সূরা ফাতিহা: আল্লাহর সাথে বান্দার জীবন্ত অঙ্গীকার”

সুরা ফাতেহা কুরআনে কারীমের এমন একটি সূরা যে সূরা ছাড়া নামাজ পূর্ণ হয় না, প্রতিদিন অন্তত ১৭ বার এই সূরাটি পড়া হয় এই সূরাটি কুরআনের দরজা, ইসলামের সারাংশ, বান্দা ও তার রবের মাঝে কথোপকথন।

আমাদের কুরআনে কারিমের সূরা ফাতিহা অনুভবের সাথে পড়তে হবে। তাহলে এই তেলাওয়াত দ্বারা আমাদের ঈমান বৃদ্ধি পাবে। আজ আমরা “الحمد لله” বলছি— কিন্তু হৃদয়ে কি সত্যিই আল্লাহর প্রশংসা আছে? “إياك نعبد” বলছি— কিন্তু বাস্তবে কি আমরা শুধু আল্লাহরই দাস? “اهدنا الصراط المستقيم” বলছি কিন্তু সত্যিই কি সঠিক পথ চাই?

এটা আমাদের জন্য কত উত্তম হতো যদি আমরা বুঝে বুঝে এ কথাগুলো বলতাম।

সূরা ফাতিহা কুরআনের সারাংশ

****************************

পুরো কুরআনের সারাংশ সূরা ফাতিহার মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে ‌। কুরআনের মূল বিষয় তাওহীদ, আল্লাহর একত্ববাদ এবং আখিরাতের আলোচনা। সুরা ফাতেহায় প্রথমে আল্লাহর পরিচয় তারপর একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের গুরুত্ব, আল্লাহর কাছে হিদায়াতের প্রার্থনা, মানবজীবনের দুটি পথ সফলতা ও ব্যর্থতা এই সকল বিষয় অতি সংক্ষেপে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সূরা ফাতিহা আল্লাহর সাথে বান্দার কথা বলা। প্রিয় রাসূল বলেন আল্লাহ বলেন “আমি সালাতকে আমার ও আমার বান্দার মাঝে দুই ভাগে ভাগ করেছি…”

যখন বান্দা বলে:

“الحمد لله رب العالمين”

আল্লাহ বলেন:

“আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে”

ভাবুন… আপনি যখন নামাজে সূরা ফাতিহা পড়ছেন তখন জমিনের মালিক আল্লাহ আপনার প্রতিটি বাক্যের উত্তর দিচ্ছেন! কি বিশাল সৌভাগ্য ও সন্মান।

এটি আমাদেরকে সর্বোচ্চ ভালবাসা ও মনোযোগ সহকারে সূরা ফাতিহার তেলাওয়াত উপস্থাপন করতে হবে।

◾﴿الحمد لله رب العالمين﴾

“الحمد لله”

এখানে “ال” এসেছে পূর্ণতার জন্য। এর অর্থ সমস্ত প্রশংসা শুধু আল্লাহর। এখানে কুরআনের বালাগাত দেখুন “لله الحمد” বলা হয়নি বলা হয়েছে:“الحمد لله”

কারণ প্রথমেই “الحمد” এনে আল্লাহ বান্দাকে শিক্ষা দিলেন তোমার জীবনের শুরু হোক প্রশংসা দিয়ে।

আজকের বাস্তবতা মানুষ‌ টাকার প্রশংসা করে, ক্ষমতার প্রশংসা করে, তারকার প্রশংসা করে কিন্তু আল্লাহ বলছেন “সমস্ত প্রশংসা আমার”।

তুমি বলো সমস্ত প্রশংসা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য।

একটু ভাবা প্রয়োজন আমরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠছি আমাদের চোখ কাজ করছে, হৃদপিণ্ড চলছে, নিঃশ্বাস চলছে। কিন্তু কতদিন “আলহামদুলিল্লাহ” হৃদয় থেকে বলিনি! কত মানুষ আজ কবরের নিচে… একবার “الحمد لله” বলার সুযোগ চায়। আর আমরা? জীবিত থেকেও শুকর করি না। এটা তো নিজের সাথেই বেইনসনাফি।

◾﴿الرحمن الرحيم﴾

আল্লাহর রহমত বনাম আমাদের গুনাহ

এখানে দুইটি শব্দ:

الرحمن

الرحيم

এখানে শব্দ দুটোই রহমত থেকে এসেছে। কিন্তু বালাগাতের সৌন্দর্য দেখুন— “فعلان” ওজন এসেছে‌ একটি শব্দ অর্থ অসীম ব্যাপক দয়া। “فعيل” ওজনে এসেছে আরেকটি শব্দ অর্থ স্থায়ী, অব্যাহত রহমত।

এই আয়াতের দাওয়াত তুমি যত গুনাহগার হও— আল্লাহর রহমত তার থেকেও বড়। তুমি ফিরে আসো। তিনি সকলের প্রতি সব অবস্থায় দয়াবান আর তার দয়া সীমাহীন কুলকিনারাহীন।

একজন যুবক গুনাহে ডুবে গেছে। রাতের অন্ধকারে কাঁদছে: “আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?”

সূরা ফাতিহা উত্তর দেয় তোমার রব রাহমান রাহিম

“الرحمن الرحيم”

হ্যাঁ… তোমার রব দয়ালু। তিনি তোমাকে ক্ষমা করবেন।

◾﴿مالك يوم الدين﴾

একদিন সবকিছু থেমে যাবে

আজ ক্ষমতা আছে, অহংকার আছে, টাকা আছে কিন্তু একদিন…

“لمن الملك اليوم؟”

প্রশ্ন করা হবে “আজ রাজত্ব কার?”

উত্তর দেওয়ার মতো কেউ থাকবে না। অবশেষে আল্লাহ নিজেই উত্তর দিবেন। উত্তর দেয়া হবে “لله الواحد القهار”

কেন “يوم الدين”?

“يوم القيامة” না বলে “الدين” বলা হয়েছে।

এর কারণ হলো হিসাব প্রতিদান ন্যায়বিচার সব একসাথে বোঝানো হয়েছে। এজন্যই শব্দ এসেছে الدين ।

সেই দিনটা হবে ভয়াবহ আপনার সন্তানও পাশে থাকবে না। বন্ধুও থাকবে না। মোবাইল থাকবে না। ক্ষমতা থাকবে না। আপনি একা দাঁড়াবেন…আর আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন আমার বান্দা… তুমি কি আমার জন্য বেঁচেছিলে? আমার পক্ষ থেকে দেয়া জিম্মাদারীগুলো পালন করেছিলে। সেই প্রশ্ন উত্তর পর্ব সহজ হবে না। এই আয়াতে সেই দিনের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে।

◾﴿إياك نعبد وإياك نستعين﴾

এই আয়াত বান্দার পক্ষ থেকে রবের প্রতি দাসত্বের ঘোষণা। এই আয়াতই এই সূরার কেন্দ্র।

স্বাভাবিক বাক্য: “نعبدك কিন্তু কুরআন বলেছ إياك نعبد” এমনটা হল কেন?

কারণ কর্ম আগে এনে— পূর্ণ একান্ততা সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানে অর্থ হলো আমি শুধুমাত্র তোমারই ইবাদত করি” অন্য কারো নয়।

এই আয়াতে রয়েছে ইসলামী জীবনব্যবস্থার আনুগত্যের পরিষ্কার ঘোষনা। এখানে ইসলাম শুধু মসজিদের ধর্ম নয়। ব্যবসা রাজনীতি পরিবার অর্থনীতি সমাজ সবখানে:

“إياك نعبد”

আজকের আধুনিক দুনিয়ার শিরক ব্যাপক। আজ মানুষ নফসের দাস, ফ্যাশনের দাস, পশ্চিমা চিন্তার দাস, বিজাতীয় সংস্কৃতির দাস। কিন্তু মুমিন বলে:

“إياك نعبد”

আমরা নামাজে দাঁড়িয়ে বলছি “শুধু শুধুমাত্র তোমারই ইবাদত করি”‌কিন্তু নামাজ শেষে? হারামে সম্পৃক্ত হচ্ছি, সুদের সাথে জড়াচ্ছি, মিথ্যা বলছি, অশ্লীলতা প্রচার করছি তাহলে কি আমরা সত্য বলছি? না রাব্বুল আলামিনের সাথে মিথ্যা বলছি। প্রতিদিন অন্তত ১৭ বার মিথ্যা কথা বলছি। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। যা করছি না তাই বলছি। এটা কি অনেক বড় অন্যায় নয়।

◾﴿اهدنا الصراط المستقيم﴾

এই আয়াতে রয়েছে সঠিক পথের আর্তনাদ। মানুষ আজ বিভ্রান্ত।

নানাহ ধরনের ধর্মীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিক অর্থনীতি মতবাদ, নাস্তিকতার আহ্বান, ভোগবাদ, পশ্চিমা সংস্কৃতি সবাই পথ দেখাচ্ছে। সবাই আহ্বান করছে দাওয়াত দিচ্ছে।

কিন্তু আল্লাহ বলছেন: “সঠিক পথ একটাই” তোমার সামনে অসংখ্য পথ। কিন্তু তোমাকে বেছে নিতে হবে একটি পথ। “صراط” একবচন। কারণ সত্য সঠিক পথ একটাই।

এই আয়াতের দাওয়াত ইসলাম শুধু কিছু ইবাদতের নাম নয়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, একটি সভ্যতা, নৈতিকতা , রাষ্ট্রনীতি, পরিবারনীতি, ও পরিকল্পিত সমাজ নীতির দাওয়াত।

◾﴿صراط الذين أنعمت عليهم﴾

কার পথ? কাদের পথে আহ্বান করে ইসলাম। এই পথের পথিক কারা। এই আয়াতে বিষয়টা ক্লিয়ার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এই পথ নবীদের পথ। সাহাবীদের পথ। সালাফের পথ।

আজকের সংকট আজ মানুষ সেলিব্রিটিদের অনুসরণ করে, ইনফ্লুয়েন্সারদের অনুসরণ করে।‌কিন্তু কুরআন বলছে “নিয়ামতপ্রাপ্তদের পথ অনুসরণ করো। এই পথে তুমি সফল হবে।

◾﴿غير المغضوب عليهم ولا الضالين﴾

সূরাটির শেষ দুই ধ্বংসের পথ‌ থেকে পরিত্রাণ চাওয়া হয়েছে।

দুই দল ধ্বংস হয়েছে। একদল যারা সত্য জেনেও মানেনি। আরেকটি দল যারা অজ্ঞতায় পথ হারিয়েছে।

এই দুই দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া যাবেনা। কারণ তারা ধ্বংস হয়েছে।

বর্তমান বাস্তবতা আজ মুসলিমদের একদল:

জ্ঞান আছে আমল নেই আরেকদল আবেগ আছে জ্ঞান নেই। সূরা ফাতিহা বলছে “দুটো থেকেই বাঁচো। দুটোই বিপদজনক।

আমরা প্রতিদিন এই সূরা পড়ি। কিন্তু কখনো কি অনুভব করি আমরা কি বলছি। এটি শুধু তিলাওয়াত নয়?এটি একটি চুক্তি। একটি অঙ্গীকার। একটি জীবনব্যবস্থা মেনে নেয়ার ঘোষণা।

চূড়ান্ত সাক্ষাতের সেই দিন যদি আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন। “তুমি প্রতিদিন বলেছিলে: إياك نعبد

এই তোমার আমলনামা কোথায় সেই দাসত্ব?”

আমাদের চিন্তা করার চাই সেদিন কি উত্তর হবে আমাদের।

সূরা ফাতিহা আমাদের ডাকছে—আল্লাহকে চিনতে, তাঁর দাস হতে, তাঁর সাহায্য চাইতে, তাঁর পথে চলতে, ভ্রষ্টতা থেকে বাঁচতে।

“হে আল্লাহ… আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে সূরা ফাতিহা বুঝার তাওফীক দিন। আমাদের জীবনকে ‘إياك نعبد’ এর বাস্তব নমুনা বানিয়ে দিন। আমাদেরকে সোজা পথে অটল রাখুন। আমাদের মৃত্যু যেন হয় নিয়ামতপ্রাপ্তদের পথে…” آمين।

Scroll to Top