শিক্ষকতার দায়িত্বটি অনেক মর্যাদার একটি বিষয়। এর চাইতে সম্মানজনক কোন পদ আছে আমার মনে হয় না।
প্রিয় নবী বলেন
خيركم من تعلم القران وعلمه
তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করে এবং শিক্ষা দান করে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবীদের সকলকে শিক্ষক হিসেবে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করেছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন
بعثت معلما
আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।
শিক্ষকতা এমন এক দায়িত্ব এই দায়িত্ব নবীরা পালন করেছেন। তাই আমাদের প্রতিটি শিক্ষকদের সর্বপ্রথম নিজেদের চিনতে হবে নিজেদের জানতে হবে। শিক্ষকতার পেশাকে আল্লাহর রহমত মনে করা চাই।
একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু ক্লাস করানো নয়। শিক্ষক হলো আদর্শ। নিজেকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। শিক্ষার্থীরা একজন শিক্ষককে সর্ব দিক থেকে অনুকরণ অনুকরণ করে থাকে। তারা তাদের ফলো করে।
নবীরাও ছিলেন উম্মাহর জন্য আদর্শ। আল্লাহ নবীদের পাঠিয়েছিলেন উম্মত যেন তাদের অনুসরণ অনুকরণ করে। আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে।
হযরত আয়েশার কাছে আমাদের প্রিয় নবীর জীবন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি জবাব দিয়েছিলেন তার জীবন হলো কোরআন। তোমরা কোরআন পড়ো। কোরআনের মাঝেই তার জীবন খুঁজে পাবে। তাই একজন শিক্ষক শুধু ক্লাস করাবে না। সে তার ব্যক্তিত্ব আমল দ্বারা শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোত্তম নমুনা হবে।
শিক্ষকতা ও ব্যক্তিগত আমল
**************************
ঈমান সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ। শিরক সবচেয়ে বড় অপরাধ। নিজে শিরক থেকে বাঁচতে হবে নিজ শিক্ষার্থীদের শিরক থেকে বাঁচাতে হবে। কুরআনে কারীমে হযরত লোকমান আলাইহিস সালামের আলোচনায় এসেছে। তিনি কোন নবী ছিলেন না কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। সর্বোত্তম শিক্ষা দ্বারা তিনি তার সন্তানকে গড়ে তুলেছিলেন। সন্তানকে দেয়া তার উপদেশগুলোর আলোচনা আল্লাহ কোরআনে তুলে ধরেছেন। সন্তানকে দেয়া তার প্রথম উপদেশ ছিল আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না। এটা সবচেয়ে বড় অপরাধ।
আমাদের সমাজে নানা ধরনের শিরকি সংস্কৃতি আছে। নানাহ ফ্যামিলির শিক্ষার্থীরা এখানে আসে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে কোন কুসংস্কার বা কোন শিরকের যেন আমাদের এখানে চর্চা না হয়। সব সময় তৌহিদের চর্চা অব্যাহত রাখা। তাদের দায়িত্ব গুরুত্বসহকারে ঈমানের আলোচনা পড়া এবং সব সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ঈমানের আলোচনা করতে থাকা।
শিক্ষকতার সাথে সাথে আমরা শিক্ষার্থী
*********************************
শিক্ষকতার পাশাপাশি আমরা সবাই শিক্ষার্থী। আমাদের এলেম চর্চা করা চাই। এলেম চর্চার মাঝে থাকলে অন্তরের মাঝে নম্রত তৈরি হবে। ইলেম চর্চা থেকে বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে অন্তর শক্ত হয়ে যাবে। এজন্য প্রতিদিন প্রতি সপ্তাহ কে কেন্দ্র করে আমাদের পরিকল্পনা থাকা চাই। কোরআন থেকে এলেম অর্জন করা, হাদিস থেকে এলেম অর্জন করা সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা যখন জ্ঞান চর্চা করব আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝে তার প্রভাব পড়বে।
আমাদের বিশেষ করে ইতিহাস পড়া চাই। আমরা মেয়েদের মাঝে শিক্ষার কাজ করছি। আমাদের মেয়েদের আদর্শ হল হযরতে ফাতিমা হযরত খাদিজা হযরত আয়েশা। আমাদের উচিত তাদের জীবনী পড়া। আমাদের কাছে হযরতে খাদিজা হযরত আয়েশা এবং হযরত ফাতিমার অনেক অনেক গল্প থাকা চাই। যে গল্পগুলো আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের কে শোনাবো। তারা এ গল্প শুনে উজ্জীবিত হবে। তাদের জীবনের মাঝে পরিবর্তন আসবে।
যথা সময় নামাজের এহতেমাম
***************************
একজন মুসলমানের প্রতিদিনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নামাজ। ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে বিলম্ব না করে যথাসময়ে নামাজ আদায় করা চাই। নামাজকে ইসলামে সবচাইতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নামাজের প্রভাব সমস্ত কাজের উপর পড়ে। শিক্ষক যখন নামাজকে গুরুত্ব দিবে শিক্ষার্থীদের মাঝেও তার প্রভাব পড়বে। কারণ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নমুনা। আমাদের আমলের প্রভাব আমাদের শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বে।
আমাদের প্রতিদিনের কাজের মাঝে ১০ মিনিট সময় বের করা চাই। এই ১০ মিনিটে আমরা শিক্ষার্থীদের থেকে কারগুজারী শুনবো। আবাসিক অনাবাসিক সকলের নামাজের খবর নিব। বাসার পরিবেশ সম্পর্কে জানবো। এবং তাদেরকে উজ্জীবিত করব তারা নিজেরা নামাজ পড়ার সাথে সাথে যেন যথাসময়ে বাসায় সকলকে নামাজের ব্যাপারে উৎসাহ দেয়। আমাদের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে তাদের পরিবারগুলো যেন আলোকিত হয়। প্রতিটি পরিবার যেন নামাজী হয়ে ওঠে। আমরা শুধু তাদেরকে কিতাব পড়াবো না। আমরা তাদেরকে আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলবো।
আমাদের শিক্ষার্থীরা বাসায় যেয়ে মোবাইল দেখবে কেন। কেন অভিভাবকের বিচার দিবে বাসায় এসে কথা শুনেনা। তাহলে আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে তারা কি শিক্ষা অর্জন করল। এই অবস্থার পরিবর্তন আমরা করতে পারি।
মেধা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দান। মেধাবী সবাই হয় না। আমরা অনেক চেষ্টা করার পরও সবার পরীক্ষার ফলাফল সমান হবে না। কিন্তু আমরা আমাদের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবো। এটা আমাদের শপথ হওয়া চাই।
ফরজ নামাজ যথাসময়ে আদায়ের পাশাপাশি নফল নামাজের এহতেমাম করা চাই । নফল রোজা ও দান সরকার অভ্যাস গড়ে তোলা চাই। এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হবে।
পরিপাটি ও পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব
**************************
একজন শিক্ষককে নিজের শিক্ষার্থীদের সামনে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকতে হবে। পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতার বড় ধরনের প্রভাব আছে। আল্লাহ তার প্রিয় নবীকেও নবুয়্যতি প্রদানের পর পবিত্র পোশাক ও পরিচ্ছন্ন পোশাকের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কোরআনে করিমে এ বিষয়ে আলোচনা আছে।
{ وَثِیَابَكَ فَطَهِّرۡ (4) وَٱلرُّجۡزَ فَٱهۡجُرۡ (5) }
[Surah Al-Muddaththir: 4-5
আপনি আপনার পোশাককে পবিত্র করুন। সব ধরনের অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন।
সুন্দর পরিপাটি পোশাক পরিহিত একজন ব্যক্তি আর নোংরা পোশাক একজন ব্যক্তি কখনো এক নয়। পোশাক দ্বারা ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়। মানুষের কাছে নিজের মূল্যায়ন তৈরি হয়। পবিত্র পরিচ্ছন্ন পোশাক ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম নোংরামি অপবিত্রা থেকে দূরে থাকার আদেশ করে। এজন্যই একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সামনে উত্তম পোশাকে নিজেকে উপস্থাপন করবে। আল্লাহর নবী কেউ বলেছেন উম্মতের সামনে উত্তম পোশাকে নিজেকে উপস্থাপন করতে।
{ ۞ یَـٰبَنِیۤ ءَادَمَ خُذُوا۟ زِینَتَكُمۡ عِندَ كُلِّ مَسۡجِدࣲ (31)
হে আদমের সন্তান-সন্ততিগণ! যখনই তোমরা কোনও মসজিদে আসবে, তখন নিজেদের শোভার বস্তু (অর্থাৎ শরীরের পোশাক) নিয়ে আসবে।
কোরআনে কারীমের এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এবাদতের সময় সুন্দরভাবে সজ্জিত হওয়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
قُلۡ مَنۡ حَرَّمَ زِینَةَ ٱللَّهِ ٱلَّتِیۤ أَخۡرَجَ لِعِبَادِهِۦ وَٱلطَّیِّبَـٰتِ مِنَ ٱلرِّزۡقِۚ قُلۡ هِیَ لِلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ فِی ٱلۡحَیَوٰةِ ٱلدُّنۡیَا خَالِصَةࣰ یَوۡمَ ٱلۡقِیَـٰمَةِۗ (32)
বল, আল্লাহ নিজ বান্দাদের জন্য যে শোভার উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, কে তা হারাম করেছে? এবং (এমনিভাবে) উৎকৃষ্ট জীবিকার বস্তুসমূহ? বল, এসব পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্য (এবং) কিয়ামতের দিনে বিশেষভাবে (তাদেরই)।
কোরআনে করিমের এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সাজ সজ্জা উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
{ لَّا جُنَاحَ عَلَیۡهِنَّ فِیۤ ءَابَاۤىِٕهِنَّ وَلَاۤ أَبۡنَاۤىِٕهِنَّ وَلَاۤ إِخۡوَ ٰنِهِنَّ وَلَاۤ أَبۡنَاۤءِ إِخۡوَ ٰنِهِنَّ وَلَاۤ أَبۡنَاۤءِ أَخَوَ ٰتِهِنَّ وَلَا نِسَاۤىِٕهِنَّ وَلَا مَا مَلَكَتۡ أَیۡمَـٰنُهُنَّۗ وَٱتَّقِینَ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَیۡءࣲ شَهِیدًا }
[Surah Al-Aḥzāb: 55
নবীর স্ত্রীগণের জন্য তাদের পিতাগণ, তাদের পুত্রগণ, তাদের ভাইগণ, তাদের ভাতিজাগণ, তাদের ভাগিনাগণ, তাদের আপন নারীগণ ও তাদের দাসীগণের ক্ষেত্রে (অর্থাৎ তাদের সামনে পর্দাহীনভাবে আসাতে) কোন গুনাহ নেই এবং (হে নারীগণ!) তোমরা আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিটি বস্তুর প্রত্যক্ষকারী।
কুরআনে কারীমের এই আয়াতে নারীরা কাদের সামনে নিজেদের সাজ সজ্জা প্রকাশ করবে তার বর্ণনা দিয়েছেন। এবং এ তালিকার মাঝে নারীদেরকে আপন নারীদের সামনে মুসলিম নারীদের মাঝে সাজসজ্জা প্রকাশ করার অনুমোদন দিয়েছেন।
কাজেই একজন আদর্শ শিক্ষিকা, তার নারী শিক্ষার্থীদের সামনে তার সাজসজ্জা প্রকাশ করতে বাধা নেই। বরং পরিপাটি থাকার দ্বারা ছাত্রীদের ওপর তার প্রভাব পড়বে। তার ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পাবে।
{ یَـٰبَنِیۤ ءَادَمَ قَدۡ أَنزَلۡنَا عَلَیۡكُمۡ لِبَاسࣰا یُوَ ٰرِی سَوۡءَ ٰ تِكُمۡ وَرِیشࣰاۖ وَلِبَاسُ ٱلتَّقۡوَىٰ ذَ ٰلِكَ خَیۡرࣱۚ ذَ ٰلِكَ مِنۡ ءَایَـٰتِ ٱللَّهِ لَعَلَّهُمۡ یَذَّكَّرُونَ }
[Surah Al-Aʿrāf: 26]
হে আদমের সন্তান-সন্ততি! আমি তোমাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করেছি, যা তোমাদের দেহের যে অংশ প্রকাশ করা দূষণীয় তা আবৃত করে এবং তা শোভাস্বরূপ। বস্তুত তাকওয়ার যে পোশাক, সেটাই সর্বোত্তম। এসব আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে।
কোরআনে কারীমের এই আয়াতে পোশাকের একটি উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে সৌন্দর্যতা প্রকাশ করা। কাজেই একজন শিক্ষকের পোষাক পরিচ্ছেদে সৌন্দর্যতা থাকা চাই। এতে করে তার কথাবার্তা তার আচার-আচরণেও সৌন্দর্যতা বৃদ্ধি পাবে। পোশাকের সাথে মনেরও একটি সম্পর্ক আছে। পবিত্র পরিচ্ছন্ন পোশাকে মনের মাঝেও সৌন্দর্যতা বৃদ্ধি পায়।
শিক্ষকের আচার-আচরণ
***********************
একজন শিক্ষকের আখলাক মুখের ভাষা অবশ্যই সুন্দর হওয়া চাই। মিথ্যা গীবত শেকায়েত পরনিন্দা বিদ্রুপ উপহাস গালি গুলাজ যে সমস্ত কাজগুলো ইসলামের কবিরা গুনাহ তা থেকে বিরত থাকা চাই। কবিরা গুনাহ একটি গুনাহই জাহান্নামে নিয়ে যেতে যথেষ্ট। জীবন গড়ে তুলতে হবে কবিরা গুনাহ মুক্ত। একটি কবিরা গুনাহ হয়ে যাওয়া জীবনের সর্বনাশ থেকে আনা। একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের সামনে নমুনা আদর্শ। তাকে অবশ্যই কবিরা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকতে হবে।
একজন শিক্ষককে অবশ্যই হিংসা বিদ্বেষ জুলুম থেকে মুক্ত থাকা চাই। প্রতিটি অন্যায় অন্ধকার। যে অন্ধকারের মাঝে আছে সে আলোর দেখা পাবে না। যে নিজ ইচ্ছায় গুমরাহীর পথ বেছে নেয় তার জন্য কোন হেদায়েতকারী নেই।
শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান
******************
আমরা যারা মাদ্রাসায় শিক্ষকতার সাথে সম্পৃক্ত আমাদের সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল মাদ্রাসাকে ভালোবাসা। মাদ্রাসার ক্ষতি সাধন অথবা বদনাম হয় তেমন কিছু না করা। অভিভাবকদের সাথে কথাবার্তা শিক্ষার্থীদের সাথে কথাবার্তায় মেজাজকে ঠান্ডা রাখা চাই।
দ্বিতীয় বিষয় ঐক্যবদ্ধ মন মানসিকতা নিয়ে অগ্রসর হওয়া। এমন কাজে না করা যার দ্বারা পারস্পরিক বিভক্তি তৈরি হয়। শিক্ষকদের মাঝে বিভক্তি থাকলে এটা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর।
ইট বালু সিমেন্ট আর পাথরের টুকরাগুলো যখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে থাকে তখন তা দ্বারা বিশাল অর্থনীতিকা নির্মাণ করা যায়। এই একবারও সিমেন্টের মিকচারের ভেতরে যদি বাতাস প্রবেশ করে আর রড গুলোতে জং ধরে যায় তাহলে এই অট্টালিকা টিকবে না ধ্বসে যাবে।
এজন্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল শিক্ষক আর তাদের মাঝে একতা এবং ঐক্যবদ্ধতা একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় বিষয়।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থী
******************
প্রতিটি শিক্ষার্থী শিক্ষকের কাছে আমানত। তাদের পিতা-মাতা তাদেরকে আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তোলার জিম্মাদারী আমাদের কাছে অর্পণ করেছে। এটা অনেক বড় এক দায়িত্ব। প্রিয় নবী বর্ণনা করেন-
وعن ابن عمَر رضي اللَّه عنهما قال: سَمِعتُ رَسُولَ الله ﷺ يقول: كُلُّكُمْ راعٍ، وكُلُّكُمْ مسئولٌ عنْ رعِيَّتِهِ، الإِمَامُ رَاعٍ ومسئولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، والرَّجُلُ رَاعٍ في أَهْلِهِ ومسئولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، والمَرْأَةُ راعِيةٌ في بَيْتِ زَوْجِهَا ومسئولة عَنْ رعِيَّتِهَا، والخَادِمُ رَاعٍ في مالِ سيِّدِهِ ومسئولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فكُلُّكُمْ راعٍ ومسئولٌ عنْ رعِيَّتِهِ متفقٌ عَلَيهِ.
আমাদের লক্ষ্য করা চাই প্রতিটি শিশুকে আমাদের কাছে শিক্ষা অর্জনের জন্য পাঠাতে তাদের বাবা-মা কি পরিমান কষ্ট করে যাচ্ছেন।
একজন বাবা মার কাছে সন্তান কত আদরের। সন্তান তাদের কত বড় সম্পদ। সন্তান কে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সীমাহীন কষ্ট তারা করে যাচ্ছেন। সেই স্বপ্নের সন্তান তারা আমাদের কাছে দিয়েছেন। তাদের স্বপ্ন আমাদের কাছে সন্তান সুনাগরিক হিসেবে বড় হবে। ঈমান শিখবে এবং উত্তম আমলের অধিকারী হবে।
একজন মায়ের স্বপ্ন একজন বাবার স্বপ্ন সন্তানকে ঘিরেই। সন্তান আমাদের কাছে পড়ছে। আর তার মা-বাবা তার জন্য কত কষ্ট করে যাচ্ছে। সেই কষ্টগুলোকে মূল্যায়ন করা চাই। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নিজ সন্তানের মত দেখা চাই।
অভিভাবকরা তার সন্তানের জন্য টাকা দিচ্ছে, নিজের মেধা দিচ্ছে মূল্যবান সময় দিচ্ছে। একবার দিয়ে যাচ্ছে আরেকবার নিয়ে যাচ্ছে। মাদ্রাসায় এসে খাবার দিয়ে যাচ্ছে। সীমাহীন কষ্ট করার পর তারা সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে। আমাদের অবহেলায় এই বাবা-মার স্বপ্ন যেন হত্যা না হয় এদিকে খেয়াল করা চাই। একটা সন্তানের প্রতি অবহেলা একজন বাবা-মার স্বপ্নকে হত্যা করা। প্রতিটি বাবা-মার প্রতিটি সন্তান শিক্ষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কাউকে অবহেলা করব না।
আমাদের দুর্ব্যবহারে বা অবহেলায় একটি সন্তান যদি ঝরে যায়। মাদ্রাসায় কোরআন শিখতে এসেছিল। সে যদি আবার জাহিলিয়াতে ফিরে যায় আমাদের ফিকির করা চাই আল্লাহর কাছে আমরা কি জবাব দিব। আল্লাহ যদি জিজ্ঞাসা করেন তোমার অবহেলার কারণে আমার এ বান্দা দ্বীনি শিক্ষা অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়েছিল তখন আল্লাহর কাছে আমরা কি জবাব দিবো। একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে এই অনুভূতি নিয়ে কাজ করা চাই।
শিক্ষার্থীদের মাঝে ইনসাফ রক্ষার গুরুত্ব
**********************************
শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের প্রতি ইনসাফপূর্ণ আচরণ না করে তাহলে সে শিক্ষকের নাম জালিমের খাতায় লেখা হয়ে যাবে। এজন্য একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী হিসেবে সবাই সমান। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখতে হবে। এখানে কোন বৈষম্য করা যাবে না। গরিব ধনী আত্মীয় অনাত্মীয় সবাই সমান। সবাই আমাদের শিক্ষার্থী।
অমনোযোগী শিক্ষার্থী
*******************
অনেক শিক্ষার্থী আছে অমনোযোগী। আবার অনেকেই মনোযোগী। অমনোযোগী শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষককে মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষক তার অমনোযোগী শিক্ষার্থীদের ত্রুটি তার নিজের মাঝে খুঁজে বের করবে। আমি শিক্ষক যদি মনোযোগী হই আমার শিক্ষার্থী অবশ্যই মনোযোগী হবে।
বাচ্চা মানুষের মাঝে অমনোযোগিতা থাকবেই। শিক্ষকের দায়িত্ব নিজ শ্রম দ্বারা কৌশল দ্বারা তাকে মনোযোগী করে তোলা। শুধুমাত্র পড়া নেয়ার সময় কড়া শাসন কোন সমাধান নয়। বরং শিক্ষক শিক্ষার্থীর পড়া শিক্ষার সময় সামনে থেকে তাকে পড়া শিখায় সহযোগিতা করবে। তাকে স্বাধীন ছেড়ে দিবে না। তার পড়া নিয়ে শুধু শিক্ষকের দায়িত্ব নয়। শিক্ষকের দায়িত্ব তাকে পড়া শিখিয়ে দেয়া।
ভালোবাসা ও মায়া মমতা
**********************
শিক্ষক আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সাথে শিক্ষা প্রদান করবে। যেমনটি আল্লাহ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন
{ وَٱخۡفِضۡ جَنَاحَكَ لِمَنِ ٱتَّبَعَكَ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِینَ }
[Surah Ash-Shuʿarāʾ: 215]
এই আয়াতে আল্লাহ তার প্রিয় রাসূলকে বলেছেন যে সমস্ত মুমিনরা আপনার অনুসরণ করে আপনি তাদের জন্য আপনার ডানা বিছিয়ে দিন।
প্রিয় রাসুল সাঃ একজন শিক্ষক হিসেবে নিজ অনুসারীদের সাথে এতটাই মিশে যেতেন তিনি যখন সাহাবীদের সাথে থাকতেন অপরিচিত ব্যক্তির বুঝার উপায় ছিল না সকলের মাঝে রসূলুল্লাহ কে। তাকে জিজ্ঞাসা করে নিশ্চিত হতে হতো। শিক্ষক এভাবেই তার শিক্ষার্থীদের সাথে মিশে যাবেন।
শিক্ষার্থীদের শাসন
*****************
শিক্ষার্থীদের শাসন শিক্ষকতার অংশ। শাসন শিক্ষকতার সৌন্দর্য। কিন্তু এই শাসন যখন হয় ক্রোধ এবং বিদ্বেষ থেকে তখন তো জুলুম এবং অন্যায়ে পরিনত হয়। একজন শিক্ষক কোনভাবেই তার শিক্ষার্থীর ওপর জুলুম করতে পারে না। এজন্য শাসন হতে হবে মমতাপূর্ণ। মা বাবার শাসন যেমন মমতা পূর্ণ। শাসনের পরও সন্তান মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরে। শিক্ষকতার শাসন এমন হওয়া চাই। যেন শিক্ষার্থী শাসনের পর শিক্ষকদের আরো অনুগত হয়ে ওঠে।
শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর মাঝে সম্পর্ক হবে যেমন সম্পর্ক হয় বাবা ও সন্তান, ডাক্তার ও রোগীর মাঝে। যেমনটি শেখ সাদী বলেছেন তার কিতাবে-
به فرمانبران بر شه دادگر # پدروار خشم آورد بر پسر
নিজ অধীনস্থদের ওপর একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি পিতার মত। যে পিতা তার সন্তানের ওপর কখনো রাগান্বিত হতে পারেন।
گهش میزند تا شود دردناک # گهی میکند آبش از دیده پاک
কখনো তিনি তাকে দিতে পারেন শাস্তি যেন সে সচেতন হয়। আবার কখনো তিনি তার চোখ থেকে অশ্রু মুছে দিতে পারেন।
আমাদের শাসন হবে একজন পিতার মতো একজন মায়ের মত। আদর মাখা দরদ মাখা শাসন। যে শাসনের মাঝে থাকবে ভালোবাসা মায়া মমতা। আমাদের শাসনে তারা দূরে সরে যাবে না। শাসন দ্বারা তারা আরো কাছাকাছি হবে।
چو نرمی کنی خصم گردد دلیر # وگر خشم گیری شوند از تو سیر
যদি তুমি নম্রতাই অবলম্বন করো তাহলে প্রতিপক্ষ হয়ে যাবে বাহাদুর। আর যদি তুমি সর্বদা ক্রোধের উপর থাকো তাহলে তোমার থেকে তারা হয়ে যাবে নিরাশ।
বেশি কঠোরতাও করা যাবে না আবার অতিরিক্ত নম্রতাও করা যাবে না। উভয়টি ক্ষতিকর। আমাদেরকে হতে হবে মধ্যপন্থী
درشتی و نرمی بهم در به است # چو رگزن که جراح و مرهم نه است
কঠোরতা নম্রতা উভয়েটের মাঝে ভারসাম্যতা রক্ষা করে চলতে হবে। যেমন একজন ডাক্তার। চিকিৎসার স্বার্থে সে রোগীর শরীরকে কাটা ছেঁড়া করার পর আবার ব্যান্ডেজ করে দেয়।
রোগী তার সমস্ত সহায় সম্পদ বিক্রি করেও অপারেশনের জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। ডাক্তারের চিকিৎসা সে তার জন্য উপকারী মনে করে। শিক্ষকের শাসন শিক্ষার্থীর জন্য ঠিক এমনটাই প্রয়োজনীয়। শাসন ছাড়া সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিক্ষকের শাসনই পারে তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে।
মোনাজাত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা
******************************
আমরা শিক্ষকতার জায়গা থেকে চেষ্টা করতে পারি। সফলতা ব্যর্থতা আল্লাহর হাতে। আমাদের কাউকে মেধা দেয়ার ক্ষমতা নেই। কারো উপকার করারও ক্ষমতা নেই। কারো ক্ষতি করারও ক্ষমতা নেই।
এজন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা প্রচেষ্টার পর দোয়ায় মনোযোগী হওয়া চাই। শিক্ষক তার প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য দোয়া করবে। আল্লাহর কাছে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হেদায়েতের জন্য দোয়া করবে। নিজের হেদায়েতের জন্য দোয়া করবে। যেমনটি আমরা নবীদের জীবনে দেখতে পাই। আমাদের প্রিয় নবী মক্কার কুরাইশদের নাম ধরে ধরে আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। শিক্ষকের উচিত তার শিক্ষার্থীদের নাম ধরে ধরে দোয়া করা। যেমনটি শেখ সাদি বলেছেন-
چو طاعت کنی لبس شاهی مپوش* چو درویش مخلص برآور خروش
যেহেতু তুমি অধীনস্থ কাজেই বাদশাহীর পোশাক খুলে ফেলো। আর নির্ভেজাল দরবেশদের মত প্রার্থনা করো।
که پروردگارا توانگر تویی * توانای درویش پرور تویی
দহে পরওয়ার দিগার। সকল ক্ষমতা তোমার। তুমি ধনী। তুমি দরবেশদের লালন পালনকারী।
نه کشور خدایم نه فرماندهم* یکی از گدایان این درگهم
আমি কোন রাষ্ট্রের প্রভু নই কোন আইন প্রণেতাও নই। আমি তোমার দরবারের এক ভীখারি মাত্র
تو بر خیر و نیکی دهم دسترس*وگرنه چه خیرآید از من به کس؟
তুমি সাহায্যকারী কল্যাণদাতা। আমার মত ব্যক্তি কারো কল্যাণ করার ক্ষমতা রাখেনা।
دعا کن به شب چون گدایان به سوز* اگر میکنی پادشاهی به روز
তুমি রাতের বেলা মন খুলে প্রার্থনা করো। যদি তুমি দিনের বেলা রাজশাহী করতে চাও।
আমাদের লক্ষ্য আখেরাত
***********************
আমরা যারা শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত আছি শিক্ষকতার কাজটি আখেরাতের জন্য করা চাই। শিক্ষার্থীদের কাছে অভিভাবকদের কাছে আমাদের যেন কোন চাওয়া পাওয়া না থাকে। আমাদের পরিশ্রম মেহনত আল্লাহর জন্য। আর এর বিনিময় আমরা আল্লাহর থেকেই নিবো। এটা নবীদের মেহনতের মূলনীতি ছিল। কোরআনের মাঝে এই আলোচনায় এসেছে-
{ وَمَاۤ أَسۡـَٔلُكُمۡ عَلَیۡهِ مِنۡ أَجۡرٍۖ إِنۡ أَجۡرِیَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِینَ }
[Surah Ash-Shuʿarāʾ: 109]
আমরা তোমাদের কাছে এর কোন পারিশ্রমিক চাই না। আমাদের পারিশ্রমিক রাব্বুল আলামিনের জিম্মায়।
{ ٱتَّبِعُوا۟ مَن لَّا یَسۡـَٔلُكُمۡ أَجۡرࣰا وَهُم مُّهۡتَدُونَ }
[Surah Yā-Sīn: 21]
তোমরা অনুসরণ করো এমন সমস্ত ব্যক্তিদের যারা তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চায় না আর তারা হেদায়েত প্রাপ্ত।
আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া চাই যেমনটি কুরআনে এসেছে
{ لَا نُرِیدُ مِنكُمۡ جَزَاۤءࣰ وَلَا شُكُورًا }
[Surah Al-Insān: 9]
আমরা তোমাদের কাছে চাই না কোন জাযা এবং কোন কৃতজ্ঞতা।
আমরা একে অপরকে কল্যাণকর কাজে সহযোগিতা করব। গুনাহ ও অবাধ্যতার কাজে অসহযোগিতা করব। আমাদের পরস্পরের সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বের। আমরা ভালো কাজে একে অপরকে আদেশ করব অন্যায় কাজে সকলে মিলে নিষেধ করব। তাহলে আশা করা যায় শিক্ষকতার এ দায়িত্ব পালন করে আমরা লাভবান হব দুনিয়াতে এবং আখেরাতে। আল্লাহর কাছে হতে পারবো আমরা মর্যাদাবান এবং প্রিয় মানুষ।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে কবুল করুন।