ইলমের আদব, শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু আদবের অভাব আছে। বক্তার অভাব নেই, কিন্তু শ্রোতার অভাব আছে।

আজ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বক্তা তৈরি করা হয়। শ্রোতা তৈরি করা হয় না। যে এখন এলেম অর্জন শুরুই করেনি তাকেও আলোচক বানানো হয়। এর ওপরে ট্রেনিং হয়। শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচন করা হয় পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রোতা তৈরি করা হয় না। আমাদের সমাজে বক্তা অনেক স্রোতা নেই।

◾সূরা আল-কিয়ামাহর এই চারটি আয়াত আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আয়াতে চারটি হলো।

﴿لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ﴾

﴿إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ﴾

﴿فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ﴾

﴿ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ﴾

◾এই চারটি আয়াত থেকে আমরা চারটি শিক্ষা পাই:

প্রথম শিক্ষা- প্রিয় রাসূল ﷺ জিবরীল (আ.) আয়াত পড়ার সময় সঙ্গে সঙ্গে পুনরাবৃত্তি করতেন। আল্লাহ বললেন: “হে নবী! আপনি তাড়াহুড়া করবেন না। আগে শুনুন।” খেয়াল করুন! এটা শিক্ষা অর্জনের ‌আদব।

দ্বিতীয় শিক্ষা ইলমের প্রথম আদব — আগে শুনতে শেখো

﴿فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ﴾

অর্থাৎ আগে শুনুন, তারপর পড়ুন। নবী ﷺ-কে পর্যন্ত বলা হয়েছে‌ আগে শুনুন।

তৃতীয় শিক্ষা শিক্ষক কথা বলছেন, ছাত্রের কাজ কী?

রাসূল ﷺ কী করতেন?

فكان ﷺ يستمع ثم يقرؤه

প্রথমে শুনতেন, তারপর পড়তেন। এটাই প্রকৃত ছাত্রত্ব।

চতুর্থ শিক্ষা তাড়াহুড়া ইলমের শত্রু

﴿لِتَعْجَلَ بِهِ﴾

তাড়াহুড়া কেন ক্ষতিকর? কারণ তাড়াহুড়া মানুষকে অগভীর করে, অস্থির করে, অর্ধশিক্ষিত করে।

◾ এই আয়াতগুলোতে প্রিয় নবীর জীবন আলোচনা করা হয়েছে। আয়াত গুলো সামনে রেখে প্রিয় নবী ﷺ-এর হৃদয়ের অস্থিরতা চিন্তা করুন! জিবরীল (আ.) আসমান থেকে ওহী নিয়ে আসছেন। আর রাসূল ﷺ এতটাই আগ্রহী যে জিবরীল (আ.) পুরোটা শেষ করার আগেই সাথে সাথে পড়ে ফেলছেন।

কেন তিনি পড়ছেন? ভয়ে। কীসের ভয়? টাকা হারানোর ভয় নয়। ক্ষমতা হারানোর ভয় নয়। পদ হারানোর ভয় নয়। বরং—”যদি আল্লাহর কালামের একটি হরফও আমার থেকে ছুটে যায়?”

আজ আমরা কিসের জন্য অস্থির? চাকরি, ব্যবসা, জমি, পদোন্নতি। আর নবী ﷺ অস্থির ছিলেন কুরআনের একটি শব্দের জন্য। এটাই নবুয়তের হৃদয়।

আজকের আলেম সমাজ যারা নবীদের উত্তরসূরী প্রিয় রাসূলের জীবন তাদের ভাবতে হবে। এই অস্থিরতা আলেম সমাজকে ধারণ করতে হবে। কোরআনের এক একটি আমল প্রিয় রাসূলের জীবনের এক একটি সুন্নাহ যেন ছুটে না যায় সেই দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।

◾আজ উম্মতের সবচেয়ে বড় সংকট কি? আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?

অনেকে বলবে রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক সংকট। কিন্তু আমি বলব সবচেয়ে বড় সংকট হলো আদবের সংকট। আগে মানুষ ইলম কম জানত, কিন্তু উস্তাদের সম্মান করত। আজ মানুষ বেশি জানে, কিন্তু সম্মান কম করে।

আগে ছাত্র বলত “উস্তাদ যা বলবেন, মনোযোগ দিয়ে শুনব।” আজ ছাত্র বলে আমরা ওস্তাদের চাইতে ভালো বলতে পারি।

ইমাম মালিক (রহ.) যখন হাদিস পড়াতেন, তখন দরসে এমন নীরবতা থাকত যেন ছাত্রদের মাথার উপর পাখি বসে আছে। তারা ছিলেন অত্যন্ত ভালো শ্রোতা।

◾ সূরা কিয়ামাহর এই আয়াতগুলোর আহবান আগে শুনতে শেখো। আল্লাহ বলেন:

﴿فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ﴾

অর্থাৎ—

“আগে শুনুন।”

আজকের পৃথিবী সবাইকে কথা বলতে শিখিয়েছে।কিন্তু শুনতে শেখায়নি। সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে বক্তা বানিয়েছে। শ্রোতা বানায়নি। ফলে আজ মানুষ উত্তর দেওয়ার জন্য শোনে। বোঝার জন্য শোনে না।

শিক্ষার্থীরা বয়ান করার জন্য ক্লাসে বসে। এলেম অর্জনের জন্য নয়।

◾ আজ ইলম কেন বরকতহীন হয়ে যাচ্ছে?

আজ হাজার হাজার ছাত্র পড়ছে। কিন্তু আগের মতো আলেম তৈরি হচ্ছে না কেন? কারণ আগে মানুষ ইলমের আগে আদব শিখত।

ইবনে মুবারক (রহ.) বলতেন “আমরা ইলমের আগে ত্রিশ বছর আদব শিখেছি।” ভাবুন!‌ত্রিশ বছর! আজ ত্রিশ মিনিটও ধৈর্য নেই।

◾উস্তাদ শুধু শিক্ষক নন।

জিবরীল (আ.) শুধু ওহী পৌঁছে দেননি। তিনি ছিলেন শিক্ষক। আর রাসূল ﷺ ছিলেন ছাত্র।

সমস্ত মানবজাতির শ্রেষ্ঠ মানুষও শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তাহলে আজ আমরা কিভাবে বলি—

“আমার উস্তাদ লাগবে না।”

হযরত মূসা (আ.) ছিলেন নবী। তবুও তিনি খিজির (আ.)-এর কাছে গিয়ে বললেন:

﴿هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَنْ تُعَلِّمَنِ﴾

“আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি, যাতে আপনি আমাকে শিক্ষা দেন?” নবী হয়েও ছাত্র হতে লজ্জা করেননি। আজ অনেক ছাত্র ছাত্র পরিচয় দিতে লজ্জা পায়।

◾শিক্ষকের হক

একজন শিক্ষক হয়তো আপনাকে একটি হাদিস শিখিয়েছেন, একটি মাসআলা শিখিয়েছেন, একটি আয়াত শিখিয়েছেন। আপনি হয়তো ভুলে গেছেন।

কিন্তু সেই শিক্ষা দিয়ে যদি আপনি জান্নাতে যান?

তাহলে সেই উস্তাদের হক কত বড়!

◾ ইলমের জন্য কষ্ট

আজ আমরা রুমে বসে পড়ি।তবুও ক্লান্ত। কিন্তু সালাফরা মাসের পর মাস সফর করেছেন। শুধু একটি হাদিসের জন্য। ইমাম বুখারী (রহ.) হাজার হাজার মাইল সফর করেছেন। আজ আমরা পাঁচ মিনিট হাঁটতে কষ্ট পাই।

ওস্তাদ বৈঠকে হাদিস তেলাওয়াত করেন আমরা অমনোযোগী থাকি। অথচ এই একটি হাদিসের জন্য সালাফদের কত কষ্ট ছিল। দিনের পর দিন তারা সফর করেছেন। তারপর এ হাদিস সংরক্ষণ করে লিপিবদ্ধ করেছেন। এই এলেম সংরক্ষণে তাদের কত কষ্ট ছিল। ‌ আর আমরা এলেম কত সহজে পাচ্ছি।

◾ আজকে কেন ছাত্ররা এগোতে পারে না?

কারণ তিনটি:

১. অহংকার। আজকের ছাত্র মনে করে সে সব জানে।

২. অস্থিরতা আজকের শিক্ষার্থীরা দ্রুত ফল চায়।

৩. আমলের অভাব আজকের শিক্ষার্থীরা ‌জানে, কিন্তু মানে না।

◾ শিক্ষার উদ্দেশ্য কী?

আজ মানুষ শিক্ষা নেয় চাকরির জন্য। সনদের জন্য।

পদমর্যাদার জন্য। কিন্তু ইসলামে ইলমের উদ্দেশ্য আল্লাহকে চেনা। নিজেকে সংশোধন করা। মানুষকে হিদায়াত দেওয়া।

একজন ছাত্র একদিন তার বই বন্ধ হয়ে যাবে। পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবে।সনদ পুরনো হয়ে যাবে। কিন্তু তোমার আদব কখনো পুরনো হবে না।

প্রিয় শিক্ষক! আপনি হয়তো ভাবছেন আপনার কষ্ট কেউ দেখে না। কিন্তু মনে রাখুন—একজন ছাত্রের হৃদয়ে যদি আল্লাহভীতি জন্মায়, তার প্রতিটি সিজদায় আপনার অংশ আছে।

আজ আমরা নতুন করে অঙ্গীকার করি‌ ইলমের আগে আদব শিখব। শিক্ষকদের সম্মান করব। মনোযোগ দিয়ে শুনব। কম বলব, বেশি শিখব। তথ্য নয়, নূর খুঁজব। সনদ নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি খুঁজব।

কারণ—

আদবহীন ইলম ফিতনা সৃষ্টি করে।

আর আদবসহ ইলম উম্মাহকে নেতৃত্ব দেয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের মাদরাসা, মসজিদ, শিক্ষক, ছাত্র এবং পুরো উম্মাহকে ইলমের নূর ও আদবের সৌন্দর্যে আলোকিত করে দিন।

Scroll to Top