পবিত্র রমজানের ১৯তম তারাবিহ।‌ ২২তম পারা

পবিত্র রমজানের ১৯তম তারাবিহ।‌২২তম পারা – তাওহীদ, রিসালাত, আমানত, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন।‌২২তম পারায় রয়েছে সূরা আহযাবের শেষাংশ (৩১-৭৩) সূরা সাবা, সূরা ফাতির

সূরা ইয়াসিনের প্রথমাংশ (১-২৭)। এই পারায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু হুকুম, ঐতিহাসিক ঘটনা ও ঈমানি শিক্ষা এসেছে। মুসলিম সমাজের নৈতিকতা, রাষ্ট্র পরিচালনা, ক্ষমতার ব্যবহার, কৃতজ্ঞতা এবং আল্লাহর সাহায্যের বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর নির্দেশনা রয়েছে।

🌑সূরা আহযাব

🔴 রাসূল ﷺ-এর ঘরের আদর্শ

আয়াত:

يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ مَن يَأْتِ مِنكُنَّ بِفَاحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ يُضَاعَفْ لَهَا الْعَذَابُ

অনুবাদ: “হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমাদের কেউ যদি প্রকাশ্য অশ্লীলতা করে তবে তার জন্য শাস্তি দ্বিগুণ হবে।” (আহযাব ৩০)

বিশ্লেষণ: আল্লাহ নবীর পরিবারকে সাধারণ মানুষের তুলনায় অধিক দায়িত্বশীল করেছেন।

শিক্ষা:যাদের মর্যাদা বেশি তাদের দায়িত্বও বেশি।

সমাজের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের চরিত্র সবচেয়ে পবিত্র হওয়া জরুরি।

🔴 দ্বীনের পথে ধৈর্যের পুরস্কার

আয়াত:

وَمَن يَقْنُتْ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ

অনুবাদ: “তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে তাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেওয়া হবে।” (আহযাব ৩১)

শিক্ষা: আল্লাহর পথে কষ্ট সহ্য করলে পুরস্কারও বেশি।

🔴 পর্দার হুকুম ও সামাজিক নিরাপত্তা

আয়াত:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ

অনুবাদ: “তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো।” (আহযাব ৩৩)

বিশ্লেষণ: এই আয়াতে মুসলিম সমাজের লজ্জাশীলতা ও শালীনতার ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষা: সমাজে অশ্লীলতা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ইসলামের নৈতিক বিধান গুরুত্বপূর্ণ।

🔴 নবীর প্রতি দরুদ পাঠের হুকুম

আয়াত:

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ

অনুবাদ: নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর উপর দরুদ পাঠ করেন।” (আহযাব ৫৬)

শিক্ষা: মুসলমানদের উপর রাসূল ﷺ-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ফরজ।

🔴 নারীদের শালীন পোশাকের নির্দেশ

আয়াত:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ

অনুবাদ: “হে নবী! আপনার স্ত্রী ও মুমিন নারীদের বলুন তারা যেন তাদের জিলবাব টেনে নেয়।” (আহযাব ৫৯)

বিশ্লেষণ: মদিনায় কিছু দুষ্ট লোক নারীদের উত্যক্ত করত। এই আয়াত নারীদের সম্মান রক্ষার জন্য নাজিল হয়।

শিক্ষা: ইসলাম নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

🔴 আমানতের মহান দায়িত্ব

আয়াত:

إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ

অনুবাদ: আমি আকাশ, পৃথিবী ও পাহাড়ের কাছে আমানত পেশ করেছিলাম।” (আহযাব ৭২)

বিশ্লেষণ: এই আমানত হলো দ্বীন পালন ও শরিয়তের দায়িত্ব।

শিক্ষা: মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন।

🌑 সূরা সাবা

🔴 দাউদ (আ.)-এর উপর আল্লাহর নিয়ামত

আয়াত:

يَا جِبَالُ أَوِّبِي مَعَهُ

অনুবাদ: “হে পাহাড়সমূহ! তোমরা দাউদের সাথে তাসবিহ কর।” (সাবা ১০)

বিশ্লেষণ: দাউদ (আ.)-এর কণ্ঠ এত মধুর ছিল যে পাহাড় ও পাখিরাও তাসবিহে অংশ নিত।

শিক্ষা: আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অসাধারণ ক্ষমতা দিতে পারেন।

🔴 সুলাইমান (আ.)-এর শক্তিশালী রাষ্ট্র

আয়াত:

وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ

অনুবাদ: “সুলাইমানের জন্য আমি বাতাসকে অনুগত করেছিলাম।” (সাবা ১২)

বিশ্লেষণ: সুলাইমান (আ.)-এর শাসন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রযুক্তিনির্ভর।

শিক্ষা: ক্ষমতা ও প্রযুক্তি যদি আল্লাহর পথে ব্যবহৃত হয় তবে তা কল্যাণকর হয়।

🔴 সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর ঘটনা

আয়াত:

فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ

অনুবাদ: যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম তখন একটি পোকা তার লাঠি খেয়ে ফেলল।” (সাবা ১৪)

বিশ্লেষণ: জিনেরা দীর্ঘদিন বুঝতেই পারেনি যে সুলাইমান (আ.) মারা গেছেন।

শিক্ষা: এখান থেকে বোঝা যায় গায়েবের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া কারো নেই।

🔴 সাবা জাতির ধ্বংস

আয়াত:

لَقَدْ كَانَ لِسَبَإٍ فِي مَسْكَنِهِمْ آيَةٌ

অনুবাদ:“সাবা জাতির বসতভূমিতে একটি নিদর্শন ছিল।” (সাবা ১৫)

ঘটনা বিশ্লেষণ:‌ইয়েমেনের সাবা জাতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। তাদের বিখ্যাত বাঁধ ছিল মারিব বাঁধ।

কিন্তু কৃতজ্ঞতা না থাকার কারণে আল্লাহ তাদের উপর ভয়ংকর বন্যা পাঠান।

শিক্ষা: সমৃদ্ধি আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া টিকে না।

🔴 সম্পদ অহংকারের কারণ

আয়াত:

وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُم

অনুবাদ:“তোমাদের সম্পদ ও সন্তান তোমাদের আল্লাহর কাছে নিকটবর্তী করে না।” (সাবা ৩৭)

শিক্ষা: আল্লাহর কাছে মর্যাদা নির্ধারণ হয় ঈমান ও আমলের মাধ্যমে।

🌑সূরা ফাতির

🔴 আল্লাহর কুদরতের ঘোষণা

আয়াত:

مَّا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِن رَّحْمَةٍ

অনুবাদ: আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত খুলে দেন তা কেউ বন্ধ করতে পারে না।” (ফাতির ২)

শিক্ষা: কোন শক্তিধর রাষ্ট্র বা ক্ষমতা আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না।

🔴 শয়তানের ষড়যন্ত্র

আয়াত:

إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ

অনুবাদ:“নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু।” (ফাতির ৬)

শিক্ষা: মানবতার অনেক সংঘাতের পেছনে শয়তানি প্ররোচনা কাজ করে।

🔴 আলেমদের মর্যাদা

আয়াত:

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

অনুবাদ: আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে আলেমরা।” (ফাতির ২৮)

শিক্ষা: প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে আল্লাহভীরু করে।

🌑সূরা ইয়াসিন

১৫. সত্যের দাওয়াতের ইতিহাস

আয়াত:

وَجَاءَ مِنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ رَجُلٌ يَسْعَى

অনুবাদ:“শহরের দূর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি দৌড়ে এল।” (ইয়াসিন ২০)

ঘটনা বিশ্লেষণ: একজন সাধারণ মানুষ নবীদের সমর্থন করেছিল। কিন্তু তার জাতি তাকে হত্যা করে।

পরিণতি: আল্লাহ তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন।

শিক্ষা: সত্যের পথে দাঁড়ানো কখনো বৃথা যায় না।

২২তম পারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা দেয়

দ্বীনের আমানত রক্ষা করা, ক্ষমতা ও সম্পদের অহংকার থেকে বাঁচা, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া, আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা।

আজকের পৃথিবীতে যখন অন্যায় যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতা চলছে, তখন কুরআনের এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় অত্যাচারী শক্তি যত বড়ই হোক, আল্লাহর বিচার একদিন অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে।

Scroll to Top