচু হয়েছে, এখন চরিত্র উঁচু করতে হবে।
গম্বুজ বড় হয়েছে, এখন হৃদয় বড় করতে হবে।
মসজিদ সুন্দর হয়েছে,এখন সমাজ সুন্দর করতে হবে।
আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি মসজিদকে শুধু নামাজের স্থান নয়, সমাজ গঠনের কেন্দ্র বানাব।ইমামকে শুধু কর্মচারী নয়, নৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব। যুবকদের মসজিদের সাথে যুক্ত করব।হারাম উপার্জন থেকে বাঁচব।
আর আমাদের মসজিদগুলোকে নববী মডেলের আলোয় পুনর্জীবিত করার জন্য কাজ করব।
اللهم اجعل مساجدنا مناراتٍ للهدى، ومراكزَ للإيمان، ومدارسَ للعلم، وحصونًا للأمة.
হে আল্লাহ! আমাদের মসজিদগুলোকে হেদায়েতের মিনার, ঈমানের কেন্দ্র, জ্ঞানের বিদ্যালয় এবং উম্মাহর দুর্গে পরিণত করুন।
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين।
সমগ্র ধারাবাহিকের মূল বার্তা ।ইমামতি চাকরি নয়, নেতৃত্ব। মসজিদ ভবন নয়, উম্মাহ গঠনের কেন্দ্র।কমিটি মালিক নয়, খাদেম। মুসল্লি দর্শক নয়, অংশীদার। আর যুবকরাই মসজিদের ভবিষ্যৎ।