আজ আমি এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই, যে বিষয়টি আমাদের সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি, কিন্তু সবচেয়ে কম আলোচিত।
বিষয়টি হলো—
একজন পুরুষ কেমন হওয়া চাই। একজন পুরুষ কি শুধু একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ? প্রাপ্তবয়স্ক হলেই কিছু দায়িত্ব পালনের যোগ্য হয়। একজন পুরুষ কি শুধু উপার্জনকারী? উপার্জন করতে পারাই কি তার যোগ্যতা। একজন পুরুষ স্বামী? একজন পুরুষ পিতা? এটা কি তার দায়িত্ব না সম্মান মর্যাদা।
এই বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছে কুরআন। কুরআনের দৃষ্টিতে একজন পুরুষ একটি দুর্গ। একজন পুরুষ একটি আশ্রয়। একজন পুরুষ একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একজন পুরুষ একটি হেফাজতের প্রাচীর।
একজন পুরুষের কাঁধে শুধু নিজের জীবন নয়; একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি স্ত্রীর নিরাপত্তা, একটি সন্তানের আগামী, একটি সমাজের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে।
আজ পৃথিবীতে অনেক সংকটের কথা বলা হয়।অর্থনৈতিক সংকট। রাজনৈতিক সংকট। প্রযুক্তির সংকট। কিন্তু একটি গভীর সংকটের কথা খুব কম বলা হয় আমাদের ছেলেদের দায়িত্বশীল পুরুষ হিসেবে গড়ে তোলার সংকট। দুঃখজনক বিষয় এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আলোচনাতেও নেই।
আজ আমরা ছেলেদের বড় করছি কিন্তু খুব কম ছেলেদের দায়িত্বশীল পুরুষ হিসেবে তৈরি করছি।আমরা তাদের পড়াশোনা শেখাচ্ছি কিন্তু দায়িত্ব শেখাচ্ছি না। আমরা তাদের অধিকার শেখাচ্ছি কিন্তু কর্তব্য শেখাচ্ছি না। আমরা তাদের আরাম দিচ্ছি কিন্তু সংগ্রাম শেখাচ্ছি না।
ফলে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে যারা জীবন উপভোগ করতে চায়, কিন্তু জীবন বহন করতে চায় না।
অথচ ইসলাম এমন পুরুষ চায় না। ইসলাম এমন পুরুষ চায়, যে বহন করবে। যে দাঁড়াবে। যে রক্ষা করবে। যে দায়িত্ব নেবে।
পুরুষ একটি দুর্গ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা নিসার বিবাহের আলোচনায় বলেন:
وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَٰلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ
“এগুলো ছাড়া অন্যান্য নারীকে তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে এ শর্তে যে, তোমরা তোমাদের সম্পদের মাধ্যমে তাদেরকে গ্রহণ করবে, পবিত্র জীবনযাপনকারী হবে, অবৈধ সম্পর্ককারী হবে না। (সূরা আন-নিসা: ২৪)
এই আয়াতের মধ্যে বিবাহের উদ্দেশ্য, পুরুষের দায়িত্ব এবং পরিবারের ভিত্তির অনেক শিক্ষা রয়েছে। প্রথম কথা এই আয়াতে আল্লাহ বলেছেন—
بِأَمْوَالِكم
তোমাদের সম্পদের মাধ্যমে।
খেয়াল করুন, আল্লাহ প্রথমে আবেগের ভালোবাসার কথা বলেননি। প্রথমে সৌন্দর্যের কথা বলেননি। প্রথমে রোমান্টিকতার কথা বলেননি। প্রথমে বলেছেন সম্পদ।সামর্থ্য। দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা।এটা একজন পুরুষের প্রধান যোগ্যতা।
কারণ একটি পরিবার শুধু ভালোবাসা অনুভূতির গল্প দিয়ে গড়ে ওঠে না। পরিবার পরিচালনার জন্য প্রয়োজন উপার্জন, পরিকল্পনা, ত্যাগ, পরিশ্রম। কাজেই একজন পুরুষকে পরিবার পরিচালনার জন্য সেই সামর্থ্য অর্জন করতে হবে।
আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ বলেছেন:
مُحْصِنِينَ
“পবিত্র জীবনযাপনকারী।”
এই শব্দের মূল ধাতু হলো—
حصن (হিসন)
হিসন অর্থ দুর্গ, দুর্গের কাজ কী?
দুর্গ নিজের জন্য তৈরি হয় না। দুর্গ তৈরি হয় রক্ষার জন্য। দুর্গ আশ্রয় দেয়। দুর্গ নিরাপত্তা দেয়। দুর্গ বিপদের সময় সামনে দাঁড়ায়।
ঠিক তেমনি ইসলাম একজন পুরুষকে এমন একজন মানুষ হিসেবে গড়তে চায়, যে একটি পরিবারের দুর্গ হবে। যার কাছে স্ত্রী নিরাপত্তা পাবে। যার কাছে সন্তান আশ্রয় পাবে। যার ঘরে শান্তি থাকবে। যার চরিত্র পরিবারকে রক্ষা করবে।
একটি আয়াত এই শব্দের মাধ্যমে পরিষ্কার করে দিচ্ছে বিবাহ ভোগ নয়, বিবাহ এক গুরু দায়িত্ব। বিবাহের মাধ্যমে পুরুষ হে দায়িত্ব তার কাঁধে নিচ্ছে।
এতদিন তো ছিল তার বাবার পরিবারের অংশ। বিবাহের মাধ্যমে নতুন পরিবার গড়ে উঠছে। আর সে এ পরিবারের প্রধান দায়িত্বশীল।
এ নতুন পরিবার নতুন প্রতিষ্ঠান। এ পরিবারের প্রধান পুরুষ স্বামী আর নারী স্ত্রী। স্বামী স্ত্রী পরিচয় নতুন পরিবার পরবর্তীতে বাবা-মা পরিচয়ে সন্তান গ্রহণ করবে। এ পরিবার থেকে আগামীর পৃথিবী গড়ে উঠবে। এ পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে অবদান রাখবে।
পুরুষ এ পরিবারের পরিচালক। এটা বিশাল দায়িত্ব।
এখানে আরেকটি শব্দ এসেছে
غَيْرَ مُسَافِحِينَ:
অবাধ ভোগবাদ থেকে মুক্ত পুরুষ
“মুসাফিহীন” শব্দটি এসেছে سفاح (সিফাহ) থেকে।
এর অর্থ অবাধ যৌনাচার। দায়িত্বহীন সম্পর্ক।
সাময়িক প্রবৃত্তি পূরণের জন্য সম্পর্ক স্থাপন।
এখানে আল্লাহ পুরুষকে সতর্ক করছেন তুমি এমন পুরুষ হয়ো না, যে শুধু নিজের প্রবৃত্তি পূরণের জন্য সম্পর্ক খোঁজে তুমি এমন পুরুষ হয়ো না, যে সম্পর্ক গ্রহণ করবে কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণ করবে না।তুমি এমন পুরুষ হয়ো না, যে ভালোবাসার কথা বলবে কিন্তু নিরাপত্তা দেবে না।তুমি এমন পুরুষ হয়ো না, যে একজন নারীর জীবন গ্রহণ করবে কিন্তু তার ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেবে না।
আজকের পৃথিবীর একটি বড় সংকট হলো অনেক মানুষ সম্পর্ক চায়, কিন্তু দায়িত্ব চায় না। অনেক মানুষ ভালোবাসা চায়,কিন্তু ত্যাগ করতে চায় না।অনেক মানুষ অধিকার চায়,কিন্তু কর্তব্য পালন করতে চায় না।
কিন্তু ইসলাম বলে সম্পর্ক মানে দায়িত্ব। বিবাহ মানে আমানত। পরিবার মানে জবাবদিহিতা।একজন পুরুষ যখন বিবাহ করে, তখন সে শুধু একজন নারীকে নিজের জীবনে নিয়ে আসে নাসে একটি আমানত গ্রহণ করে।
সে প্রতিজ্ঞা করে আমি তাকে নিরাপত্তা দেব। আমি তার সম্মান রক্ষা করব। আমি তার প্রয়োজন পূরণ করার চেষ্টা করব। আমি তার পাশে থাকব।আমি তাকে একা ছেড়ে দেব না।
তাই কুরআনের পুরুষ হলো—
مُحْصِن
যে হেফাজতকারী।
আর সে হলো—
غَيْرَ مُسَافِح
যে অবাধ ভোগের সংস্কৃতি থেকে নিজেকে রক্ষা করে।
সে প্রবৃত্তির দাস নয়। সে দায়িত্বের মানুষ। সে ভোগকারী নয়। সে রক্ষাকারী। সে সম্পর্ক নষ্টকারী নয়। সে পরিবার নির্মাণকারী।
এই হলো ইসলামের পুরুষত্বের শিক্ষা।
আজ আধুনিক পৃথিবী বিবাহকে অনেক সময় শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে। দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করে না। কিন্তু ইসলাম বিবাহকে দেখে একটি বড় আমানত হিসেবে।
বিবাহের উদ্দেশ্য শুধু একজন নারী ও পুরুষের মিলন নয়। বরং বিবাহের লক্ষ্য একটি নতুন পরিবার তৈরি করা। একটি প্রজন্ম তৈরি করা। একটি নিরাপদ সমাজ তৈরি করা।
একজন নারী যখন একজন পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন তিনি শুধু একজন জীবনসঙ্গী গ্রহণ করেন না। তিনি তার নিরাপত্তা তার হাতে দেন। তার সম্মান তার হাতে দেন। তার মাতৃত্বের স্বপ্ন তার হাতে দেন। তার ভবিষ্যৎ তার হাতে দেন। তাই পুরুষকে আগে প্রস্তুত হতে হবে। আগে সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। আগে নিজেকে দাঁড় করাতে হবে। তারপর পরিবার গড়তে হবে।
কাওয়াম: পুরুষের প্রকৃত পরিচয়
*****************************
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
“পুরুষরা নারীদের উপর অভিভাবক ও রক্ষণাবেক্ষণকারী কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে অপরজনের উপর কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন এবং কারণ তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে। (সূরা আন-নিসা: ৩৪)
এই আয়াতকে অনেক মানুষ শুধু নেতৃত্বের আয়াত হিসেবে পড়ে। কিন্তু কুরআন এখানে নেতৃত্বের আগে দায়িত্বের কথা বলেছে।
“কাওয়াম” মানে শুধু নেতা নয়। কাওয়াম মানে যে দাঁড়িয়ে থাকে। যে বহন করে। যে আগলে রাখে। যে রক্ষণাবেক্ষণ করে। যে বিপদের সময় সামনে দাঁড়ায়।
যে পালিয়ে যায় না। বরং বলে এটা আমার দায়িত্ব।
এর দায়িত্ব কি সম্মান মনে করে। দায়িত্বকে সমস্যা মনে করে না।
কুরআন পুরুষকে সম্মান দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সম্মানের মূল্যও নির্ধারণ করে দিয়েছে। সে মূল্য হলো দায়িত্ব, ত্যাগ, ব্যয়, পরিশ্রম।
এই কারণেই একই আয়াতে আল্লাহ বলেন
«وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
কারণ তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে।
অর্থাৎ ইসলামে নেতৃত্ব বিনা মূল্যে আসে না। যে বহন করবে, সেই নেতৃত্ব দেবে। যে ব্যয় করবে, সেই অভিভাবক হবে। যে রক্ষা করবে, সেই কাওয়াম হবে।
অর্থনৈতিক সামর্থ্য: পুরুষত্বের অপরিহার্য ভিত্তি
****************************************
আমাদের সমাজে কখনো কখনো এমন ধারণা তৈরি করা হয় যে অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা বলা দুনিয়াদারি। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহ তা বলে না।ইসলাম অর্থকে লক্ষ্য বানায় না। কিন্তু দায়িত্ব পালনের উপায় হিসেবে অর্থকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
একজন স্বামীর উপর ফরজ স্ত্রীর খাদ্য। স্ত্রীর পোশাক।
স্ত্রীর বাসস্থান। স্ত্রীর চিকিৎসা। একজন পিতার উপর ফরজ সন্তানের লালন-পালন। সন্তানের শিক্ষা।সন্তানের নিরাপত্তা।সন্তানের নৈতিক গঠন। একজন সন্তানের উপর ফরয বৃদ্ধ পিতা-মাতার খেদমত। তাদের চিকিৎসা। তাদের ভরণপোষণ।
@এগুলো কি শুধু আবেগ দিয়ে সম্ভব? এগুলো কি শুধু ভালোবাসার কথা বলে সম্ভব? পিতা মাতার প্রয়োজন টাকা, সন্তান ভালোবাসার গল্প বলে কিন্তু টাকা খরচ করে না। আর সে সামর্থ্য নেই। এ সন্তান উপযুক্ত না।
এখানে একজন পুরুষের দায়িত্ব পালনের জন্য উপার্জন লাগে। এখানে পরিশ্রম লাগে। এখানে পরিকল্পনা লাগে। এখানে সামর্থ্য লাগে।
এই কারণেই রাসূল ﷺ বলেছেন “হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। (বুখারী, মুসলিম)
খেয়াল করুন রাসূল ﷺ শুধু আকাঙ্ক্ষার কথা বলেননি। সামর্থ্যের কথা বলেছেন। কারণ ইসলাম বাস্তবতার ধর্ম।
নবীদের জীবনে পুরুষত্বের শিক্ষা
*****************************
মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পুরুষরা কারা?
ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মানুষ হলেন নবীগণ। তাদের দিকে তাকালে আমরা দেখি তারা সবাই দায়িত্ববান ছিলেন।
তারা সবাই সংগ্রামী ছিলেন। তারা কেউ পরনির্ভরশীল ছিলেন না।
তাদের সংগ্রামের জীবন গ্রহণ করতে হয়েছে। এটাই মানব জীবনের বাস্তবতা।জীবন মানে দায়িত্ব।জীবন মানে চেষ্টা। জীবন মানে শ্রম। নবীজির ইতিহাস। শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজের জাতির মুক্তির জন্য তারা সংগ্রাম করেছেন। হাল ছাড়েননি। দায়িত্ব থেকে পালাননি।
তারা শুধু একজন নবী ছিলেন না। তারা একজন পিতাও ছিলেন। নবীর জিম্মাদারী পালনের সাথে সাথে পিতার জিম্মাদারীও পালন করেছেন। তারা একজন ছিলেন আদর্শ স্বামী। একজন জাতি নির্মাতা ছিলেন।
হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের আল্লাহর হুকুমে মরুভূমির মধ্যে পরিবারকে রেখে আসার ঘটনায় আমরা দেখি একজন পুরুষ কখনো শুধু নিজের কথা চিন্তা করে না। সে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথাও চিন্তা করে।
রাসূল ﷺ বলেছেন “কেউ নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজের হাতের উপার্জন খেতেন।(সহীহ বুখারী)
হযরত দাউদ তিনি ছিলেন রাজা। তবুও কর্মবিমুখ ছিলেন না। এখানে ইসলামের একটি বড় শিক্ষা আছে পদমর্যাদা যতই বড় হোক, পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
রাসূল ﷺ : পুরুষত্বের সর্বোচ্চ আদর্শ
********************************
আজ পৃথিবী শক্তিমান মানুষ খুঁজছে। ধনী মানুষ খুঁজছে। জনপ্রিয় মানুষ খুঁজছে। কিন্তু আল্লাহ মানবজাতিকে একটি আদর্শ দিয়েছেন তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ স্বামী।তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ পিতা। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ অভিভাবক।
তিনি ব্যবসা করেছেন। তিনি ঘরের কাজে সাহায্য করেছেন। তিনি পরিবারের সাথে সময় দিয়েছেন। তিনি উম্মাহর জন্য কেঁদেছেন। তিনি দায়িত্ব থেকে কখনো পিছু হটেননি। এটাই ইসলামের পুরুষত্ব।
সাহাবিদের পুরুষত্ব
******************
মদীনায় এসে তারা বলেননি আমাকে সাহায্য করুন।”
মদিনায় এসে তারা বলেছেন আমাকে বাজারের পথ দেখিয়ে দিন। এই একটি বাক্য মুসলিম পুরুষের আত্মমর্যাদার প্রতীক।
ইসলাম এভাবেই পুরুষদের দেখতে চায়। আমি চেষ্টা করব। আমি কাজ করব। আমি উপার্জন করব। আমি মানুষের বোঝা হব না।
সাহাবীদের জীবন ছিল। রাতের অন্ধকারে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্যের বস্তা নিজ কাঁধে বহন করতেন।
কারণ তারা জানতেন নেতৃত্ব মানে সুবিধা নয়।নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব।
আধুনিক সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট
*********************************
আজ আমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমরা ছেলেদের বড় করছি। কিন্তু পুরুষ বানাচ্ছি না। আমরা তাদের আরাম দিচ্ছি। কিন্তু সংগ্রাম দিচ্ছি না। আমরা তাদের বিনোদন দিচ্ছি। কিন্তু দায়িত্ব দিচ্ছি না। আমরা তাদের ভোগ শেখাচ্ছি। কিন্তু ত্যাগ শেখাচ্ছি না।
ফলে অনেক যুবক বয়সে প্রাপ্তবয়স্ক, কিন্তু দায়িত্ববোধে অপরিণত। বিবাহ করতে চায়, কিন্তু সংসার চালাতে চায় না। সন্তান চায়, কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রস্তুতি নেই। সম্মান চায়,কিন্তু সেই সম্মানের মূল্য দিতে চায় না।
ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই পুরুষ বানাও। একটি ছেলে দশ বছর বয়সে দায়িত্ব না শিখলে,ত্রিশ বছর বয়সে হঠাৎ দায়িত্ববান হয়ে যাবে না। তাকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে সময়ের মূল্য। পরিশ্রমের মূল্য।অর্থের মূল্য। প্রতিশ্রুতির মূল্য।
তাকে শেখাতে হবে কষ্ট থেকে পালিয়ে নয়, কষ্টের মধ্য দিয়ে মানুষ হতে হয়। তাকে শেখাতে হবে জীবন যুদ্ধ।
জীবন সংগ্রাম। জীবন দায়িত্ব।
কারণ একদিন সে হবে একজন স্বামী। একজন পিতা।
একজন অভিভাবক। একটি পরিবারের দুর্গ। একটি পরিবারের আশ্রয়।একটি পরিবারের নিরাপত্তা।
আজ উম্মাহর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো স্লোগান নয়। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কুরআনের পুরুষ।
সূরা আন-নিসা ২৪-এর “মুহসিন” পুরুষ। সূরা আন-নিসা ৩৪-এর “কাওয়াম” পুরুষ।
যে নিজের চরিত্র রক্ষা করে। যে নিজের পরিবার রক্ষা করে। যে উপার্জন করে। যে ব্যয় করে। যে দায়িত্ব নেয়।
যে পালিয়ে যায় না। যে একটি পরিবারের জন্য দুর্গ হয়ে দাঁড়ায়।যে একটি প্রজন্মকে নিরাপত্তা দেয়।এবং যে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারে “হে আমার রব! আপনি আমাকে যে আমানত দিয়েছিলেন, আমি তা রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।”
এই পুরুষই কুরআনের পুরুষ। এই পুরুষই উম্মাহর প্রয়োজন। এই পুরুষই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আশা। আমরা আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আজকের ছেলেদের আগামী দিনের এমন পুরুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা কি চালাচ্ছি।
একজন পুরুষ শুধু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হলে হবে না, শুধু ব্যবসায়ী বা চাকরিজীবী হলে হবে না, শুধু হাফেজ আর আলেম হলে হবে না। তাকে হতে হবে এমন পুরুষ প্রিয় রাসূল তার আখলাক এবং দায়িত্বে যেমন ছিলেন। যেমন ছিলেন সাহাবীরা। এমন পুরুষ আলোকিত পুরুষ। সমাজ পৃথিবী বদলে দেয়া পুরুষ। আজ প্রয়োজন পুরুষের। আজ সমাজে সবচেয়ে বেশি সংকট পুরুষের। চারিদিক শূন্য। পুরুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
একজন পুরুষ তৈরি হয় পরিবারে, শিক্ষাব্যবস্থায়, সামাজিক পরিবেশে, সংস্কৃতির প্রভাবে, তার অভ্যাস ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। আজ বাংলাদেশের সমাজে আমরা এমন কিছু সংকট দেখতে পাচ্ছি, যা সরাসরি পুরুষত্বের সংকটের সাথে সম্পর্কিত।
১. বেকারত্ব ও সামর্থ্যহীনতার সংকট। একজন পুরুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আল্লাহ তাআলা সূরা আন-নিসা ৩৪ নম্বর আয়াতে পুরুষের কাওয়াম হওয়ার একটি কারণ বলেছেন—
وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
“কারণ তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে।”
অর্থাৎ পরিবার পরিচালনার জন্য অর্থনৈতিক সামর্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আজকের বাস্তবতা হলো অনেক যুবক দীর্ঘ সময় বেকার থাকছে। অনেকে শিক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু দক্ষ হচ্ছে না। অনেকে চাকরির অপেক্ষায় জীবন পার করছে, কিন্তু নিজের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করছে না।
২. ভোগবাদ: দায়িত্বের পরিবর্তে আরামের সংস্কৃতি।
আজকের পৃথিবীর একটি বড় সমস্যা হলো ভোগবাদ।
মানুষকে শেখানো হচ্ছে জীবনের উদ্দেশ্য হলো নিজের ইচ্ছা পূরণ করা। যত বেশি ভোগ, তত বেশি সফলতা। যত বেশি প্রদর্শন, তত বেশি মর্যাদা। এর ফলে অনেক যুবকের চিন্তা বদলে যাচ্ছে।
আগে একজন যুবকের স্বপ্ন ছিল একটি ঘর তৈরি করব। পরিবারের দায়িত্ব নেব। পিতা-মাতার পাশে দাঁড়াব। আজ অনেকের স্বপ্ন হয়ে গেছে দামি মোবাইল।দামি পোশাক। সামাজিক মাধ্যমে পরিচিতি। কিন্তু ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নেই। সঞ্চয় নেই। দায়িত্বের প্রস্তুতি নেই।
ইসলাম ভোগ নিষেধ করেনি। কিন্তু ইসলাম শিখিয়েছে
ভোগের আগে দায়িত্ব। অধিকারের আগে কর্তব্য।নিজের আগে পরিবার।
৩. ডিজিটাল আসক্তি: কর্মশক্তির অপচয়।
প্রযুক্তি আল্লাহর একটি নিয়ামত। মোবাইল, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসব জ্ঞান ও কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু যখন প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণে না থেকে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন তা ক্ষতির কারণ হয়।
আজ অনেক যুবক ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলে সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটায়। অন্যের জীবন দেখে।
কিন্তু নিজের জীবন গড়ার জন্য সময় দেয় না।
একজন পুরুষের শক্তি হলো তার সময়। তার মনোযোগ। তার কর্মক্ষমতা। যে ব্যক্তি নিজের সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে নিজের ভবিষ্যৎকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
৪. বিবাহ-সংকট: প্রস্তুতি ছাড়া পরিবার গঠন। আজ আমাদের সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো বিবাহ হচ্ছে, কিন্তু বিবাহের প্রস্তুতি নেই। অনেক যুবক স্বামী হতে চায়, কিন্তু স্বামীর দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নয়।
অনেকে সন্তান চায়, কিন্তু পিতৃত্বের দায়িত্ব বোঝে না।
আল্লাহ তাআলা বিবাহের আলোচনায় বলেছেন—
أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُمْ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ
তোমরা তোমাদের সম্পদের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, পবিত্র জীবনযাপনকারী হবে, অবৈধ সম্পর্ককারী হবে না।
এই আয়াতে তিনটি শিক্ষা আছে—
بِأَمْوَالِكُمْ
সামর্থ্য ও দায়িত্বের প্রস্তুতি।
مُحْصِنِينَ
হেফাজতকারী, দুর্গের মতো রক্ষাকারী হওয়া।
غَيْرَ مُسَافِحِينَ
দায়িত্বহীন ভোগবাদী সম্পর্ক থেকে মুক্ত থাকা।
আজকের সংকট হলো অনেকে সম্পর্ক চায়, কিন্তু দায়িত্ব চায় না। অনেকে ভালোবাসা চায়, কিন্তু ত্যাগ করতে চায় না। অনেকে পরিবার চায়, কিন্তু পরিবার বহনের প্রস্তুতি নেই।
৫. পরিবার ভাঙন ও পুরুষের দায়িত্ব। পরিবার ভাঙনের পেছনে অনেক কারণ থাকে। অর্থনৈতিক সমস্যা। পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব। চরিত্রের দুর্বলতা। অতিরিক্ত প্রত্যাশা। সামাজিক চাপ।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট দায়িত্বহীনতা পরিবারকে দুর্বল করে। যে পুরুষ পরিবারের জন্য সময় দেয় না, স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করে না, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে না, সে তার দুর্গকে দুর্বল করে দেয়।
অন্যদিকে একজন দায়িত্বশীল পুরুষ ঘরে শান্তি আনে।
স্ত্রীকে নিরাপত্তা দেয়। সন্তানকে আদর্শ দেয় পরিবারকে স্থিরতা দেয়।
রাসূল ﷺ বলেছেন তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
৬. ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই পুরুষ হিসেবে গড়তে হবে। আজকের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো আমরা ছেলেদের কষ্ট থেকে বাঁচাতে গিয়ে তাদের জীবনযুদ্ধের জন্য দুর্বল করে দিচ্ছি।
একটি ছেলে ছোটবেলায় যদি দায়িত্ব না শেখে, পরিশ্রম না শেখে, অপেক্ষা করতে না শেখে, ব্যর্থতা মোকাবিলা করতে না শেখে, তাহলে বড় হয়ে সে কীভাবে একটি পরিবার বহন করবে?
তাকে শেখাতে হবে নিজের কাজ নিজে করা। সময়ের মূল্য বোঝা। অর্থের হিসাব রাখা। সঞ্চয় করা।পরিশ্রম করা।কথার মূল্য রাখা।আমানত রক্ষা করা।
কারণ আজকের ছেলে আগামী দিনের স্বামী।্আগামী দিনের পিতা। আগামী দিনের সমাজের নেতৃত্বদানকারী।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো দায়িত্বশীল মানুষ তৈরির সংকট। আমাদের এমন পুরুষ দরকার যে শুধু উপার্জন করবে না, বরং আমানত বহন করবে।
যে শুধু ঘর তৈরি করবে না, পরিবার তৈরি করবে।
যে শুধু নিজের জীবন নিয়ে ভাববে না, অন্যের জীবনের আশ্রয় হবে। যে হবে—
مُحْصِنًا — হেফাজতকারী।
قَوَّامًا — দায়িত্বশীল অভিভাবক।
যে একটি দুর্গের মতো দাঁড়াবে। যার ছায়ায় স্ত্রী নিরাপদ থাকবে। যার হাতে সন্তান ভবিষ্যৎ পাবে।যার কাঁধে সমাজ শক্তি পাবে। এমন পুরুষই ইসলামের কাঙ্ক্ষিত পুরুষ।