আজ ডিসেম্বরের ৬ তারিখ। গত বছর ২০২৩ এর এই দিনে আহমাদ দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করে। অক্টোবরের ২২ তারিখ আহমদের জন্ম। অল্প কিছুদিনের জন্য তার দুনিয়াতে আসা অতঃপর চলে যাওয়া।
আহমাদ তার ভাই বোনদের মাঝে ষষ্ঠ। সবার শেষে এসে সবার আগে চলে গেল। একজন বাবার সন্তানের প্রতি কতটা আবেগ অনুভূতি থাকে আহমাদের বিদায় ছাড়া তা হয়তো কখনো অনুভব করতে পারতাম না। ক্ষণে ক্ষণে সময়ে সময়ে একাকী চলার পথে আহমাদের কথা যখন মনে হয় মনের অজান্তে চোখের মাঝে অশ্রু চলে আসে।
আজ আহমাদ যদি থাকতো এখন তার বাবাকে চিনতো, হাসতো, কোলে ওঠার জন্য কান্না করতো। কত কিছু মনে হয়। আহমাদের বিদায়ের পর তার অন্য ভাই-বোনদের প্রতি ভালোবাসা দায়িত্বশীলতা বেড়েছে। সামান্য কিছুতেই পেরেশানি চলে আসে। আমি বাবার চাইতে আহমাদের প্রতি তার মায়ের অনুভূতি অবশ্যই অনেক অনেক বেশি হবে। মায়ের ভালোবাসার সাথে অন্য কারো তুলনা হয় না।
গত বছর এদিনে সকালবেলা চলে যাই মাদ্রাসায়। ঠিক দুপুরে বাসায় এসে সর্বপ্রথম কাজে ছিল আহমাদের সাথে সাক্ষাৎ করা। জিজ্ঞাসা করি আমার আব্বু কেমন আছে। ঘরোয়া কাজে ব্যস্ত ছিল তার মা। বলল অনেকক্ষণ যাবৎ ঘুমাচ্ছে। খাওয়া দাওয়ার খবর নেই। তার মা তাকে কোলে নিয়ে খাবার খাওয়াবে দেখা গেল কিছুটা এ্যাবনরমাল। আমাকে ডাকলো সে এমন করছে কেন। অবস্থাটা আমার কাছে ভালো মনে হলো না। এখনো যোহরের নামাজ পড়া হয়নি। বুঝতে পারলাম দ্রুত তাকে নিয়ে যাওয়া দরকার কোন হসপিটালে। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন আমার নামাজে দাঁড়ানো।
দাঁড়িয়ে গেলাম নামাজে। তকদিরে যা আছে তাই হবে। নামাজ সবার আগে। কোন কথা ছাড়াই শান্তভাবে নামাজ পড়লাম। কঠিন পরিস্থিতিতে এই নামাজের মাঝে আমি স্বস্তি পেলাম। জীবন মৃত্যু আল্লাহর হাতে। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকতে হবে। অস্থির না হয়ে স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। আমার পক্ষ থেকে নির্দেশনা ছাড়াই তার মা প্রস্তুত হয়ে গেল তাকে নিয়ে হসপিটালে যাবে। মূলত তাকে নিয়ে বাসায় থাকার সুযোগ নেই। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে।
নামাজ শেষে কোথায় নিয়ে যাব ফোনে দু-একজন ডাক্তারের সাথে কথা বললাম পরামর্শ করলাম । শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেলাম মিরপুর শিশু হসপিটালে। হসপিটালের দিকে রওনা হলেও মূলত আহমদকে আল্লাহর রহমতের কোলে তুলে দিয়েছিলাম। তার অবস্থা থেকে বোঝা যাচ্ছিল সে অনেকটাই চেতনাহীন। তবে মনে হচ্ছিল তখনও হায়াত আছে।
দুপুরবেলা লাঞ্চের সময়। হসপিটাল গুলোর এলোমেলো অবস্থা। জরুরি বিভাগ থেকে তারা পাঠিয়ে দিল ওয়ার্ডে। বিশেষজ্ঞ কোন ডাক্তার তখন ছিল না। বাচ্চার অবস্থা দেখে ওয়ার্ডের নার্সরা ফিরিয়ে দিল এখানে রাখা সম্ভব না। এমন কোথাও নিয়ে যান যেখানে NICU আছে।
পেরেশানি বেড়ে গেল। দিনটি ছিল আমার জন্য পেরেশানির দিন। পরিচিত কারো থেকে যে সহযোগিতা নিব সে সুযোগ ছিল না। সকলের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম মোবাইলে ছিল না চার্জ। সকল থেকে আমি হয়ে পড়লাম বিচ্ছিন্ন। অল্প সামান্য কিছু টাকা ছিল পকেটে। আর আল্লাহর উপর ছিল ভরসা। যা ভালো সে সিদ্ধান্তই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসবে।
এই মুহূর্তে NICU কোথায় পাবো।এই মুহূর্তে প্রাইভেট কোন হসপিটালে নেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। কারণ এই মুহূর্তে দরকার তার NICU সাপোর্ট। সরকারি হসপিটাল সিসিও পাওয়া যাবে না। শিশু হসপিটাল থেকে তারা শ্যামলী ঢাকা হেলথ কেয়ার হসপিটালের ঠিকানা দিল। কারো থেকে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ ছিল না। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে সেখানে রওনা হলাম। শিশু হসপিটালে আমার এক মুসল্লী আব্দুল্লাহ ভাই সহযোগিতা করলেন। তিনি এম্বুলেন্সে আমার সঙ্গী হলেন।
হসপিটালে পৌছলাম। সেখানকার কর্তব্যরত ডাক্তার রোগীকে দেখার সাথে সাথে বলল তাকে লাইফ সাপোর্টে দিতে হবে। আমি জানতে চাইলাম সে কি এখনো জীবিত আছে। তারা বলল এখনো তার হায়াত অবশিষ্ট আছে। মায়ের কোল থেকে আহমাদ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তাকে রাখা হলো লাইফ সাপোর্টে। বিভিন্নভাবে ক্ষণে ক্ষণে হসপিটালের দায়িত্বশীলরা আমাদের ধৈর্যধারণ এবং সব ধরনের সংবাদ এর জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাচ্ছিল।
রাতের বেলা প্রায় এগারোটার দিকে দায়িত্বশীল ডাক্তার এলেন এবং তিনি কথা বললেন। বাচ্চার অবস্থা ভালো না। তবে যেহেতু লাইফ সাপোর্ট নিচ্ছে আমরা এখন তার চিকিৎসা শুরু করতে চাচ্ছি। তার রক্তশূন্যতা রক্ত দিতে হবে। ভাগিনা ওয়াদি রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। কিছুটা সান্তনা সহ তার মায়ের জন্য হসপিটালে নিচ তলায় আবাসিক হোটেলে রাতে থাকার জন্য একটি রুমও ভাড়া করে ফেললাম। আহমদের মা ও তার বোন এবং তার খালারা সে রুমে অবস্থান করছিল।
আমাদের চিকিৎসার প্রথম পর্ব ছিল সম্ভবত তাকে রক্ত দেয়া। ডাক্তাররা কার্যক্রম শুরু করছিল। এর মাঝেই তারা আমাকে খবর পাঠালো। এবং আমাদের মৃত্যুর সংবাদ আমাকে জানালো। মুহূর্তের মাঝে হসপিটালে উপস্থিত হয়ে যায় অনেকেই। আহমাদের ঢাকায় অবস্থানকারী দুই খালা খালু, মোহাম্মদপুরের অবস্থানকারী আমার খালাতো বোন উম্মি আপা সাথে মোশাররফ ভাই আমার মামাতো বোন নিপা আপা সহ অনেকেই। আমার ছাত্রদের মাঝে অনেকেই উপস্থিত হয়।
আহমাদের গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা হয় মারকাজুল ইসলামীতে। তারপর আমরা বাসায় ফিরে আসি। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি জামিয়া রাহমানিয়া আজিজিয়ার ক্যাম্পাসে আহমাদের জানাজা হবে। সকাল দশটায় আমাদের জানাজা হয় জামিয়ার ওস্তাদ ও সকল ছাত্রদেরকে সাথে নিয়ে। জানাজায় ঢাকাস্থ আত্মীয়-স্বজন ও মুহাব্বতের কিছু ভাইরাও উপস্থিত ছিল। আমার ছোট মামা তামিম ও মেঝো মামা আলিম দাদ উপস্থিত হয়েছিলেন সান্ত্বনা দিতে। ময়মনসিংহ থেকে আহমাদের ছোট মামা মাওলানা জুনায়েদও জানাজায় এসে উপস্থিত হয়। আমার ছোট ভাই আহমাদের চাচা মাওলানা জুনায়েদ সাথে আমার চাচাতো ভাই মাওলানা জুবায়ের পথে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়াতে জানাজায় এসে শরিক হতে পারেনি।
জানাযার পর আমরা জানাজার জন্য ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা হই। ময়মনসিংহ শহরের গোলকিবাড়ি কবরস্থানে আমার ছোট চাচা সারোয়ারুল আলম নোমানের একই কবরে আহমদকে কবরস্থ করা হয়। সেখানে আমার বাবা আমার চাচা এবং এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে আমাকে কবরে শায়িত করা হয়।
আহমাদ নেই। কিন্তু মনে হয় আহমাদ আছে। বারবার মনে হয় আহমাদ ফিরবে। আহমাদ আব্বু বলে ডাকবে। আহমাদকে আদর করবো। আহমাদ হঠাৎ করেই চলে গেল। আহমাদের কোন অসুস্থতা আমরা টের পাইনি। সন্তানদের মাঝে মনে হয়েছে আহমাদ খুব সবল খুব সুস্থ। তার কোন সমস্যা নেই।
রাতে কান্না করত। কান্না থামানো যেত না। মনে করতাম পেতে মনে হয় ব্যথা করছে। এক মালিশ করে দিতাম। কান্না থেমে যেত। কয়েকবার ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তাররা ঠাণ্ডার ঔষধ দিয়েছে। তেমন সমস্যার কিছু বলেনি।
আহমাদ চলে যাওয়ার জন্যই এসেছিল। আহমাদের জন্য অন্তত আমি কিছু করতে পারিনি। তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করেছে প্রায় দশ মাস। তারপর তার চলে যাওয়া পর্যন্ত ভালোবাসা দিয়েছে। আমিতো কিছু দিতে পারিনি। ছোট সন্তান বাবা-মার জন্য সুপারিশ করবে। মাঝে মাঝে প্রশ্ন হয় আমিও কি সুপারিশ পাব। কিভাবে পাব। কিছু তো করিনি তার জন্য।
মাঝে মাঝে কুমন্ত্রণা আসে। ভালো হসপিটালে নিলে অনেক টাকা খরচ করলে তাকে বাঁচানো যেত। তাকে আরো বড় ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন ছিল। তুমি বড় অপরাধী। তোমার সম্পদ নেই। সন্তান বাঁচানোর ক্ষমতা নেই। তুমি অবহেলা করে তাকে হত্যা করেছ। এগুলো সবই কুমন্ত্রণা। এগুলো আফসোস তৈরি করে।
জীবন মৃত্যু আল্লাহর কাছে। নির্ধারিত সময়ে মৃত্যু হয়। মৃত্যুর নির্ধারিত সময় চলে আসলে তাকে বাঁচাবার ক্ষমতাকে রাখেনা। নির্ধারিত সময়ের আগে কারো মৃত্যু হয় না। চিকিৎসা গ্রহণ করা সুন্নত। অবহেলা করা ঠিক নয়। কিন্তু চিকিৎসা আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালা টালাতে পারে না। চিকিৎসা কাউকে হায়াত দেয় না।
আমার প্রিয় আহমাদ অবশ্যই ভালো আছে আল্লাহর কাছে। আমার সব সন্তানদের চাইতে ভালো আছে। প্রিয় রসুলের হাদিসের বাণী অনুযায়ী আহমাদ জান্নাতি। আমার বাকি সন্তানগুলো কি আমাদের মত জান্নাতে যেতে পারবে। খুব ভয় হয় সন্তানদের জন্য নিজের জন্য এই পৃথিবীর ফেতনাগুলো মোকাবেলা করে আমরা কি আল্লাহর জান্নাত জয় করতে পারব।
জান্নাতে তো যেতেই হবে। কোন অবস্থাতেই যাওয়া যাবে না জাহান্নামে। এক মূহুর্তের জন্যও নয়। কঠিন চ্যালেঞ্জের বুকে আমাদের জীবন। আহমাদ কিন্তু এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় সফল।
হে প্রিয় আল্লাহ। রাব্বুল আলামিন। আমাদের সবাইকে কবুল কর। জাহান্নাম থেকে মুক্ত করো। আমাদের জান্নাতের অধিকারী কর। সকলকে নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে চাই।